রুডলফ রকারের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম: তত্ত্ব ও প্রয়োগ - রুডলফ রকার

রুডলফ রকারের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম: তত্ত্ব ও প্রয়োগ - রুডলফ রকার

ভাষান্তর- বি এ এস এফ

সূচি

১. প্রসঙ্গ কথা: নোয়াম চমস্কি
২. ভূমিকা: নিকুলাস ওয়াল্টার
৩. এনার্কিজম বা নিরাজবাদ- উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
৪. আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা ও প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম
৫. সিন্ডিক্যালিজমের অগ্রদূতগন
৬. এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উদ্দেশ্য
৭. এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের পদ্বতী
৮. এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের বিবর্তন

প্রসঙ্গ কথা

নোয়াম চমস্কি

রুডলফ রকারের অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বইয়ের প্রকাশনার সূদীর্ঘ কাল পর যখন স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের সংকট চলছে তখন এই বিষয়ে কথা বলা অনেক গুরত্ববহ। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পর থেকে রকারে প্রকাশিত বই পুস্তকের সাথে পরিচিত হই, সেটা ছিলো প্রথমে নিউইয়র্ক শহরের এনার্কিস্ট বইয়ের দোকানে, এর কয়েক বছর পরে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ধুলি মলিন বইয়ের তাকে পাই অপরিচিত ও অপঠিত অবস্থায় পড়ে থাকা বইয়ের স্তূপে। তার বই গুলো পড়ে সত্যি খুব আলোরিত হই, যা আমাকে কয়েক দশক পিছনে নিয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি রকার একটি সুন্দর ও শান্তিময় দুনিয়ার কথা বলেছেন, যা অর্জন করা আমাদের জন্য কঠিন নয়, তা আমাদের আয়ত্তের মধ্যই আছে। ‘বিশ্ব যে দুর্যোগের’ দিকে ‘ পাল তুলা নৌকার মত দ্রুত’ এগিয়ে যাচ্ছে তা তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের সূচনাতেই দেখতে পেয়েছিলেন। যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রন করা সাধারন মানুষের সাধ্যের বাইরে, রাস্ট্র সমূহ যে ক্ষমতা অর্জন করেছে- তা মানব সমাজকে বিলয় ঘটিয়ে দিতে সক্ষম, প্রচলিত বিধি বিধানের ব্যাতিক্রম হলেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। রকার প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিধি বিধানের বিপরীতে নিজের অবস্থান ব্যাক্ত করেছিলেন। তিনি প্রচলিত প্রবণতা সমূহকে সাহসীকতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন, যে সকল প্রবনতা মানুষের আত্মনির্ভরশীল মানসিকতাকে বিনাশ করে দেয়। মাইকেল বাকুনিনের ভাষ্য মতে, ‘ নয়া সমাজের জীবন্ত জীবাণু সৃজন’ করে, মানুষের ভ্রমাত্মক চিন্তার অপসারণ করা দরকার, যারা ভাবেন মানুষের মুক্তির পথ আসে উপর থেকে – তাঁদের নিজস্ব সৃজনশীল কর্ম বা একাগ্রতা থেকে নয়। প্রচলিত প্রভাবশালী চিন্তাধারার আলোকে বোধগম্য করে জনগণের জন্য লক্ষ্য স্থির করা দরকার। এখন বলতেই হবে যে, তথাকতিথ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গুলো মনুষ্য বসবাসের উপযোগী নয় বা মার্কসবাদি-লেনিনবাদি আন্দোলন গুলো ও মুক্তির পথ নয়। শিল্প ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেনীর মাঝেও একেই রকমের চিন্তাধারা গেঁড়ে বসেছে, তাঁদের নিজস্ব রাজনীতি যাই হউক কেন, তাঁরা এখন তা স্পস্টভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করে যাচ্ছেন। জনগনের জন্য যেখানেই যে কোন সিদ্বান্ত গ্রহন করা হোক না কেন, তা তাঁরা সংশোধনের ও ব্যবস্থা রাখে, নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ও এরা সরাসরি না এসে ভিন্ন ভাবে হাজির হয়। রকার জোয়ান ভ্রাভো মেরিলো র কথা উল্লেখ করে বলেন, সকল কথা বার্তা বুঝা না গেলেও (পৃ-১১৮) এটা পরিস্কার যে অভিজাত শ্রেনীর স্বার্থ ও চিন্তা ভাবনাই সকল ক্ষেত্রে ধারন করা হয়। রকারের স্পস্ট কথা সাধারন মানুষ নিজেই নিজের জীবনের দায়িত্ব নিবে, তাঁদের কাজ তারাই করবেন, এবং তাঁদের হাতেই তাঁরা সকল কর্ম সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত থাকবেন। তাঁদের নিজেদের মুক্তির লড়াই সংগ্রামে ও তাঁরা সাধারন জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহনে সাফল্য অর্জন করবেন। অধীনস্থদেরকে আনুগত্যের মধ্যে রাখার জন্য প্রতিস্টানিক ভাবে দমন ও নিপিড়নের পথ বেচে নেয়া হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই মানুষ মানবিক নৈতিক মান অধিকতর উন্নত করবে, ‘ অধিকার আদায়ের একটি নয়াপথ,’ তাঁদের শক্তি সামর্থ নিয়ে নয়া চেতনার বিকাশ ঘটাবে। তাঁদের সময়ের সামাজিক ঘটনা প্রবাহ তাঁরা বুঝে নিবেন’, তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতা ও গুরুত্ব উপলব্দি করে কাজ করবেন। এই ধরনের সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনের কাজে অংশগ্রহণ হবে তাঁদের ‘হ্রদয়ের গভীরতম’ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। রকার শ্রমজীবী মানুষের লড়াই সংগ্রামের ধারনাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করে এবং তাঁদের অর্জন সমূহকে আলোকিত করে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কর্মের ধারা একেবারেই ‘কল্পনা বিলাশী’ নয়; বা রূপকল্প ও নয়, বরং বাস্তব সম্মত কার্যক্রম, তিনি অতীতের সকল বিষয়াবলী বিশ্লেষণ করে ব্যার্থতা ও সাফল্য সকলের সামনে হাজির করেছেন। অন্যান্য সাহসী নিরাজবাদিদের মত, রকার ও ‘ সকল নিরঙ্কুশ ধারনা ও প্রকল্পকে বাতিল করে দিয়েছেন’ এবং দৃঢ় মন্তব্যে বলেছেন, ‘আমরা মানবজাতির উন্নয়নের কোন চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির করতে চাই না’। তবে একটা ধারনা দিতে পারি যে, ‘ তা হবে সিমাহীন শান্তি, সামাজিক সংহতি এবং চমৎকার বসবাস যোগ্য পরিবেশ, যা ক্রমশ ধাপে ধাপে উচ্চতর স্থরে উন্নিত হবে, যার ভিত্তি হবে নয়া ধরনের পারস্পরিক বুঝা পড়া, ও নয়া উপলব্দি’। ইতিহাস আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমরা প্রায়স আমাদের উপর শোষণের বিষয়ে নির্লিপ্ত থেকে যাই, আমরা নিপিড়নের শিকার হয়ে ও কোন কোন সময় নিপিড়কদের সাথে বুঝে না বুঝে গলা মিলিয়ে কথা বলে ফেলি বা তাঁদের হয়েই কাজ করে যাই। রকার তাঁর আপন বিশ্বাস ও উপলব্দি থেকে বলেছেন, সাধারন মানুষের নিজস্ব ক্ষমতা ভিত্তির উপর নির্ভর করে একটি নয়া বিশ্ব গড়ে তুলা এখন সময়ের দাবী। তাঁদের অংশগ্রহনে সাংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে উন্নততর করা দরকার। তাঁদের সরাসরি অংশগ্রহনে, সামাজিক চুক্তি, ন্যায় বিচার, সংহতি সমৃদ্ব হতে পারে। এই পুস্তকটি প্রায় অর্ধশতাব্দি আগে লিখা হলে ও এর গুরুত্ব আজো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নয়া দুনিয়া গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তাধারাকে শানিত করতে ও গঠন মূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে ব্যাপক ভূমিকা বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ভূমিকা

নিকুলাস ওয়াল্টার

রুডলফ রকার (১৮৭৩-১৯৫৮) জার্মানীর রাইনল্যান্ডের মাইনজ শহরে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি যে পরিবারে জন্ম গ্রহন গ্রহন করেন সেটা ছিলো একটি ক্যাথলিক উদারপন্থী ও দক্ষশ্রমিক পরিবার। অল্প বয়সেই তিনি মা বাবা হারিয়ে এতিম হয়ে পড়েন, ফলে তাকে একটি এতিম খানায় প্রেরন করা হয়। তিনি বই বাঁধাইকারী শিক্ষানবিস হিসাবে জীবন শুরু করেন, তখন ব্যবসায়ীক কারনে নানা স্থানে তিনি ভ্রমন করেন।

রকার তরুন বয়সে একজন সমাজতন্ত্রী ছিলেন, তিনি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগদান করেন; কিন্তু তিনি বাম বিরুধীদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয় ১৮৯০ সালে। এর পর পর ই তিনি এনার্কিজম বা নিরাজবাদের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পশ্চিম ইউরূপের বহু এলাকা পরিদর্শন করেন, সেই পরিদর্শন বা ভ্রমনের উদ্দেশ্য ছিলো ব্যবসা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড।

রকার ১৮৯১ সালে ব্রাসেলসে অনুস্টিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে পর্যবেক্ষক হিসাবে যোগদেন এবং ১৮৯২ সাল থেকেই এনার্কিস্ট প্রেসে কাজ করতে শুরু করে দেন, সেই কারনে পুলিশের যন্ত্রনায় সেই বছরই তিনি জার্মানী ত্যাগ করেন। তিনি কয়েক বছর প্যারিসে বসবাস করেন, পরে ১৮৯৫ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে বসবাস শুরু করেন। রকার একজন ভিন্ন জাতীয়তার মানুষ হলে ও তিনি ইহুদি এনার্কিস্ট আদোলনে জড়িত হয়ে পড়েন।

তিনি ইহুদি ভাষা শিখেন, এবং ইহুদি সমাজে তিনি বসবাস করতে থাকেন, এবং সারাজীবন মিলি ওইকপ (১৮৭৭-১৯৫৩) এর সহযোদ্বা হিসাবে লড়াই সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তিনি খুব দ্রুত একজন ভালো বক্তা ও রাজনৈতিক লিখক হিসাবে গড়ে উঠেন, ফলে পরবর্তী প্রায় ২০ বছর তিনি সেই আন্দোলনে অত্যন্ত সম্মানী ও জনপ্রিয় ব্যাক্তি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৮৯৮ সালে কয়েক মাস তিনি লিভারপুলে একটি সাপ্তাহিক ইদিশ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পত্রিকাটির নাম ছিলো ডাস ফ্রেই ভর্ট বা মুক্ত দুনিয়া। এর পর তিনি সম্পাদনা করেন ডার আরবিটর ফ্রেইন বা শ্রমিকদের বন্দ্বু নামের একটি পত্রিকা। এটা ছিলো লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক, এবং পরে ১৯০০ সালে জার্মানীর একটি এবং আরো একটি ইদিশ মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ইহুদিদের এনার্কিস্ট আন্দোলন স্থানীয় ব্রিটিশ আন্দোলনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলো। ১৯০২ সালে ইহুদি ফেডারেশন গঠন করা হয়, পত্রিকার গ্রহক সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যায় এবং অন্যান্য প্রকাশনার পরিমান ও বৃদ্বি পায়। এবং ১৯০৬ সালে ইস্ট লন্ডনের জুবেলী রোডে একটি সামাজিক যোগাযোগ অফিস খোলা হয়।
১৯০৭ সালে যখন অ্যামস্টারডামে আন্তর্জাতিক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় সেই সময় রকার একজন প্রভাবশালী চিন্তক ব্যাক্তি হিসাবে পরিচিত হন। সেই সময়ে থেকেই তিনি মূলত আন্তর্জাতিক এনার্কিস্ট ফোরামের সদস্য হয়ে উঠেন। ইহুদি এনার্কিস্টগন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, এবং তাঁদের জন্য এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে লিখেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্ব যুদ্বের সময় রকার উভয় পক্ষের বিরুধিতা করেন এবং এই অপরাধে তাকে একজন বিদেশি শত্রু হিসাবে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর পর আরবার্টার পত্রিকাটি বন্দ্ব করে দেয় এবং জুবেলী রোডের অফিসে থালা ঝুলিয়ে দেয় শাসক চক্র।

সেই পরিস্থিতির সামাগ্রিক আন্দোলনের কর্ম কান্ডে নেতিবচক প্রভাব পড়ে ফলে ব্রিটেনে আর আগের মত এনার্কিস্ট আন্দোলন বা সাম্যবাদি দল গড়ে উঠতে পারে নাই। ১৯১৮ সালে রকারকে ব্রিটেন থেকে নেদারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়, পরে তিনি নিজের মাতৃভূমি জার্মানীতে ফিরে যান। তিনি জার্মানীতে ও একজন উজ্জল ব্যাক্তি হিসাবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। তিনি ফ্রাই ভেরিনিং ডয়েচেস্টার জিওয়ারক্সস্কটন (জার্মান ট্রেড ইউনিয়নের ফ্রি এসোসিয়েশন) এবং তারপর ফ্রাই আর্বিইটার-ইউনিয়ন ড্যুসিয়ামস (ফ্রি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন অব জার্মানি) এবং তার পত্রিকার সম্পাদক ডের সিন্ডিক্যালিস্টের একজন সক্রিয় প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ১৯২২ সালে বার্লিনে আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের সক্রিয় উদ্যোগী ব্যাক্তি ছিলেন যার ফলে আন্তর্জাতিক ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশন গঠনের সূত্রপাত হয় এবং তিনি এটার সচিবদের একজন হিসেবে কাজ করেন।

তিনি ১৯২৬ সালের পর বলশেভিক বিপ্লবের পক্ষে এনার্কিস্টদের সমর্থনের বিরোধিতা করেছিলেন রকার বা ১৯২৬ সালের পর পিটার অশিনভের সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্ম (যা এনার্কিস্ট আন্দোলনকে একটি ভার্চুয়াল রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনর্বিন্যস্ত করার পক্ষে সহায়তা করেছিলেন) এবং তিনি উদীয়মান নাজি আন্দোলনের স্বাধীনতার ও বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে রকার পুনরায় জার্মানী ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তখন নাজি সরকার তাঁর বিচার করতে চেয়েছিলো। তিনি পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী ভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করেন।

অবশ্য এর আগে ও তিনি লিখক এবং বক্তা হিসাবে সেখানে বহুবার গিয়েছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিস্টদের দ্বন্দ্বের বিরুদ্বে ব্যাপক কাজ করেন। তিনি গত ২০ বছর ধরে নিউ ইয়র্কের ক্রোমপাঁডে মোহিগান সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবন যাপন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশটিতে তিনি একজন এনার্কিস্ট হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের মিত্র জোটকে সমর্থন করেন, ফলে তাঁর কিছু পুরাতন কমরেডদের সাথে বিরোধ তৈরী হয়। কিন্তু এর পর ও ক্রপতকিন বা মালাতিস্তার চেয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা একটু ও কমেনি।

রকার একজন ভালো বক্তা হিসাবে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, তিনি জার্মান ও ইদ্দিশ ভাষায় সমপারদর্শী ছিলেন, তিনি সেই ভাষায় প্রচুর প্রবন্দ্ব, পুস্তিকা ও গ্রন্থ রচনা করেন- বিশেষ করে মুক্তিপরায়ন উদারতাবাদি গবেষণা জাতীয়তাবাদি ও সাংস্কৃতি বিষয়ে, এবং নিরাজবাদি দার্শনিক জোহান মস্ট এবং ম্যাক্স ন্যাটালু্র এবং একিটি দির্ঘ আত্মজীবনী রচনা করে গেছেন। তাঁর প্রচুর লিখা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে এবং স্পেন ও ল্যাতিন আমেরিকায় ব্যাপক ভাবে বিতরন করা হয়েছে। কিন্ত সেই তুলনায় ইংরেজীতে খুব কমই কাজ হয়েছে (বাংলায় একেবারেই হয় নাই- অনুবাদক)।

অন্যদিকে আমেরিকায় তিনটি বই ও কিছু পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে – খুবই উঁচু মানের গবেষণা গ্রন্থ জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতি (১৯৩৭), কিছু সমালোচনা মূলক রচনা যাকে বলা হয় (১৯৩৮), এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার উপর জনপ্রিয় জড়িপ (১৯৪৯)। ব্রিটেনে আরো দুইটি বই প্রকাশিত হয়। যেমন- এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উপর জনপ্রিয় জরিপ (১৯৩৮) এবং তাঁর আত্মজীবনীর লন্ডন অংশ (১৯৫৬)। আরো কিছু ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়েছিলো কিন্তু পরে আর তা প্রকাশিত হয় নাই - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার পরিচয় পত্রের একটি বিবরণ, বিশেষত ওয়াইন এবং বারের পিছনে নামক গ্রন্থ।

রকের লিখিত বই গুলোর মধ্যে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বইটি পাঠক মহলে সব চেয়ে বেশী সমাদৃত হয়েছে। এই বইটি যে পটভূমিতে রচিত হয়েছিলো তা হলো স্পেনের গৃহ যুদ্ব, যা ১৯৩৬ সালে ছড়িয়ে পড়ে এবং এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উন্মেষ ঘটায় এবং রাজনৈতিক মঞ্চে প্রথম বারের মত প্রথম বিশ্বযুদ্ব ও রাশিয়ার বিপ্লবের পর এটাই ছিলো মানুষের সামনে এক মাত্র আলোক বর্তিকা। ১৯৩৬ সালে ফ্রেডারিক ওয়ারবার্গ সেই সময়ে প্রকাশনার ব্যবসায়ে মার্টিন সিকার কে নিয়ে নয়া কোম্পানী গঠন করেন যার নামকরন করা হয় সিকার এন্ড ওয়ারবার্গ, এটা ছিলো তখন লন্ডনের একটি উল্লেখ যোগ্য প্রকাশনা প্রতিস্টান।

এই প্রকাশনা প্রতিস্টানটির কর্তাগন সেই সময়ে ভাল ভাল পুস্তকের সন্দ্বানে ছিলেন, বিশেষ করে বিদেশী লিখকদের রাজনৈতিক বই। যে সকল বইয়ে মুক্ত স্বাধীন চিন্তার প্রতিফলন আছে – এই বিষয়ে তিনি তাঁর স্মৃতিকথা দ্বিতীয় খন্ডে প্রকাশ করেছেন। সকল লিখকই সমান (১৯৭৩) তিনি সংগ্রহ করেন সমাজতান্ত্রিক, এনার্কিস্ট, র্যা ডিকেল, এবং মুক্ত সমাজবাদি ও শান্তিবাদি লিখক নির্বিচারে তাঁদের লিখিত গ্রন্থমালা, যারা নিরাজবাদি প্রকাশনার বিশাল ভূমিকা পালন করেন ( এঁদের মধ্যে আছেন, জুমু কেনিয়াত্তা। ইতেল মানিন, জর্জ ওরেল, রেজিন্যাল্ড রেন্যাল্ডস এবং এফ, এ রেডলী প্রমুখ)। তিনি বিশেষ করে স্পেনের অভিজ্ঞতা তাঁর প্রথম খন্ডে বর্ননা করেন,তিনি লিখেন একজন ভদ্রলোকের পেশা (১৯৫৯), সেই সময়ে স্পেনের গৃহ যুদ্বের ধামামা চলছিলো। কিন্তু সেখানকার প্রচলিত বাল্য বিবাহ প্রথমেই আমাকে মারাত্মক ভাবে পিড়িত করে, পরবর্তী তিন বছর আমি এই নীতির সমালোচনা করে লিখতে থাকি। রকার এই বিষয়ে অনেক বই লিখেন।( সেই লিখা গুলো জর্জ ওরোয়েলের বাড়ি থেকে কাতালুনিয়া পর্যন্ত নামে পরিচিত)।

স্পেনের সমাজের তখন একটি অন্যতম বিষয় উল্লেখ্য যে, সেই সময়ে বিপ্লবী নিরাজনাবাদিদের দ্বারা একটি শক্তিশালী আন্দোলন চলছিলো। ওয়ারবার্গ তাই নিজে যে আদর্শের প্রতি অনুপ্রানিত সেই আদর্শের উপর আলোকপাত করা বই প্রকাশ করতে সামগ্রীক ভাবে এগিয়ে আসেন। ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে – জাতীয়তাবাদি বিদ্রোহী ও ফালাঞ্জিস্টদের মধ্যে চলছিলো দ্বন্দ্ব অন্য দিকে সমাজতন্ত্রী ও মুক্তিপরায়ন সমাজবাদিদের মধ্যে ও চলছিলো বিরুধ। কমিউনিস্ট কর্তত্ববাদি ও গনপ্রজাতন্ত্রীদের মধ্যেও বিরোধের সীমা ছিলো না। সেই সময়ে ওয়ারবার্গ স্পেন ও সারা বিশ্বের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাজবাদের উপর একটি পুস্তক রচনা করার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবটি এমা গোল্ডম্যান (১৮৬৯-১৯৪০) এর নিকট প্রদান করা হয়, তিনি তখন ইউরূপে একজন বিখ্যাত নিরাজবাদি চিন্তক, তিনি তখন লন্ডনে থেকে স্পেনের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের জন্য কাজ করছিলেন;

তবে সেই সময়ে তাঁর এই রকম একটি বই লিখার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিলো না। তাই তিনি এমন একটি বিশাল কাজের জন্য একজন উপযুক্ত লোক খোজ করছিলেন। অথচ সেই সময়েই এমন একটি বা তাঁর সমপর্যায়ের বই লিখিত হয়ে গেছে। সেই পুস্তকের জন্য এমা গোল্ডম্যানের সহকর্মী অ্যালেকজান্ডার বার্কম্যান (১৮৭০-১৯৩৬) একটি দির্ঘ ভূমিকা ও লিখে দেন। সেই বইটি ১৯২৯ সালে আমারিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন পাশাপাশি আরো একটি পুস্তক প্রকাশিত হয়েছিলো এনার্কিস্ট সাম্যবাদ কি? নামে এবং অতীত ও বর্তমানঃ সাম্যবাদি নিরাজবাদের অ আ ক খ। এর পর ও এমা গোল্ডম্যান রুডলফ রকারকে আরো একটি পূর্নাংগ বই লিখার জন্য বিশেষ ভাবে অনুরুধ করেন। এবং বলেনঃ

... সিন্ডিক্যালিজমের উপর ইংরেজী ভাষায় একটি উন্নত মানের বই লিখা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। এটা করতে পারলে খুবই উত্তম কাজ হবে। প্রকৃত ঘটনা হল প্রকাশক এমন একটি পুস্তক প্রনয়নের জন্য বিশেষ ভেবে অনুরুধ জানাচ্ছেন। তিনি মূলত পাঠক মহলের চাহিদার প্রেক্ষিতেই এই কথা বলছেন। সুপ্রিয় রুডলফ তোমার কাছে অনুরুধ দয়া করে এমন একটি বই লিখ।

তোমার উচিৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এমন একটি কাজ করা। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বিজ্ঞান; নয় এটা হলো গভীর দর্শন। বিপুল সংখ্যক মানুষের নিকট পৌছানোর জন্য এটা দরকার, যা একটি আলোক বর্তিকা হিসাবে কাজ করবে। আমি মনে করি, এখন তুমি ছাড়া এই কাজ আর কেউ করতে পারবেন না। আমি আশা করি তুমি ই এই কাজটি করবে। তুমি তা করতে অস্বীকার করলে তা হবে আমাদের প্রতি নির্দয়তা, তুমি কি বুঝনা এই সময়ে আমেরিকা ও ব্রিটেনের লোকদের সামনে আমাদের আদর্শ পরিস্কার ভাবে তুলে ধরা কত টুকু গুরুত্বপূর্ন? অবশ্যই তুমি এটা ইংরেজীতে লিখবে। যদি মনে কর তবে এটা এখানে আবার পুনঃ লিখন হতে পারে। দয়া করে এই কাজটি সত্ত্বর করে দাও। (৪ মে, ১৯৩৭)
সেই সময়ে রকারে নিকট এই প্রস্তাব টি পছন্দের হলে ও ব্যাস্ততার কারনে দায়িত্ব নিতে পারেন নাই। তবে তিনি ব্যস্ততা কমিয়ে দিয়ে জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি বিষয়ক বইটির ইংরেজী ও স্প্যানিশ অনুবাদের কাজে হাত দেন। পরে অবশ্য সেই কাজ অ্যালেকজান্ডার বার্ক ম্যানের হাতে সমাপ্তি হয়েছিলো। যা পরে আমেরিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি স্পেনের বিষয়ে বেশী মনোযোগী ছিলেন; তিনি প্রাথমিক ভাবে স্পেনের প্রকৃত ঘটনা নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন (১৯৩৬)। তখন তাঁর জীবিকার জন্য ও কাজ করতে হয়েছিলো। কিছু দিন অতিক্রান্ত হবার পর তিনি এমা গোল্ডম্যানের অনুরুধ রক্ষার জন্য অত্র পুস্তকটি লিখার জন্য মনোনিবেশ করেন।

তিনি তাঁর অত্র বইয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আন্দোলন সংগ্রামের উপর ও আলোকপাত করেন। তিনি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার উপর ও বিশদ বিবরন তুলে ধরেন। শ্রমিক আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের সময়কার সঙ্কট ও প্রাসঙ্গিক বিষয়দি রকার চমৎকার ভাবে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেন। ব্রিটেনে রকার অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত হয়ে পড়েন। প্রথম বিশ্ব যুদ্বের সময়ে মুক্তিবাদি প্রবনতার বিকাশ হতে থাকে- বিশেষ করে ইহুদি শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক কাজ চলছিল।

অন্যদিকে পূর্ব লন্ডনে রকার বেশ জনপ্রিয় ব্যাক্তি হয়ে উঠেন- সেই সময়ে সেখানে তিনি নানা ভাবে সিন্ডিক্যালিস্ট শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলার চেস্টায় ছিলেন। এটা ১৯৩০ সালের কথা। ১৯৫০ সালে ব্রিটেনে সিন্ডিক্যালিস্ট ফেডারেশন বেশ উজ্জিবিত হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু তা বশী দিন স্থায়ী হয় নাই। ১৯৭৯ সালে ডাইরেক্ট একশন কার্যক্রমের আওতায়, বেশ কিছু শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন আবার জোরদার হয়ে উঠে। তবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের মৌলিক নীতিমালা যেমন- স্ব ব্যবস্থাপনা, স্ব নিয়ন্ত্রন, সরাসরি কাজ, স্বতস্ফুর্ততা, সম্মিলিত কাজ, মুক্তিপরায়নতা – ইত্যাদি। বাস্তবায়নের কাজ ও সর্বত্র চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

গতানুগতিক কর্মের পাশাপাশি রকার আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের কাজ ও গতিশীল করার চেষ্টা করেন। এতে লিখক ড্যানিয়েল গুড়িয়েন এবং নোয়াম চমস্কি ও যুক্ত হন। তবে আসল কথা হলো, মুক্তিপরায়ন মানুষের জন্য রকার নিরাজবাদি চিন্তা চেতনা ও আদর্শকে মুক্তির পথ হিসাবে দেখেন। তিনি তাঁর সময়ে যে দলিল ও বই পুস্তক রেখে গেছেন, যা এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আদর্শ হিসাবে অবিরত মানুষের মুক্তির পথ প্রদর্শন করে যাবে। তাঁর অত্র গ্রন্থটি একটি চমৎকার বই যা দুনিয়ার পাঠকদেরকে মানব মুক্তির পথে অনুপ্রেরনা যোগিয়ে যাবে।

নিকোলাস ওয়াল্টার লন্ডন, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ

প্রথম অধ্যায়

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ: উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ হলো আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ন বুদ্বিবৃত্তিক রাজনৈতিক চিন্তার শ্রুতধারা, যা তাঁর অনুসারীদের মধ্যে অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ, রাজনৈতিক এবং সামাজিক নিপিড়ন মূলক প্রতিস্টানের বিলয় ঘটিয়ে দিতে চায়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ‘মুক্তসমিতির ফেডারেশনের’ মাধ্যমে সকল প্রকার উৎপাদন পদ্বতি পরিচালনা করতে চায়, যার লক্ষ্যই হবে সমাজের প্রতিটি সদস্যের চাহিদা মেটানো, তা কোন ভাবেই প্রচলিত সমাজের স্বল্প সংখ্যক মানুষের সুবিধা ভোগ ও নিয়ন্ত্রন চলতে দিবে না। প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে প্রানহীন যান্ত্রিক আমলতন্ত্র চলছে তার পরিবর্তে স্বাধীন, মুক্ত ও প্রাণবন্ত মানুষের সংস্থা গড়ে তুলবে, তবে সকলে সকলের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতি স্বার্থে পারস্পরিক বন্দ্বনে আবদ্ব থাকবে, এবং স্ব স্ব কর্ম সম্পাদনের জন্য তাঁরা স্বাধীন ও স্বেচ্ছাকৃত চুক্তির আওতায় জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে উঠবেন।

প্রচলিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করলে এটা পরিস্কার হয়ে উঠে যে, নিরাজবাদ কোন কল্পনা বিলাশী চিন্তক সংস্কারবাদির ধারনা নয় বা আলস চিন্তার ফসল নয়। এটা হলো সম্পূর্ন যুক্তিভিত্তিক বাস্তব সম্মত ও প্রয়োগ যোগ্য একটি জীবন ব্যবস্থার নাম। যা মানব সমাজকে একটি নয়া ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে। সমাজকে সামগ্রীক ভাবে উন্নিত করবে অন্য এক নয়া স্তরে। প্রচলিত একচাটিয়াবাদ, পুঁজিবাদ, এবং কর্তৃত্ববাদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা মানুষের জন্য কেবল দুঃখ আর যন্ত্রনাই ডেকে আনছে। মানুষের কষ্ট লাগবে তেমন কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না। যুদ্ব, খুন আর রক্তপাত নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে আছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থায় মাত্র কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। স্বল্প সঙ্খ্যার সুবিধা ভোগী মানুষেরা ক্রমাগত ভাবে সাধারন মানুষকে নিঃস্ব থেকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। ফলে মানুষের মাঝে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহের সৃষ্টি হলে, তাঁরা তা নানা কৌশল অবলম্বন ও শক্তি ব্যবহার করে তাদেরকে দমিয়ে রাখার প্রায়স চালায়। এই ব্যবস্থা সামাজিক স্বার্থকে ব্যাক্তি স্বার্থের নিকট বলি দিয়ে দেয়, তা ও করে একটি বিশেষ আইনী কাঠামোর ভেতর দিয়ে। এরা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে। মানুষ ভুলে যাচ্ছে যে, শিল্পকারখানা কোন চূড়ান্ত বিষয় নয়, জীবনের শেষ পাওয়া ও নয় বরং এটা হলো মানুষের সুন্দর জীবন যাপনের একটি উপায় মাত্র, মানুষকে একটি উন্নত সংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে হবে। প্রচলিত ভাবনা মানুষকে আবিস্ট করে রেখেছে এমন ভাবে যে, তাঁরা ভাবতে শুরু করেছে, মানুষ কিছুই নয় শিল্প কারখানাই সব কিছু, ফলে একটি নির্দয়, নিস্টুর, দয়া, মায়াহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আর রাজনৈতিক পরিবেশ ও সেই ধারায় আবর্তিত হয়ে চলেছে। এই গুলো পরাস্পরিক সমন্বয়ে পরিচালিত হয় এবং একেই বৃত্তে আবর্তিত হয়।

অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ কায়েম করে একনাকত্ব আর রাজনৈতিক একনাকত্ব ডেকে আনে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার। উভয়ই সামাজিক উদ্দেশ্যে প্রবৃদ্বি ঘটিয়ে থাকে, এই উভয় উপাদান সমূহ ই সামাজিক ভাবে জীবন কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার বিপরিতে যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে থাকে। ছন্দপতন ঘটায় মানবিক জীবনের। আধুনিক সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিটি দেশের সমাজ ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে, নানা ভাবে সামাজিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের, ক্ষোভ ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়ে চলেছে, সমাজের চলমান সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলেছে; আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে নানা প্রকার সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটাচ্ছে। আমাদের হাজার বছরের লালিত সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়েছে।

বিগত বিশ্ব যুদ্বের পর থেকে রাজনৈতিক শক্তি সমূহের মাঝে চলছে হানাহানি, দুনিয়া জুড়ে চলছে একপ্রকার মরন লড়াই, তা প্রায় সকল মানুষকেই কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত করছে, এই ধরনের নিস্ফল অনন্ত লড়াই ও যুদ্বের সত্যিকার কোন যুক্তি নেই, যা আমাদেরকে এক প্রকার অপ্রত্যাশিত মহা দুর্যোগের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যদি সামাজিক কোন উন্নয়ন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ গ্রহন করা না হয় তবে এই অবস্থার অবসান হবার কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতির কারনে কোন কোন দেশে সামরিক ব্যয় ৮০% থেকে ১০০%+ বাজেট বৃদ্বি করে চলেছে। সামরিক প্রতিরক্ষার নামে বিপুল খরচ করার কারনে যেমন বাড়ছে জাতীয় ঋনের বোঁঝা অন্য দিকে সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে দেশের সাধারন মানুষ।
প্রানহীন ও যান্ত্রিক আমলাতন্ত্র মানুষের জীবন যাত্রা সহজী করনের পরিবর্তে সামাজিক জীবনে বিভক্তি সৃষ্টি করছে, এরা পারস্পরিক সহযোগীতার ক্ষেত্রকে দুষিত করে দিয়েছে, ফলে সামাজিক উন্নয়নের নয়া পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিটি পদক্ষেপ এমন যে, এটা মানুষের মাঝে বিরাজমান পারস্পরিক কল্যাণ কামিতার মনোভাবকে তিরোহিত করে সামাজিক বন্দ্বনকে নষ্ট করে দেয়, এবং এক শ্রেনীর লোক এই সুযোগে ক্ষমতার লোভ লালসাকে চরিতার্থ করতে অর্থ সম্পদ ও ঐতিহ্যকে স্বীয় স্বার্থ উদ্দারের লড়াইয়ে পরস্পরের বিরুদ্বে ব্যবহার করছে।

এই ব্যবস্থাটি অনেক ক্ষেত্রেই শান্তির পথ হিসাবে তথাকথিত বড় বড় বুদ্বিজীবীগন আজ কাল দেখাতে চাইছেন, অথচ এটা হলো এক ধনের আধুনিক ফ্যাসিবাদ, সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোকে অবদমন করে নিজেদের নিরংকুশ রাজত্ব কায়েম করে রাষ্ট্রের নামে সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রন বজায় রাখতে চায়। এটা অনেকটা ধর্মীয় ভাবধারার মত, সেখানে বলা হয় সকল কিছুর নিয়ন্ত্রন ইশ্বরের আর এখানে বলা হয় সকল প্রকার নিয়ন্ত্রন রাষ্ট্রের নিকট, মানুষ কিছু নয়; কিছুই করার ক্ষমতা নেই মানুষের। যা ঘটে সবই হয় “প্রভুর ইচ্ছায়”। আর আজ বলায় হচ্ছে যা ঘটে তা হয় “রাষ্ট্রের ইচ্ছায়”। আদতে এই সকল ব্যাখ্যা সম্পূর্ন ভাবে এক শ্রেনীর কায়েমী স্বার্থবাদি চক্রের ব্যাখ্যা। এই ধরনের ব্যাখ্যা সত্যিকার জ্ঞানকান্ড থেকে বহু দূরে অবস্থিত।

এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদি ধারনার ইতিহাস বেশ দির্ঘ, তবে তা এখনো নানা ভাবে মাঠ পর্যায়ে গবেষণার দাবী রাখে। আমরা এখানে চিনের প্রখ্যাত চিন্তক লাওতসের কথা বলতে পারি, এবং তাঁর পরবর্তীতে গ্রীক দার্শনি হেডনিস্ট এবং সিননিক্স যারা “প্রাকৃতিক অধিকার” নিয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা জেনুতে প্ল্যাতোর পাশাপাশি স্টোইক স্কুল প্রতিস্টা করেছেন। তাঁরা সেখানে আলেকজান্দ্রীয়াতে নোইস্টিক ও কারপোক্রেটের শিক্ষায় অভিষিক্ত হয়ে প্রচারনা কালে ফ্রান্স, জার্মানী,হল্যান্ড প্রভৃতি দেশে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান যাজকদের নিপিড়নের শিকার হন। বোহেমিয়ানদের সংস্কার আন্দোলন কালে ও তাঁরা পিটার চিল্কির চিন্তার সাথে পরিচিত হন, যার কাজের ও চিন্তার ক্ষেত্র ছিলো, “বিশ্বাসের মানবিক সম্পর্কের বুনন” তাঁদের সাথেও চার্চ ও রাষ্ট্রের কর্তা লোকেরা একেই ব্যবহার করেছে।

লিও টলস্টয়ের সাথে ও একেই আচরন করেচিলো সেই মুর্খ চক্র। মহান মানবতাবাদিদের মধ্যে একজন ছিলেন রেবেলিস, তিনি সুখি জীবন যাপনের জন্য তেলেমে হেপী এব্বে তে যে বর্ননা দিয়েছিলেন, যার মুল কথা ছিলো সকল প্রকার কর্তৃত্বতান্ত্রিকতা থেকে মানুষের মুক্তি চাই। উদারবাদী ভাবধারার অন্য অগ্রগামীদের মধ্যে আমরা এখানে কেবলমাত্র লা বোয়েটি, সিলভাইন মারেচ, এবং সর্বোপরি, ডিডরোটের কথা উল্লেখ করব, যার প্রখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে সত্যিকারের একটি মহান কথা নিবিড়ভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে, তা হলো, কোন কর্তৃত্ববাদীই নিপিড়ন মুলক কার্যক্রম থেকে মুক্ত ছিল না।

এদিকে, সাম্প্রতিক কালে নিরাজবাদি ধারনা সামাজিক বিবর্তনের ধারায় প্রয়োগ করার জন্য চিন্তাশীল সমাজবাদিদের মধ্যে প্রকট হচ্ছে। ১৭৯৩ সাল, লন্ডনে, এই ধরনের কিছু ভালো উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে উইলিয়াম গডউইনের কাজে, রাজনৈতিক ন্যায় বিচার, সামাজিক মানুষের শান্তির বিষয় গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা বলতে পারি, গডউইনের কাজ ছিল, এটা দেখানো যে, ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক চরমপন্থার ধারণাগুলির যে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস যার ফল শ্রুতিতে এই ধারনার উন্মেষ হয়েছে। যা রিচার্ড হুকার, জেরার্ড উইনস্টিনলি, অ্যালগরনন সিডনি, জন লকে, রবার্ট ওয়ালেস, এবং জন বেলার্স থেকে জেরেমি বেন্টহাম, জোসেফ প্রিস্ট্লি, রিচার্ড প্রাইস, এবং টমাস পেইন প্রমুখ সকলেই একমত ছিলেন।

গডউইন খুবই সাহসীকতার সাথে মতামত দিয়েছিলেন যে, সামাজিক শয়তানীর কারণটি “রাষ্ট্রের আকারে নয়, বরং তার অস্তিত্বের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে”। ঠিক যেমন রাষ্ট্র প্রকৃত সমাজের একটি নক্সা প্রদর্শন করে, তেমনি এটি মানুষকে তাদের অনন্ত অভিভাবকত্বের অধীনে রাখে, যা তাদের প্রকৃত আত্মার নিছক কণ্ঠস্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে এবং তাদের স্বাভাবিক প্রবণতাগুলি দমন করে ও তাদের কাজে এমন জিনিসগুলি ধারণ করে যা প্রতিহিংসামূলক নয় বরং ইহা তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেরনা। শুধু এই ভাবেই ভালো নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলার জন্য মানুষকে একটি ছাঁচে ফেলা দরকার। যখন কোন সাধারন মানুষকে কোন প্রকার বাঁধা বিপত্তিতে ফেলা হয় না, বা বাঁধা প্রাপ্ত করা হয় না, সে যখন স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে, তখন তাঁর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। গডউইন দেখিয়েছেন, মানুষ কেবল সম্মিলিত ভাবে সামাজিক জীবন যাপন করতে পারে, যদি তাঁর উপর কোণ প্রকার কর্তৃত্ববাদ বা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রন আরোপ করা না হয়। যতক্ষন পর্যন্ত তাকে প্রজা বানিয়ে শোষন করা না হয় ততক্ষন সে স্বাধীন ও মুক্ত জীবন যাপন করে। কোন প্রকার চরম পন্থার দিকে প্রায়স অগ্রসর হয় না।

তাই আমরা প্রস্তাব করি রাষ্ট্র যত বেশী প্রভাব বিস্তার করা থেকে বিরত থাকবে ততই মঙ্গল হয় নাগরিক সমাজের। গডউইনের মতবাদই হলো, রাষ্ট্রবিহীন সমাজ এবং সকল প্রকৃতিক সমপদের উপর সমাজের মালিকানা কয়েম করা, এবং অর্থনৈতিক জীবন যাপনে সম্মিলিত উৎপাদন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা; এই অর্থে গডউইনকে সমাজতান্ত্রিক নিরাজবাদের জনক বলা যায়। গডউইনের কর্মের শক্তিশালী প্রভাব পড়েছিলো ইংরেজ শ্রমজিবী মানুষ ও তাঁদের উদার পন্থী বুদ্বিজীবী মহলে। তাঁর বড় অবদান হলো, তিনি ইংলিশ সমাজে তরুন সমাজের মাঝে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করতে পেরেছিলেন। সেই আন্দোলনে যারা বিশেষ ভূমিকা রাখেন তাঁরা হলেন, রবার্ট ওয়েন, জন গেরী, এবং উইলিয়াম থমচন, যাদের মাঝে মুক্তিবাদি একটি চেতনা বিরাজ করত, যা আমরা জার্মানী বা অন্যান্য দেশে দেখতে পাইনা।

তবে, নিরাজবাদ বা এনার্কিজম বিনির্মানের ক্ষেত্রে পেরী জুসেফ প্রুদ র প্রভাব ও ছিলো ব্যাপক হারে সমগ্র ইউরূপ জোড়ে, তিনিবুদ্বি বৃত্তিক জগতে আধুনিক সমাজতন্ত্রকে অধিকতর শক্তিশালী করে গেছেন। প্রুদোয়ান চিন্তার প্রতিফলন আমরা সেই সময়ে দেখতে পাই বুদ্বিজীবী ও সামজিক জীবনে, তিনি সকল সামাজিক জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে দিয়ে এই মতবাদকে পরিপূর্নতা দানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তাই, তাঁর মূল্যায়ন করতে হলে, তাঁর অগনিত অনুসারীদের দিকে নজর দিতে হবে, যারা তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর অগনিত সমাজবাদি অনুসারী চিন্তকগন তাঁর প্রচন্ড অনুরাগী ছিলেন, তাঁরা সকলেই বুঝতে পারতেন যে, সমাজটি অসম বা ভুলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাঁরা তাঁদের দৃষ্টি ভঙ্গীকে প্রসারিত করে একটি নয়া সমাজের স্বপ্ন ও দেখছিলেন।

তিনি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি অসংগতি নিয়ে খোলাখুলি সমালোচনা করছিলেন। তিনি দেখাচ্ছিলেন, সামাজিক বিবর্তন সমাজের ভেতর থেকেই উত্থিত হচ্ছে যা আমাদের জীবন যাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে, আমাদেরকে একটি উন্নত সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে টেনে নিয়ে যাবে, সেটা কোন কল্পলোকের বিষয় নয়, সেটা বাস্তব সম্মত ও জীবন ধর্মী বিষয়। চিন্তক প্রুদু জ্যাকবিনদের ঐতিহ্যের বিরুধীতা করছিলেন। সেই সময়ে ফ্রান্সের সমাজবাদি ভাবনার জগতে তা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলছিলো। যার আলোচ্য বিষয়ই ছিলো কেন্দ্রীয় সরকার ও একচাটিয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সামাজিক প্রগতি। তিনি বলছিলেন সমাজকে মুক্ত করতে চাইলে সমাজের ভেতরে বেড়ে উঠা দুটি ক্যানসার কেটে বাদ দিতে হবে- উনবিংশ শতাব্দির বিপ্লবের জন্য তা অতিব জরুরী বিষয়। প্রুদু কমিউনিস্ট ছিলেন না।

তিনি ব্যাক্তিগত সম্পত্তির নিন্দা করতেন, তিনি বলতেন এটা শোষণের হাতিয়ার। তিনি সকল উৎপাদন ব্যবস্থার ও যন্ত্রপাতির মালিকানার শ্রমিকদের জন্য দাবী করেছিলেন। তিনি বলতেন শিল্প কারখানার মালিকানা থাকবে তাঁদের নিকট এরা স্বেচ্ছাকৃত চুক্তির মাধম্যে তা পরিচালনা করবে। কেউ কাউকে শোষণ বা বঞ্চনা করার সুযোগই পাবে না। সকল ক্ষেত্রে মানবিক মার্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের সংস্থা সমূহে সাম্য সমাতা বিরাজমান থাকবে, সকলেই সমান অধিকার, সমসেবা উপভোগ করবেন। কোন পন্যের মূল্য নির্ধারনের জন্য তাঁর উৎপাদন সময়কে বিবেচনায় নেয়া হবে এবং তা বিনিময়ের ক্ষেত্রে ও তা বিবেচ্য হবে। পুঁজি নানা ভাবে মানুষকে শোষণ করে, তাই, কর্ম সময়কে মূল্যায়ন করা হবে- এই প্রক্রিয়ায় তাঁর লাগাম টানা হবে।

এই প্রক্রিয়া সকল জায়গায় শোষন যন্ত্রের উচ্ছেদ চলবে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক নিপীড়ন কে উৎসাহিত করছে। আমাদের সমাজ হবে নানা জাতি গৌস্টির একটি স্বাধীন সম্মিলিত মহাজোট তাঁরা তাঁদের প্রয়োজন ও চাহিদার আলোকে উৎপাদন সহ সকল কিছুর পরিকল্পনা গ্রহন করবে। তাঁরা তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ও নিজেদের দ্বন্দ্ব নিজেরাই মিটিয়ে নিবে। “ সমাজে স্বাধীন সামাজিক ব্যবসা থাকবে যা সমাজের জন্য ই ভালো হবে”। প্রুদু ফেডারেশনের আওতাভুক্ত সংগঠন সমূহের কর্ম কান্ডকে আগামী বিশ্বের জীবন ধারা হিসাবে দেখেছেন। সেখানে তিনি ব্যাক্তি মানুষের উন্নত একটি স্বাধীন পরিবেশ চিন্তা করেছে। তিনি উন্নয়নের জন্য সুনির্দিস্ট কোন সীমা ঠিক করেন নাই। তিনি বরং সমাজ ও ব্যাক্তির কাজের উন্নয়নের জন্য বৃহত্তর পরিশরের কথা বলেছেন।

তিনি ফেডারেশনের ধারনার উন্মেষ ঘটান, একেই ভাবে রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের উত্থানে ভূমিকা রাখেন, সেই সময়ে জাতীয়তাবাদের বিকাশে ম্যাজ্জিনি, গ্যারিবালদি, লেলুয়েল এবং অন্যান চিন্তকগন ও কাজ করেন। এই পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর সমসাময়িকদের চেয়ে স্পস্ট দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। প্রুদ সমাজবাদের উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অবদানে ল্যাতিন আমেরিকার লোকেরা বেশী আলোকিত হয়েছিলেন। কিন্তু তথাকথিত ব্যাক্তিবাদি নৈররাজ্যবাদি, যাদের আমেরিকায় উন্মেষ ঘটেছিলো যেমন, জয়েস ওয়ার্ন, স্টিফেন পিয়ারেল এন্ড্রো, ইউলিয়াম বি, গ্রীন, লিসেন্ডার স্পুনার, ফ্রান্সিস ডি, টেন্ডি এবং বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য ব্যাঞ্জামিন আর, ট্যাকার প্রমুখ একই ধারার লোক। তাঁদের কেহই প্রুদর চিন্তাধারা সাথে একমত হন নাই।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ একটি ব্যাতিক্রম ধর্মী ধারনা পায় ম্যাক্স ট্রেইনেরর নিকট থেকে(জন ক্যাস্পার স্মিথ) ও তাঁর গ্রন্থ সমূহ অধ্যয়ন করে। তাঁর গ্রন্থ ডার এইঞ্জি এন্ড সিন এইজেন্টাম ( দি এগো এন্ড হিজ উওন) প্রকাশিত হবার পর তা তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি, বরং অল্প সময়ের মধ্যেই তা হারিয়ে যায়, নিরাজবাদি আন্দোলনে ও কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্ত মজার বিষয় হলো এই বইটি অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রায় পঞ্চাশ বছর পর পুনঃ জীবন লাভ করে এবং সর্বত্র সাড়া ফেলে দেয়। স্টেইনারের এই বইটি ছিলো প্রথমিক ভাবে একটি দার্শনিক কাজ। এই কাজের মাধ্যমে তিনি দেখান যে, মানুষ প্রায় ৫০ ধরনের উচ্চতর জিনিষের উপর নির্ভরশীল, সে তাঁর পক্ষে যুক্তি তর্ক দিয়ে কথা বলতে ও দ্বিধা করেনা। এই গ্রন্থটি একটি সচেতনতা মূলক গ্রন্থ যা মানুষকে বিদ্রোহী করতে তুলতে পারে, সমজদার পাঠক যে কোন কর্তৃপক্ষকে অস্বীকার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়, তবে এই গ্রন্থ মানুষকে স্বাধীন চিন্তা ভাবনা করার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ মাইকেল বাকুনিনের বিপ্লবী চিন্তা চেতনা ও উদ্যোগ থেকে এগিয়ে যাবার প্রেরনা পায়, তিনি প্রুদুর নিকট থেকে যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তা ছিল তাঁর কাজের ভিত্তি, তিনি তা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্প্রসারিত করেন, প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যে যারা যৌথতাবাদি ছিলেন তাঁরা ও তাঁর সাথে যুক্ত হন, তাঁদের বক্তব্য ছিলো, ভূমি সহ সকল উৎপাদন উপায়ের উপর সামস্টিক মালিকানা কড়াকড়ি ভাবে কায়েমের জন্য জোর দিতে হবে, অন্যদিকে ব্যাক্তি মালিকানা সীমীত করে দিয়ে নিজের শ্রমের ফল নিজেই যেন ভোগ করতে পারে তাঁর ব্যবস্থা করতে হবে।

বাকুনিন কমিউনিজমের বিরুদ্বে অবস্থান নেন, সেই সময়ে কমিউনিজম মানেই ছিলো প্রচন্ড কর্তৃত্ববাদি ব্যবস্থার নাম, যা পরবর্তীতে বলশেভিকবাদ রূপে রাশিয়া সহ নানা দেশে প্রকাশিত হয়। মাইকেল বাকুনিন বার্নে ১৯৬৮ সালে অনুস্টিত শান্তি ও স্বাধীনতা নামক বক্তব্যে বলেন, “ আমি কমিউনিস্ট নই, কারন কমিউনিজম সকল সামাজিক শক্তিকে রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে চাইছে; এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের নিকট সকল সম্পদ পুঞ্জীভূত করে দিবে, আমি চাই সকল রাষ্ট্রের বিলয়, সকল কর্তৃত্ববাদের অবসান, সরকারের মাতুব্বরী বন্দ্ব করতে- এই সব মানুষের নৈতিক শক্তি ও সভ্যতাকে বিনাশ করছে এবং সকলকে দাসত্বে, নিপিড়নে, ও শোষোনের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিচ্ছে”।

মাইক্যাল বাকুনিন একজন সত্যিকার বিপ্লবী চিন্তার মানুষ ছিলেন, তিনি চলমান শ্রেনী দ্বন্দ্বের কোন প্রকার শান্তিপূর্ন সহ অবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন শাসক চক্র কোন ভাবেই সত্যিকার সংস্কার মূলক কাজ করতে দিবে না, এবং একেই ভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সামাজিক বিপ্লবের কথা বলতেন, তিনই বিশ্বব্যাপী সকল প্রকার একনায়কত্ব, আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে মুক্ত শ্রমজীবী মানুষের ফেডারেশন কায়েম করে শান্তিময় জীবন যাপনের কথা বলতেন। যেহেতু তাঁর সমসাময়িক অনেকেই মনে করতেন যে, দুনিয়া জোরে বিপ্লব খুবই নিকটবর্তী তাই তিনি তাঁর সকল শক্তি দিয়ে বিপ্লব যেন সত্যিকার বিপ্লব হয় সেই দিকে কড়া নজর রাখতেন, সকল মুক্তিবাদি শক্তিকে সংগে নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরের পুরাতন ব্যবস্থার উচ্ছেদের পর যেন সেই ব্যবস্থার কোন প্রকার ক্ষতি বা একনায়কত্বের আভির্ভাব না হয় তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। আর সেই জন্যই তাকে আধুনিক এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদি আন্দোলনের প্রবর্তক বলা হয়।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদের একজন অন্যতম চিন্তক ছিলেন পিটার ক্রপতকিন, তিনি আধুনিক প্রকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে সমাজ বিজ্ঞানের ধারনার সমন্বিত করে নিরাজবাদের ধারনাকে অধিকতর শক্তিশালী করতে চেয়ে ছিলেন। তিনির তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব ‘মিউচুয়াল এইড’ এ বিবর্তনবাদ সম্পর্কিত তথাকথিত সামাজিক তথ্যবাদের তালিকার বিরুধিতা করেন, তিনি প্রমান করতে চেষ্টা করেন ডারউইনবাদের মতে, ‘কেবল দূর্বলদের তুলনায় শক্তিমানরাই ঠিকে থাকে’, এই তত্ত্ব সকল ক্ষেত্রে সঠিক না ও হতে পারে, যেখানে সামাজিক মানুষ হয় এর বিষয় বস্তু, সেখানে কঠিন আইনের যাতাকলে পড়ে অনেক সক্ষম মানুষ ও বিপদাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। এই কথা টি ম্যালতুসিয়ান তত্ত্বের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়, যেখানে জীবন প্রবাহকে মানুষের সংখ্যা নিয়ন্ত্রন করে ফেলে। সেই ক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মানুষ নিজেই সেই সত্য প্রতক্ষ্য করে থাকে।

ক্রপতকিন দেখিয়ে দেন যে, প্রকৃতির জগতে যেমন একটি অনিশ্চিত লড়াই সংগ্রাম চলে, বাস্তবের জগতেও সেই সংগ্রামই অব্যাহত আছে, সেখানেও চলছে ঠিকে থাকার এক প্রকারের নির্দয়, নিস্টুর সংগ্রাম। সেই লড়াই ও মরনপন লড়াই, সেখানে ও প্রকৃতিক বিধানের ন্যায় চলছে দূর্বলের উপর সবলের প্রধান্য বজায় রাখার এক নিরন্থর যুদ্ব। সামাজিক বিবর্তন এবং সামাজিক সম্মিলিত সহায়তার মাধ্যমেই মানব সমাজ এখনো ঠিকে আছে।

এই অর্থে মানুষ সমাজের নির্মাতা নয়, বরং সমাজই সৃষ্টি করেছে মানুষকে, ঐতিহাসিক ভাবে নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে, নানা জাতি ও প্রজাতির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে, একে অন্যের উপর প্রাধান্যের সৃষ্টি করার জন্য শারিরীক বিকাশ ও সামাজিক শাক্তিভিত এবং উন্নত পরিবেশ গড়ে তুলেছে। মানুষের মাঝে দ্বিতীয় যে প্রবনতাটি লক্ষ্যনীয় তা হলো, তাঁদের বিরুদ্বে কোন আক্রমন ও আগ্রাসনের মোকাবিলা করার প্রবনতা, যা অন্য কোন প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়না, এমন কি তাঁদের শারিরিক শক্তি বেশী হলে ও তাঁরা ক্রমাগত প্রতিরোধের পথে হাঁটে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিক বিজ্ঞানে এখন একটি স্বিকৃত বিষয়ঃ মানব প্রজাতির বিবর্তনের বিষয়ে আজ সামাজিক চিন্তকগন এক নয়া দিগন্তের কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রকৃত বিষয় হলো প্রচলিত ব্যবস্থায় মানুষ ব্যাক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিবাদি সামাজিক চুক্তির দ্বারা আবর্তিত হয়ে থাকে, পরস্পরকে সহযোগিতা করে থাকে, এই সকল উপাদান না থাকলে মানব জীবন অসম্ভব হয়ে পড়বে। সামাজিক মুক্ত চুক্তি যদি বহাল না থাকত তবে রাষ্ট্রের অনেক কঠিন আইন ও সমাজকে বাঁচাতে পারত না। তবে, প্রকৃতিক সেই আচরনিক দিক গুলো মানষের ভেতর থেকেই উত্থিত হয়েছে, যা এখন রাস্ট্রীয় খবরদারী ও অর্থনৈতিক শোষনের কারনে পদে পদে বাঁধা গ্রস্থ হয়ে চলেছে। এই সকল কারনে মানুষের মধ্যে নিস্টুর ও নির্দয় আচরন লক্ষ্য করা যায়, এই অবস্থার অবসান চাইলে কেবল মাত্র সম্মিলিত সহায়তা ও মুক্ত সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাক্তিগত দায়িত্ববোধ, অন্যান্য মানবিক ভালো গুনাবলী গুলো সূপ্রাচীন কাল থেকে মানব সমাজে চর্চিত হয়ে এসেছেঃ তা মানুষের মাঝে জন্ম দিয়েছে পরস্পরের প্রতি সহানুভুতি, সামাজিক নৈতিকতা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার ও স্বাধীনতা।

বাকুনিনের মতই ক্রপতকিন ও বিপ্লবী ছিলেন। কিন্তু তিনি, এলিজ রিক্লোজ এবং অন্যান্য যারা মনে করতেন বিপ্লব নয় বিবর্তনের ভেতর দিয়ে অন্যান্য প্রজাতির মতই বিপ্লব বা পরিবর্তন হবে, তবে তখনই সেই পরিবর্তন দেখা যাবে যখন সমাজকে প্রকৃতিক পরিবেশের ন্যায় চলতে দেয়া হবে বা কর্তৃত্ববাদি ব্যবস্থা থেকে মানবজাতি মুক্তি পাবে। বাকুনিন ও প্রদুর মত ক্রপতকিনও সমাজ ভিত্তিক মালিকানার পক্ষে কথা বলেছেন, কেবল উৎপাদন যন্ত্রের উপর নয়, উৎপাদিত পন্যের উপর মালিকানার ও তিনি দাবী করেছেন। তাঁর মতে, প্রচলিত ব্যবস্থায় যে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে এতে একজন শ্রমিকের ব্যাক্তিগত শ্রমের পরিমান তাঁর মূল্য নির্নয় করা বেশ জটিল বিষয়। তাই সকল মানুষের সম্মিলিত মালিকানা কায়েম করলেই সকলের উন্নয়ন ও কল্যাণ হয়। কমিউনিস্ট এনার্কিজম, যার পক্ষে এর আগে যারা কথা বলেছেন, তাঁরা হলেন জুসেফ ডিজাকু, এলিজ রিক্লোজ, এরিক মালাতিস্তা, কার্লো ক্যাপিরো এবং অন্যান্য চিন্তকগন। এখন এর পক্ষে আরো অনেক বুদ্বিজীবী ও চিন্তককে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে।

সাধারন ভাবে সকল নিরাজবাদি বা এনার্কিস্টদের লক্ষ্য হলো, এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলা যেখানে কোন প্রকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপিড়ন থাকবে না, কেননা এই সকল নিপিড়ন মূলক কর্মকান্ড মানুষের সত্যিকার উন্নয়নের জন্য কঠিন বাঁধা। এই দিক থেকে দেখা যাবে মিউচুয়ালিজম, যৌথতাবাদ, এবং সাম্যবাদ মানুষের উন্নয়নের জন্য খুবই সহায়ক বিষয়, কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষের স্বাধীন সমাজ বিনির্মানের জন্য সুরক্ষক হিসাবে কাজ করতে পারে না। আগামীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ধরনের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করা যেতে পারে, সমাজের ও নানা ধরন ও বিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে একটি প্রকৃত স্বাধীন পরিবেশ বজায় না থাকলে সত্যিকার মানবিক উন্নয়ন আশা করা যায় না।

এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদিদের মধ্যে সমাজ পরিবর্তন নিয়ে নানা ধরনের মতামত আছে। অনেকেই মনে করেন, একটি প্রচণ্ড লড়াই সংগ্রাম ছাড়া সমাজ বিপ্লব বা সামাজিক পরিবর্তন হবে না। সেই সংগ্রামের তিব্রতা নির্ভর করবে যারা সামাজিক পরিবর্তন চায় না তাঁদের প্রতিরোধের শক্তির উপর, নয়া সমাজ ব্যবস্থা গ্রহনের ক্ষেত্রে তাদের প্রক্রিয়াশীল কর্মকান্ডের আকার ও বিস্তৃতির উপর। স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ গ্রহনের জন্য সামাজিক নানা স্তরে তাঁর দাবী উত্থোলন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার উপর ও নির্ভর করছে সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা চাই সামাজিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে কম মাত্রার ক্ষয় ক্ষতি ও সহিংসতা যেন বজায় রাখা যায় সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে।
আধুনিক এনার্কিজম বা নিরাজবাদ দুইটি বিরাট ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, এর একটি হলো ফ্রান্সের বিপ্লব এবং এবং ইউরূপীয়ান বুদ্বিজীবী মহলের কর্ম প্রয়াসঃ সাম্যবাদ ও মুক্তিবাদ। আধুনিক সমাজবাদ সমাজ জীবন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চায়। এটা সরকারের বিলয় ঘটিয়ে সামাজিক প্রশ্নকে উজ্জল করে তুলতে চায়। মানবজাতির মধ্যে সাম্য মৈত্রী কায়েম করে, তত্ত্বগত ধারনার পরিবর্তে বাস্তব দুনিয়ায় একটি উজ্জল দৃস্টান্ত প্রতিস্টা করতে চায়। যা সামাজিক জীবনে এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন হবে। নয়া সমাজে অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ বিদূরিত হবে, উৎপাদন ব্যবস্থার উপর সাধারন মানুষের মালিকানা কায়েম হবে, এক কথায় সমাজ একেবারে আমূল পাল্টে যাবে, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য প্রতিস্টান সমূহের ধরন প্রকৃতি ও পরিচালন পদ্বতী বদলে যাবে। কায়েম হবে সত্যিকার সামাজিক ন্যায় বিচার অবসান হবে শোষণের। সকলেই সকলের জন্য কাজ করার পরিবেশে অভ্যস্থ হয়ে উঠবেন।
সমাজবাদ একটি আন্দোলনের মত সকল জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে, নানা সমাজে, নানা দেশে ভিন্ন ভিন্ন মতামতের ভিত্তিতে বৈচিত্রময় সামাজিক পরিবেশে সামগ্রীক সংহতির অভিপ্রকাশ ঘটবে। প্রকৃত ঘটনা হলো প্রতিটি রাজনৈতিক মতবাদই কোন না কোন ভাবে একনায়কত্ব বা ধর্মীয় পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসেছে, সমাজবাদি আন্দোলন ও এর দ্বারা একটি অংশ আক্রান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে, রাজনীতির শ্রুতধারায় দুইটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় যুক্ত হয়েছে এবং সমাজবাদি ধারনার উন্নয়ন ঘটিয়েছেঃ মুক্তিবাদ, যা এংলো-সেক্সন দেশ সমূহে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, বিশেষ করে স্পেনে। আরো স্পষ্ট করে বলতে হলে বলতে হয় গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা যা চিন্তক রুশো তাঁর সামাজিক চুক্তি নামক বইতে বলেছেন, এই চিন্তাভাবনা এক কালে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো ফ্রান্সের নেতা জে, জ্যাকবিনের উপর। মুক্তিবাদি এই ভাবনা যখন তাত্ত্বিকভাবে প্রচলন হয় তখন বলা হয় রাষ্ট্রীয় প্রভাব কমিয়ে সামাজিক শক্তির উন্মেষ ঘটাতে হবে। রুশো গণতন্ত্রকে একটি সম্মিলিত ধারনার উপর দাঁড় করিয়ে দেন। তিনি “সাধারনের ইচ্ছে” কথাটির উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন, তাঁর এই বক্তব্যকে জাতিরাষ্ট্র বলা হয়েছে।

মুক্তিবাদ এবং গণতন্ত্র রাজনীতির প্রথমিক সবক হিসাবে অভির্ভূত হয়, সেখানেই সংখ্যা গরিস্ট মানুষের মতামতকে গ্রহন করতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়, কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়কে তার আওতায় আনা হয়নি। বা আজো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত হয়নি। গণতন্ত্র তাঁর মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করেছে, “আইনের চোখে সকলেই সমান”, এবং তাঁর সাথে মুক্তিবাদ “ প্রতিটি ব্যাক্তি তাঁর নিজের বিষয়ে নিজেই সিদ্বান্ত গ্রহনের অধিকারী”। এই উভয় নীতি ই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেছে। তাই আমরা দুনিয়ার সকল জায়গায় দেখতে পাচ্ছি, বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের শ্রমশক্তি অল্প কিছু মানুষের নিকট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

যদি নিজের শ্রম বিক্রি করতে না পারে, তাঁরা যদি ক্রেতা না পান, তবে একজন শ্রমিক সমূদ্রের জাহাজের মত তলিয়ে যেতে পারেন। তাই তথাকথিত “আইনের চোখে সকলেই সমান” কথাটি একটি ধান্দাবাজের উপদেশের মতই শোনায়, যারা আইন বানায় তারাই সমাজের সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক। একেই ভাবে একেই কথা প্রযোজ্য হলো, “নিজের বিষয়ে নিজেই সিদ্বান্ত গ্রহনের অধিকার” নীতির প্রশ্নে। এই ধরনের অধিকারের মৃত্যু ঘটে তখনই যখন কোন ব্যাক্তির আর্থিক বিষয়ে অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করে সিদ্বান্ত গ্রহন করতে বাধ্য হয়। তখন তাঁর স্বীয় সকল প্রয়াস অর্থহীন হয়ে যায়।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ সাধারন ভাবে সকলের জন্য মুক্তি চায়, সকল ব্যাক্তি মানুষের জন্য প্রগতি ও সুখ কামনা করে এবং সামাজিক সংহতি নিশ্চিত করতে বদ্বপরিকর। স্বাধীন মুক্ত চিন্তার প্রতিফলন সকল স্তরে প্রাসারিত করতে কাজ করে, এটা সরকারি হস্তক্ষেপ তিরোহিত করে দিবে। এই মতবাদের অনুসারীগন সামগ্রীকভাবে যৌক্তিক পরিনতির মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক প্রতিস্টান সমূহের বিলয় ঘটিয়ে একটি জীবন্ত সমাজ কায়েম করবে। যখন জেফার্সন মুক্তিবাদের জন্য কথা বলতে শুরু করেন এই ভাবে, “সেই সরকারই উত্তম যে সরকার কম হস্তক্ষেপ করে”, আর এর্নাকিস্ট তোরে বলেন, “এই সরকারই উত্তম, যে সরকার কোন ভূমিকাই রাখেন না, এমানকি সমাজবাদ কায়েমকারীগন ও নয়, নিরাজবাদিদের দাবী হলো তিরীহিত কর অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদ, কায়েম কর ভূমি ও কারখানায় সাধারন জনগণের মালিকানা। যা সকল মানুষের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবেঃ সকল মানুষের ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সাম্য নিশ্চিত করবে, এনার্কিস্টদের সমাজবাদি আন্দোলন চায় পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করতে এবং সকল যুদ্বের অবসান করতে। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিস্টানের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অর্থনৈতিক শোষণ এবং হাতে হাত ধরে চলেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন। মানুষ মানুষকে শোষন করছে, মানুষ মানুষের উপর প্রভু হয়ে বসেছে, এই চিত্র চলে এসেছে দির্ঘ কাল ধরে।

যতদিন সমাজে প্রভূত্ব বিস্তারকারী শ্রেনী বা যারা তেমন প্রভাবশালী নন এমন লোকদের মাঝে একটা বিরুধীয় বা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। যখন একটি রাষ্ট্রে কতিপয় লোক বা একটি স্বল্প জনগৌস্টির লোক অন্যদের উপর সুযোগ নেবার তালে থাকে। ততক্ষন এক পক্ষ অন্য নিরিহ পক্ষকে শোষন করবেই। তাই এই ধরনের পরিবেশ সমাজ থেকে বিতারন করতে হবে, তখন কারো আলাদা কোন সুযোগ সুবিধা থাকবে না, মানুষের উপর প্রশাসনের ও খবরদারী করার দরকার নেই, সেই প্রসঙ্গে সাধক সিমন বলেছিলেন, “ একদিন এমন এক সময় আসবে যখন সরকার বলে কোন বস্তু থাকবে না, একটি নয়া ব্যবস্থা তাঁর জায়গা দখল করবে, সেই ব্যবস্থার দ্বারাই সকল কিছু পরিচালিত হবে”।

সেই ধারনার মতই কার্ল মার্ক্স একটি নয়া ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, তিনি প্রলেতারিয়েতদের একনাকত্বের ধারানার প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন, তিনি বলেছিলেন, একটি শ্রেনীহীন সমাজ বিনির্মানের জন্য এটা হবে একটি অন্তর্বতীকালিন ব্যবস্থা। তিনি আরো প্রস্তাব করেন, শ্রেনীর দ্বন্দ্ব, শ্রেনী স্বার্থ যখন থাকবে না তখন রাষ্ট্র আপনা আপনিই বিলয় হয়ে যাবে। এই ধরনের ধারনা সামগ্রীক ভাবে ছিলো ভূলে ভরা, ঐতিহাসিক ভাবে রাষ্ট্রের যে ধর্ম, ধরন বা প্রকৃতি যেখানে সর্বদা বিরাজ করে রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা। তথাকথিত অর্থনৈতিক বস্তুবাদের যৌক্তি দিয়ে বলা হয়েছিলো উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি সমাজের “ রাজনৈতিক ও বিচারিক উপরি কাঠামো” গড়ে উঠে, “অর্থনৈতিক কাঠামোর” উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে সামাজিক সৌধ। একটি ঐতিহাসিক তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে এইরূপ ভাবনার জন্ম হয়। বাস্তবতা হলো, ইতিহাসের নানা বাঁকে আমরা দেখতে পাই নানা সময়ে অর্থনৈতিক পঠ পরিবর্তন হয়েছে, কখনো এগিয়েছে আবার পিছিয়ে , কিন্তু রাজনৈতিক ধরন প্রকৃতির তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য পরিবর্তনই ঘটে নাই।

আমরা স্পেনের দিকে যদি দৃষ্টি দেই তবে দেখব যে, সেখানে যখন রাজতন্ত্র অনেক শক্তিশালী অবস্থায় বিরাজমান ছিল তখন ও সেখানে অর্থনীতির বিশাল অংশ দখল করে ছিলো শিল্পের প্রধান্য। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিল্প ভিত্তিক অর্থনীতি বিরাজ করছিলো। এমন কি ইউরূপের প্রতিটি দেশের তুলনায় এরাই ছিলো অগ্রগামী। কিন্তু রাজতন্ত্র যখন তাঁর হস্তক্ষেপ করা বাড়িয়ে দেয় তখনই শিল্পে ধ্বংস নেমে আসে। শিল্প গুলো ঘুড়িয়ে দেয়া হয় এমন কি আদি যুগের দিকে ফিরে যেতে থাকে। কৃষি বিনষ্ট হয়ে গেল, উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেল। পানির জন্য তৈরী করা খাল, নালা, বন্দ্ব করে দেয়া হলো, কৃষি ভূমি পরিণত হল মরুভূমিতে। সেই যে স্পেনের পিছিয়ে পড়া যা আজো পুরন করতে পারে নাই। একটি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য একটি বিশাল জাতি শত শত বছর ধরে অর্থনৈতিক অভিশাপের শিকার হয়।

ইউরূপের একনায়কত্বের স্বৈরতান্ত্রিকতা, “ অর্থনৈতিক নীতিমালা” এবং “ শিল্প আইনঃ” যা দাসত্বের জন্য শাস্তির বিধান রাখলে ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে আবার আগ্রসনকে ও প্রশ্রয় দেয়া হয়, সেই জঠিল বিধি বিধান দির্ঘকাল ইউরূপের শিল্প উন্নয়নকে বাঁধা গ্রস্থ করে দেয়, এটা সকল কিছুর স্বাভাবিক বিকাশকে থামিয়ে রেখেছিলো। সেখানে রাজনৈতিক শক্তির কোন প্রকার তোয়াক্কাই করা হয়নি, তা বিশ্ব যুদ্বের পর যখন সামগ্রীক ভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কট চলছিল তখনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত্বদেরকে সুরক্ষা দেয়া হয়। তারাই ফ্যাসিবাদি চক্রকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে তাঁদের কু কর্মের রাস্তা প্রসারিত করে দেয়। আধুনিক অর্থনীতি যে ধরনের রাজনীতি প্রত্যাশা করে তা সেখানে ছিটেফোঁটা ও দেখা গেল না।

রাশিয়াতে তথাকথিত “প্রলেতারিয়েত একনায়কত্বের” নামে বাস্তবতাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে একটি দলীয় একনায়কত্ব কায়েম করা হয়, যেখানে কোন প্রাকার সামাজিক শক্তির উন্মেষ ঘটতে দেয়া হয়নি, যারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারত। অথচ উন্নয়নের নামে পুরোজাতির শ্রমজীবী মানুষকে এক প্রকার কারাগারে নিক্ষেপ করে দাসে পরিণত করে দিয়ে নোংরা রাস্ট্রীয় পুঁজিবাদ কায়েম করে ফেলে। সেই “প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব” জাতির সামগ্রীক অবস্থাকে নড়বরে করে দেয়, ফলে সতিকার সমাজবাদ কায়েম করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।বরং ক্রমে সেখানে এক বীভৎস স্বৈরাচার কায়েম হয়, ফলে রাশিয়া একটি ফ্যাসিবাদি দেশ ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনি।

বলা হয়ে থাকে যে, রাষ্ট্রের উচিৎ হলো শ্রেনী সংগ্রামকে চালু রাখা, যত দিন শ্রেনীর অবসান না হবে। নির্মূল না হবে শ্রেনী ভাবনার। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বলে, আসলেই এই সকল কথা হলো এক প্রকার বাজে কৌতুক। প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিই হলো এক প্রকার দাস তৈরীর কারখানা, রাষ্ট্রের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য তাদেরকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়। বাহ্যিক ভাবে বলা হয়, একটি রাষ্ট্র আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের জন্য কৃত্রিম বিরোধের সূত্রপাত করে থাকে, যা মূলত নিজেদের স্বার্থকে উর্ধে তুলার জন্য বা অস্থিত্ব প্রমান করার জন্য। অথচ স্ব স্ব দেশে নানা প্রকারের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ও সাংস্কৃতিক শ্রেনী বিদ্যমান রয়েছে। রাষ্ট্র এক দিকে নাগরিকদের অধিকার রক্ষার কথা বলে আবার অন্য দিকে অধিকার কেড়ে নেবার আয়োজন করে; এটা করতে করতেই রাষ্ট্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

একটি বড় রাষ্ট্র যখন বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সরকার বদল হয় বা অস্থিত্ব লাভ করে তখনই তাঁর পুরতান সুবিধা ভোগী শ্রেনী তাঁদের নিজেদের আখের গুছিয়ে নেবার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, এরা নিজের প্রভূত্ব বজায় রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্ভন করে। আমরা রাশিয়ার ক্ষেত্রে ও তাই দেখতে পাই, বলশেভিক দের উত্থানের পর একটি ক্ষুদ্র শাসক চক্র প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের নামে ক্ষমতায় অধিস্টিত হয়, তাঁরা সমগ্র রাশিয়ার জনগণের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করে বসে, সেখানে আগের মতই ভিন্নমাত্রার এক প্রভুত্বের রাজত্ব চলতে থাকে। এই নয়া শাসক শ্রেনী, অল্প সময়ের মধ্যেই এক আভিজাত্যের রূপ ধারন করতে থাকে। তাঁরা নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেনী থেকে পৃথক করে সুবিধা ভূগী শ্রেনীতে পরিণত হয়। সাধারন মানুষের সাথে এঁদের কোন সম্পর্কই আর থাকে না।

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, রাশিয়ার কমিশারতন্ত্র এবং তাঁদের গৌস্টির লোকেরা অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের শিল্প কারখানের মালিকদের চেয়ে কোন ভাবেই পিছিয়ে ছিলো না। এই প্রসঙ্গে কোন প্রকার সমালোচনা বা আপত্তি গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তাঁদের অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহনের মাত্রা যতই বাড়তে থাকে তাঁদের অধীন সাধারন জনগণের জীবন যাত্রার মান ততই কমতে থাকে। প্রভাব ফেলতে থাকে তাঁদের দৈনিন্দিন জীবনে। আমেরিকার একজন সাধারন শ্রমিক, ভালোভাবে কাজ করলে এবং যথাযথ নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন করলে খাদ্য, কাপড়, গৃহ সহ মানবিক জীবন ধারন করতে কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু তাঁদের পক্ষে মিলিয়নার হওয়া বেশ কঠিন বিষয়।

এমন কি যারা ছোট খাট আমলা তাঁদের পক্ষে ও তা সম্ভব হয় না। এমন কি লোকেরা স্বচ্ছল জীবন হারানোর ভয়ে থাকে, বসবাসের জন্য অচেনা লোকের সাথে গৃহ বেচে নিতে হয়, যারা অধিক উন্নত উৎপাদন কর্মে নিয়োজিত তাঁদের ক্ষমতা হয়ত কিছু বেশী। কিন্তু উঁচু যারা শ্রেনীর লোক তাঁদের তুলনায় এঁদের কিছুই নেই। একেই অবস্থা তখন রাশিয়ায় ও চলছিলো পুঁজিবাদী দেশের অবস্থা আর তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্যই ছিলো না। বরং পুঁজিবাদী দেশের জনগণ প্রতিবাদ ও সমালোচনা করতে পারত আর রাশিয়ায় ধনীক শ্রেনীর বিরুদ্বে কথা বলা মানেই ছিল জীবনের ঝুকি নেয়া।

তবে তুলনা মূলক ভাবে রাশিয়ার অর্থনৈতিক জীবনে গুনমান অনেক উন্নত ছিলো, কিন্তু রাজনৈতিক নিপিড়নের মাত্রা ছিলো মারাত্মক। অর্থনৈতিক সাম্য কোন ভাবেই রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করতে পারেনা। এই জিনিষটা মার্ক্সবাদি ও অন্যান্য কর্তৃত্ববাদি সমাজবাদিরা কোন ভাবেই বুঝতে চায়নি। এমন কি জেল খানা, সেনা ব্যারাক, বা লঙ্গর খানায় একেই রকমের খাদ্য, পোষাক, একেই রকমের থাকার জায়গা, এমন কি প্রায় একেই রকমের কাজ কর্ম দেয়া হয়। কিন্ত তা মানুষ স্বাভাবিক ভাবে নেয় না। প্রাচীন পেরুর ইনকা জাতি, এবং প্যারাগোয়ের জেসুইট জাতির মধ্যে ও অর্থনৈতিক সাম্য ছিলো। কিন্তু তাঁদের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীকার ছিলো না ফলে জনগণ সেই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিলো না। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র চালনায় জনতার বিদ্রোহ দেখা দেয় বার বার।

চিন্তক প্রুদু বলেছেন বলেই নয় যে, স্বাধীনতাহীন “সমাজবাদ” দাসত্বের চেয়ে ও ক্ষতিকর একটি মতবাদ। তাই সাধারন মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো সামাজিক ন্যায় বিচার কার্যকরী করতে হবে, তার মাধ্যমে অবশ্যই মানুষের স্বাধীকার নিশ্চিত করতে হবে। সমাজবাদ হবে অবশ্যই স্বাধীন পরিবেশে, নইলে তা সমাজবাদই নয়। কোন মিথ্যাকে প্রতিস্টা করার জন্য অন্য আরো কোন গভীর মিথ্যার আশ্রয় গ্রহন করা অপরাধ। নিরাজবাদই কেবল মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে। উপহার দিতে পারে স্বাধীন ও সাম্যের সমাজ বিধান।

সামাজিক প্রতিস্টান সমূহ এমন ভাবে কাজ করে, যেমন এটি একটি মানব দেহে নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজ করে থাকে; সেই প্রতিস্টান গুলো হল সামাজের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। অঙ্গ গুলো কোন পারস্পরিক আপোষ রফার মাধ্যমে তৈরী করা হয় না, বরং শরীরের অতি প্রয়োজনেই সেই গুলো তৈরি ও কাজ করে চলে। গভীর সমূদ্রের মাছ সমূহের চোখ বিশেষ ধরনের হয়ে থাকে। যা প্রচলিত সাধারন ভাবে বসবাসকারী প্রানীদের মত নয়, এর ও কারন হলো প্রানী সমূহের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে পারার জন্যই এমন হয়ে থাকে। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে গাছ ও প্রানীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও পরিবর্তিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিটি অঙ্গই স্ব স্ব কাজ চাহিদা অনুসারে করে থাকে। যদি পরিবেশ পাল্টায় তবে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও পালটায়, এমন কি অনেক সময় অনেক অঙ্গ বিলুপ্ত ও হয়ে যায়। কিন্তু কোন অঙ্গ অদরকারী অবস্থায় ঠিকে থাকার বা কাজ করার চেষ্টা করে না। সামাজিক অনেক প্রতিস্টানের ক্ষেত্রে ও একেই কথা প্রযোজ্য। সেই প্রতিস্টান গুলো ও ঠিকে থাকতে চায় না, তবে তাদেরকে ঠিকিয়ে রাখায় প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিটি সামাজিক চাহিদারই একটি লক্ষ্য থাকে। এই ভাবেই আজ আধুনিক রাষ্ট্র সমূহ অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এর সাথে আছে সামাজিক শ্রেনী বিভাগ। এই সবের সাথে আছে সামাজিক নানা প্রকার রচম রেওয়াজ ও রীতিনীতি। সমাজে মালিকানার বিকাশ হয়েছে, তাকে সুরক্ষা দিয়ে তৈরী হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার ভীত নির্মান করা হয়েছে। এই ভাবেই নানা প্রকার বিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজ আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলা হয়েছে। এইটা আসলে রাজনৈতিক কর্ম কান্ডের একটি বিশেষ অঙ্গ। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চা করা সহজ। এই কাঠামোর ভেতর দিয়ে মালিকানার অধীকারী লোকেরা নিজেদের মালিকানা সুরক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে। এই ধরনের কাজ গুলো রাজনৈতিক রাষ্ট্র সমূহের আসল কাজ। এই কাজের জন্যই আদতে রাষ্ট্র ঠিকে আছে। এই ধরনের কাজের জন্যই রাষ্ট্র নিজেদেরকে বিশ্বস্থ প্রমান করেছে, নইলে এইই রাষ্ট্র যন্ত্র ঠিকতে পারত না। পারবে না।

দুনিয়ায় ঐতিহাসিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক ভাবে নানা প্রকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তাঁর কার্যক্রমে ধরন প্রকৃতি আগের মতই নিপীড়ন মূলক রয়ে গেছে। শাসকগন ও তাঁদের সমর্থকদের বা অধিনস্থদের কর্মপরিধি বাড়িয়েছে। রাষ্ট্র সে গণপ্রজাতন্ত্রী হোক, বা রাজতান্ত্রিক হোক ইতিহাসের কোন কালেই তাঁরা নিপীড়ন মূলক কার্যক্রম থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে নাই। তাঁদের জাতীয় সংবিধানের পরিবর্তন আনয়ন করে ও তাঁদের চরিত্রগত পরিবর্তন সাধন করতে পারেনি। বিজ্ঞানের বদৌলতে, গাছ, পালা, পশু, পাখী ও মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিবর্তন করা যায়। পরিবর্তন করলে ও চোখ, কান, নাক বা অন্যান্য অঙ্গের যে ধরনের কাজ তাঁর কোন পরিবর্তন হয় না।। তেমনি সামাজিক প্রতিস্টান সমূহের মাঝে পরিবর্তন সাধন করে ও তাঁদের কাজের ধরনের কোনই পরিবর্তন হবে না। সামাজিক মুক্তি আসবে না। রাষ্ট্র যা তাই ই থেকে যাবে চিরকালঃ এটা গন মানুষের শোষকদের রক্ষা করে, সুবিধা ভোগী সৃজন করে, নতুন শ্রেনী ও স্বার্থবাদি গৌস্টির জন্ম দান করে থাকে। যারা রাষ্ট্রের এই চরিত্রটা সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে পারেন না, তাঁরা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ বুঝতে পারবেন না। তাঁরা সামাজিক পরিবর্তনের সত্যিকার পথ ও পন্থা নির্ধারন ও করতে পারবেন না।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ মানব সমস্যার সমাধানের জন্য কোন চিরন্তন বানী নয়, এটা আবার কোন কল্পনা প্রসূত মতবাদ ও নয়, এই মতবাদ যেকোন চিরন্তন বানী বা মতবাদ বিরুধী। এটা কোন চিরন্তন সত্যে বিশ্বাসী নয়, বা মানবজাতির চূড়ান্ত মতবাদ হিসাবে ও দাবী করে না। এটা মানুষের জীবন যাত্রার কিছু সুনির্দিস্ট ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব হাজির করে, যাতে উন্নততর চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটায়, আর সেই কারনেই আগে থেকেই সকল কিছু বলে দেয়া সমীচীন নয়; বা চূরান্ত লক্ষ্য স্থির করা ও প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি রাষ্ট্রের সব চেয়ে বড় খারাপ অপরাধটি হলো সামাজিক বৈচিত্রকে উপেক্ষা করে নির্ধারিত একটি কাঠামোকে বাস্তবায়নে অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করে। এটা মানুষের ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। মানুষের অবেগ অনুভূতিকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে চায় না। রাষ্ট্র তাঁর সমর্থক ও সহযোগীকে অধিকতর শক্তিশালী করতে থাকে, তাঁর উত্তরাধিকারীকে সামাজিক ভাবে নানা কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে সুপ্রতিস্টিত করে থাকে। সকল সময়েই সৃজনশীল মানুষকে চেপে রাখার প্রবনতা দেখিয়ে এসেছে রাষ্ট্র শক্তি, এটা সামগ্রীকভাবে কোন যুগকে কখনই বুদ্বিবৃত্তিক ভাবে উপলব্দি করতে চায়নি বা পারেও নি।

বর্তমানে তথাকথিত একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহ সাধারন মানুষের মাথার উপর ঝেঁকে বসে আছে, জনগনের জ্ঞান, বুদ্বি ও সকল প্রচেস্টার কোন মূল্য এই রাষ্ট্র যন্ত্রের নিকট নেই, এই রাষ্ট্র গুলো যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক ধরনের ছাঁচে সকল কিছু কে বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এটা মানুষের আকাঙ্ক্ষা কে নির্দয় ভাবে উপেক্ষা করে চলে। এই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র সমূহ ক্রমে জন সমর্থন হারাচ্ছে, এর স্পষ্ট ও ভয়ঙ্কর আচরন এবং বর্বরতা প্রকাশিত হচ্ছে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কিছু লোক তা ব্যবহার ও করছেন, মানবিক চিন্তার যৌক্তিকতা, অনুভূতি, ও আচার আচরনকে একেবারেই তোয়াক্কা করছে না। আদতে এই প্রক্রিয়াটা হলো মানুষের বুদ্বি বৃত্তিকে হত্যার শামিল।

এনার্কিজম বা নিরাজবাদ সত্যিকার ভাবে মানুষের চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতির সঠিক মূল্যায়ন করে থাকে, তা হোক প্রতিস্টানে বা সামাজিক পরিমণ্ডলে। এই মতবাদ বা পথ ধারা সুনির্দিস্ট বা স্থিরীকৃত নয়, এটা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে মানুষের চিন্তাধারার বিবর্তনের ফলে বিকশিত হয়েছে। এটা মানুষের মাঝে সুপ্ত প্রতিভা এবং যোগ্যতাকে বিকশিত করে ব্যাক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে প্রস্ফুটিত করতে চায়। যদি ও স্বাধীনতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। তা কোন ভাবেই চিরন্তন বিষয় নয়। তবে তা ক্রমাগত বিস্তৃত ও পরিশিলিত হয়ে জীবনের চারিদিককে প্লাবিত করে দিতে পারে। একজন এনার্কিস্ট বা নিরাজবাদির জন্য স্বাধীনতা কোন কল্পনা বিলাশ বা দর্শনের বিষয় নয়, এর মৌলিক চিন্তাই হলো মানুষে পরিপূর্ন উন্নয়ন ও বিকাশ। রাজনৈতিক প্রভূত্ব ও চাপের কারনের মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধা গ্রস্থ হয়, কিন্তু মানুষ যদি একটি সংহতি পূর্ন পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারে তবে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্বিবৃত্তিক বিকাশ অনেক ভালো হয়।

সেই কারনেই বলা হয়ে থাকে, ইতিহাসে যত সাংস্কৃতিক অবনতি হয়েছে তা রাজনৈতিক দূর্বলতার কারনেই হয়েছে। এবং এটা ছিলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যত যান্ত্রিকতা লক্ষ্য করা গেছে, তা সামাজিক কারনে ঘটে নাই। রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতি পরস্পরের মধ্যে একধরনের সুপ্ত রয়েছে। নিথশে বলেছিলেনঃ

"কেউই শেষ পর্যন্ত তার চেয়ে বেশি ব্যয় করতে পারে না। এটি ব্যক্তিদের পক্ষে ভাল, এটি জনগণের পক্ষে ভাল। যদি কেউ নিজের পক্ষে ক্ষমতা, উচ্চ রাজনীতির জন্য, বাণিজ্যের জন্য, সংসদীয়, ও সামরিক ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যয় করে। তবে, যে পরিমাণ যুক্তি, আন্তরিকতা, ইচ্ছা, আত্ম মর্যাদা, যা দিয়ে নিজের আত্মাকে গঠন করে, সে অন্যের জন্য তা করে না। সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র এক –এই কথায় কেহই প্রতারিত হবেন না- এটা পরস্পর বিরোধী। 'সংস্কৃতিগত রাষ্ট্র' কেবল একটি আধুনিক ধারণা নয়, এটা এটা প্রয়োজনে গড়ে তুলা হয়েছে। এটা ও সত্য যে, একের জীবন যাপনের অন্যতম উপাদান হলো অন্যের সহায়তা, অন্যের সহভাগীতা। একটি সংস্কৃতির দীর্ঘকালীন চর্চা রাজনৈতিক পতনের কারন হতে পারে। একই সংস্কৃত অর্থ মানে হল কোন একটি ভাবধারা বা আচরনিক চর্চাকে যতই মহান যা নৈকট্যবাদী ভাবা হোক না কেন। তা যদি তা রাজনীতি নিরপেক্ষ ও হয় তবু তাঁর উন্নয়ন ও হাল নাগাদ করনের ব্যবস্থা রাখা একান্ত দরকার। "
একটি রাজনৈতিক শক্তি বিশাল , ক্ষমতাশালী চক্র, একটি উন্নত সংস্কৃতির বিকাশে বাঁধা হতে পারে। যখন রাষ্ট্র তাঁর আভ্যন্তরীণ সমস্যায় আক্রান্ত হয়, তখন রাজনৈতিক শক্তি নানা ব্যবস্থা গ্রহন করে তা উত্তরনের প্রায়স চালায়। তাঁরা সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে, এটা শাসকদের জন্য উপযোগী ব্যাখ্যা দাড় করায়, সামাজিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রে অভিভাবকত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আমাদেরকে অধিক সৃজনশীল সংস্কৃতিক চর্চা করতে হবে। যা মানুষের জীবন ও সামাজিক কর্ম কান্ডে প্রতিফলিত হতে পারে। যা মানুষের স্বাধীনতার কথা বলে, বহুমূখী ভাবনার বিকাশ করে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করে দেয়।

প্রতিটি সংস্কৃতির একটি নিজস্ব প্রকৃতি ও শক্তি আছে। কেবল আর্থিক উন্নতি সমাজে ও সংস্কৃতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। এটা স্থায়ী রূপ লাভ করে, নিজেকে অনেক ক্ষেত্রেই নবায়ন করে নেয়। এটা অনেক সময় নানা মূখী কর্মের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলে। এটা প্রতিটি সফল কর্মের পর আরও নয়া নয়া ক্ষেত্রের অনুসন্দ্ব্যান চালায়; এবং প্রতিটি জায়গায়ই সে আরো সাফল্য প্রত্যাশা করে থাকে। আদতে রাষ্ট্র কোন সংস্কৃতিরই জন্ম দাতা নয়। এটা আসলে চিন্তাবিহিন এক ধরনের যন্ত্র। এটা যেমন আছে তেমনই থাকতে পছন্দ করে, নিজেকে নিরাপদ রেখে সরল ও সাদাসিদে ভাবে সময় কাঠাতে চায়।ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিপ্লবের পর পরই যত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

ক্ষমতা সকল সময়েই নষ্টামির জন্মদাতা, এটা সকল সময়েই আইনের পোষাক পড়ে মানুষের প্রানবন্ত ভাবধারাকে দমন করে ফেলে। ক্ষমতাবানগন প্রায়স মতান্দ্বতার পরিচয় দেয়, এঁদের দমন প্রক্রিয়া হয় নির্মম। তাঁদের মুর্খতা মূলক কর্মকান্ড, এঁদের সমর্থক শ্রেনীর ক্রিয়া কলাপ নিস্টুর ও মুর্খতামূলক হয়ে থাকে। এরা কূপমণ্ডূক। এরা সত্যিকার জ্ঞানী গুনি ও বুদ্বিমান লোকদেরকে মূল্যায়ন করেনা। কর্তৃত্বতান্ত্রিক ব্যবস্থা সকল সময়েই যান্ত্রিকভাবে সকল কিছু বিবেচনা করে থাকে, এরা মানবিকতার কোন প্রকার তোয়াক্কা করে না।

এই সকল পরিস্থিতি বিবেচনা করেই একটি নৈতিক ভিত্তি নিয়ে আধুনিক নিরাজবাদের অভিপ্রাকশ হয়েছে, কেবল স্বাধীনতাই মানুষকে একটি মহান ও মহৎ বুদ্বি বৃত্তিক পরিনতির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম। একটি শাসক চক্রের মানুষের জীবন প্রনালী কোন ভাবেই সুশীল মানুষের জীবনের মত হয় না। শাসক সর্বদা অস্থির থাকে প্রজাদের বা অধীনস্থ শ্রেণির লোকদেরকে কি করে বাধ্য করে রাখা যায়, তাই প্রানহীন যন্ত্রের মত আচরন করে চলে অবিরত, কেননা প্রজাদের আনুগত্যই তাঁদের অস্থিত্বের প্রধান নিয়ামক। এরা স্বাধীন মানুষ পছন্দ করে না। অথচ স্বাধীনতাই হলো জীবনের মৌলিক উপাদান। বুদ্বিবৃত্তিক ও সামাজিক জীবনের উন্নয়ন করতে হলে স্বাধীকারের কোন বিকল্প নেই। মানুষের জন্য সুন্দর আগামী গড়তে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গীকে বাদ দিয়ে হবে না। মানুষের অর্থনৈতিক শোষন, বুদ্বিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি জন্য বা মানুষের বিশ্বদর্শনের জন্য নিরাজবাদ বা এনার্কিজম হল একটি চমৎকার পথ ও পন্থা। একটি উন্নততর মানবিক সমাজ নির্মান, এবং একটি উন্নত সংস্কৃতিক পরিমন্ডল বিনির্মানের জন্য মানুষের সত্যিকার স্বাধীনতা হল পূর্বশর্ত।

দ্বিতীয় অধ্যায়

আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা এবং প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম

সমাজের চলমান আভ্যন্তরীণ নানা প্রকার দ্বন্দ্ব ও অসঙ্গতি দূরকরার জন্য যখন মানুষের প্রয়োজন তিব্রতর হয়, তখনই সমাজবাদের উদ্ভব হয়, যা মানুষকে নয়া পরিবেশে নয়া সামাজিক সম্পর্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এটা প্রথমিক ভাবে একটি ক্ষদ্র বুদ্বিজীবী মহলকে প্রভাবিত করে যারা শ্রমিক নয়, বরং সমাজের সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর লোক। তাঁরা প্রভাবিত হয়েছিলেন মূলত একটি মহৎ ভাবনা ও মানুষের প্রতি তিব্র ভালোবাসা থেকে। সাধারন মানুষের মুক্তি, সামাজিক দ্বন্দ্বের নিরসন, ও সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার জন্য সমাজবাদের প্রবর্তন হয়। উল্লেখ্য যে, সেই সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর নিকট সমাজবাদ ছিলো একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন; তাই তাঁরা এই আন্দোলনের বার্তা সেই সমাজের লোকদের নিকট সরল, সরাসরি ও নৈতিক আবেদন হিসাবে প্রচার করতে থাকেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিলো সমাজ সহজেই এটা গ্রহন করবে।

কিন্তু সেই ধারনা বা প্রচার কোন আন্দোলন সৃজন করতে পারে নাই; তাঁরা কেবল তাঁদের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কাজে নামেন, তাঁরা তাঁদের জীবনের বিশেষ অবস্থার কথা চিন্তা করে বুদ্বিবৃত্তিক উদ্যোগ নেন। আন্দোলন মানুষে সামাজিক জীবনের তাতক্ষনিক ও অতি প্রয়োজনীয় বিষয় গুলোকে সামনে রেখে এগোয়। তা এগিয়ে যাবার শক্তি, বিজয়ী হবার যৌক্তি, এবং বুদ্বিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র কামনা করে। সমাজবাদের জন্য তাঁরা শ্রমিক আন্দোলনকে যুক্ত করে, এবং মেধা ও যুক্তি দিয়ে তাঁর একটি আকৃতি দেয়া হয়। সমাজবাদি আন্দোলন শ্রমিক আন্দোলনের ভেতর থেকে সৃষ্টি করা হয়নি; বরং এটা সৃজন হয়েছে তাঁর বাহির থেকে। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের ভেতর সামাজিক পুর্গঠনের লক্ষ্যে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো মানুষের রুটির ব্যবস্থা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন যাত্রার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

আজকের শ্রমিক আন্দোলন ইংল্যান্ডের অষ্টাদশ শতাব্দির শিল্প বিপ্লবের নিকট ঋণী। এই আন্দোলন সেখানে উৎপত্তি হলে ও পরবর্তীতে প্রায় সকল মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই যে “ম্যানুফ্যাক্সারিং” পদ্বতীর উদ্ভব হলো যা পরবর্তী সময়ে শ্রমিকের কাজের দক্ষতাকে নানা ভাবে বিভক্ত করে উৎপাদন ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন সাধন করে দেয়। সাধারন ভাবে তখন মানুষের চেয়ে যন্ত্র অধিকতর গুরুত্ব পেতে থাকে। কাপড় ও সুতা তৈরীর জন্য যে মেশিন উদ্ভাবন হয় যা শ্রমিকদের জন্য এক অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করে। এই স্বয়ংক্রিয় মেশিন অনেক শ্রমিকের কাজ একাই করে দিতে পারে, ফলে শ্রমিকদের কাজ হারাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

জেমস ওয়াট উদ্ভাবিত ষ্টীম ইঞ্জিন আবিস্কার, উৎপাদন কারীদেরকে বাতাস, পানি, ও ঘোড়ার শক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেয়। সেই সময় থেকেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এক ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটা নয়া নয়া উৎপাদনের ক্ষেত্র ও তৈরি করে দেয়। আধুনিক ফ্যাক্টরি, প্রদর্শনী দোকান, উন্নত বিক্রয় কেন্দ্রের উন্মেষ ঘটে সেই সময়ে। বিশেষ করে বস্ত্র উৎপাদন খাতে ও অন্যান্য খাতে অল্প সময়ের মধ্যেই একটা প্রচণ্ড বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে ফেলে উন্নত ইউরূপীয় দেশ সমূহে। শক্তির ব্যবহার করে লোহা ও কয়লার ব্যবহারে এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধন করে তাঁরা। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে আসে এক নয়া আবহ। ক্রমে বড় বড় শিল্প কারখানের জন্ম হতে থাকে, আর তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে নানা স্থানে শহর নগর। ১৮০১ সালে বার্মিং হামের লোক ছিলো মাত্র ৭৩,০০০ এবং ১৮৪৪ সালে এসে দাঁড়ায় ২০০,০০০ আর সেফিল্ডে ৪৬,০০০ হাজার থেকে উন্নিত হয় ১১০,০০০ তে। এই ভাবে সমগ্র দুনিয়ার শিল্পের সাথে সাথে শহর নগরের আকার ও অধিবাসিদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্বি পেতে থাকে।

প্রতিটি ফ্যাক্টরিতেই দরকার হয় কাজের জন্য মানব খাদ্যের। গ্রামীন অঞ্চল দরিদ্র হতে থাকে, পানির শ্রুতের মত মানুষ নগর মূখী শহর মূখী হতে থাকে। মানুষের উপর অভিশাপ হয়ে নেমে আসে ‘এনক্লোজার আইন’। সেই আইনের বলে কারখানার জন্য কৃষকের জমি অধিগ্রহন চলতে থাকল আর সাধারন মানুষকে ভিক্ষুকের স্তরে নামিয়ে দিল শিল্পায়নের উদ্যোগ। ১৭০২-১৭১৪ সালে রানী এনের সময় কাল থেকে পদ্বতীগত ভাবে মানষের সম্পদ চুরির বন্দবস্ত করা হয়। ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের এক তৃতীয়াংশ কৃষি জমি অধিগ্রহন করে নেয়া হয়েছিল। ১৭৮৬ সালে যেখানে স্বাধীন ভূমি মালিক ছিলেন প্রায় ২৫০,০০০ জন, তা মাত্র ত্রিশ বছরে কমে এসে দাঁড়ায় ৩২,০০০ জনে।

নয়া ধরনের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে অকল্পনীয় ভাবে তথাকথিত জাতীয় সম্পদ বৃদ্বি করে দেয়। কিন্তু সেই সম্পদের মালিক হয়ে বসে স্বল্প কিছু সুবিধা প্রাপ্ত জন গুষ্টি। অন্যদিকে, চলতে থাকল শ্রমজীবী মানুষের উপর সীমাহীন শ্রম শোষণ। দ্রুত তাঁদের জীবন যাত্রা নিচের দিকে নামতে থাকে, গ্রাস করতে থাকে চরম দারিদ্রতা, দেখা দেয় নানা ভাবে বিদ্রোহ। সে সময়ের কারখানা সমূহের শ্রমিক ও কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত রিপোর্ট পড়লে মানুষ হতাশায় ও বিষাদে পরিপূর্ন হয়ে যাবে। যা কার্ল মার্ক্স তাঁর পুঁজি গ্রন্থে; ইউজিন তাঁর ডি লা মিজারি দেস ক্লাসেস লেভুরিয়াসেস এন এংলিটারি এট ফ্রান্স, এবং এঙ্গেলস তাঁর ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের অবস্থা নামক গ্রন্থে এই বিষয় বিশ্লেষণ মূলক আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া ইংক্যান্ডের অন্যান্য লিখকদের লিখায় ও তৎকালীন চিত্র ফোটে উঠেছে। যা সত্যি মানব জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত মর্মান্তিক চিত্র।

মহান ফ্রান্স বিপ্লবের মাত্র কিছু দিন আগে স্বনাম ধন্য লিখক আর্থার ইউং ফ্রান্সে ভ্রমন করেন, তিনি তাঁর ভ্রনম কাহিনীতে লিখেন, ফ্রান্সের পল্লী এলাকার মানুষেরা প্রায় পশুরমত জীবন যাপন করছে, তাঁরা তাঁদের চরম দারিদ্রতার কারনে সকল মানবীয় গুনাবলী হারিয়ে ফেলছে। পুঁজিবাদের এই উষা লগ্নে শিল্প শ্রমিকগন তাঁদের জ্ঞান বুদ্বি হারিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে।

অগনিত শ্রমিক অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে প্রায় অন্দ্বকার ঘরে যেখানে জানালানেই এমন কি আলো আসার মত গ্লাস ও লাগানো নেই, সেখানে শ্রমিকগন বস্ত্র কারখানায় চৌদ্দ পনর ঘণ্টা এক নাগারে কাজ করতে বাধ্য হয়। তাঁদের জন্য স্বাস্থ্য ও জীবনের সুরক্ষার কোন যন্ত্রপাতি বা ঔষধপত্র কিছুই রাখা নেই। আর যে পরিমান বেতন দেয়া হয় তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয় এমনকি তাতে তাঁদের খাওয়া পড়ার ব্যবস্থাও হয়না বললেই চলে। সপ্তাহ শেষে এই কারখানা নামক জাহান্নাম থেকে কয়েক ঘন্টার জন্য তাঁরা যে ছুটি পায় তাতে এই দুঃখের অবস্থা থেকে ভুলে থাকার জন্য অস্বাস্থ্যকর মধ্যপান করে থাকে। এই পরিস্থির কারনে স্বাভাবিক ভাবেই সরকারী অনুমোদনেই নানা জায়গায় বেশ্যালয় ও পানশালা গড়ে উঠে।

তাঁর সাথে সাথে অপরাধ ও বাড়ে। মানুষের যখন নৈতিক অধঃপতন হয়, তখন সে সকল কিছুই করতে পারে, এমনকি নিকৃষ্ট ধরনের কাজ করতে ও তাঁর কোন প্রকার লজ্জা হয়না। কারখানায় দাসত্বের জীবন যাপন ও নিকৃস্টতম পরিস্থিতিতে মালিকেরা ততাকথিত ট্র্যাক ব্যবস্থার প্রবর্তন করে তাদেরকে দৈনিন্দিন জীবন যাপনের জন্য অতি নিম্নমানের পন্য কিনতে বাধ্য করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, শ্রমিকগন তাঁদের অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে ও তাঁদের কঠোর শ্রমের মজুরী থেকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছিলো। যেমন, ডাক্তার, ঔষধ ও অন্যান্য পন্য কিনার জন্য তাদেরকে টাকা দিতে বাধ্য করা হত। সেই সময়ের লিখকগন লিখেছেন যে, একজন মাকে তাঁর মৃত সন্তান কবর দিতে হলে ও রক্ষী এবং কবর খননকারী কে টাকা প্রদান করতে হত। সেই সময়ের আইনী শোষন ও মানুষের শ্রম শক্তির শোষণ কেবল পূর্ন বয়সী নারী পুরুষের মাঝে সিমাবদ্ব ছিলো না।

তখন এমন কিছু মেশিন পত্র আবিস্কার হয় যা চালনা করার জন্য তেমন শক্তির দরকার পরত না। অল্প কিছু নড়াচড়া করলেই কাজ হয়ে যেত। তাই পুঁজিবাদীদের লক্ষ্য পরিণত হল প্রলেতারিয়েত শিশু সন্তানেরা, তিন চার বছরের শিশুদেরকে ও শিল্প কারখানার অন্দ্বকার প্রকোষ্ঠে নিয়ে আসা হয় কাজের জন্য, ব্যবসায়ের জন্য এবং উৎপাদনের জন্য। শিশু শ্রমিকদের ইতিহাস, এর আগে এত নির্মম কোথাও ছিলো না, আর এটা ছিলো পুঁজিবাদের ইতিহাসে একটি গভীর অন্দ্বকার যুগ। এটা স্পষ্ট করে দেয় খৃস্টীয় ব্যবস্থাপকগন কত নির্মম ছিলো। এঁরা মুনাফার জন্য, ব্যবসায়ের জন্য, জনগণকে শোষণ করার জন্য কত নিচে নামতে পারে। সিমাহীন কষ্টের পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে অগণিত শিশুর মৃত্যু হতে থাকে, তা দেখে রিচার্ড কার্লাইল খুবই দুঃখিত হয়ে উক্তি করেন, “ বেথেলহামের নিরাপরাধ শিশুদের হত্যা করার রেওয়াজ আবার ফিরে এসেছে”। পার্লামেন্টে আইন হবার পর ও ফ্যাক্টরি মালিকগন সেই বাস্তবায়নে প্রচুর সময় নেয়।

রাষ্ট্র ফ্যাক্টরি মালিকদেরকে শোষণ করার জন্য ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনা বিভাগকে ব্যাপক সুযোগ দিয়েছে। রাষ্ট্রের লক্ষ্যই ছিলো কম বেতনের শ্রমিক সর্বরাহ করা। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, ১৮৩৬ সালে যে কাল আইন টি প্রনয়ন করা হয় তাতে ইংরেজ শ্রমিক সহ শ্রমিকের মাঝেই অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সকল পুরাতন আইন কানুন ই প্রনয়ন করা হয়েছিলো রানী এলিজাবেথের সময় কালে, যার লক্ষ্য ছিলো মানুষের উপর ইংল্যান্ডের ধানবীয় চরিত্রটি বুঝিয়ে দেয়া। এই ধানবীয় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রায় গরীবের সম্পদের তিন ভাবের এক ভাগ খরচ করতে হত। কিন্তু যারা ভালো মনের অধিকারী মালিক তাঁরা তাঁদের আয়ের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে দিতে চায়নি। তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন কারী লোকদের জন্য কিছু সুবিধা প্রদানের চিন্তা করতে থাকেন, এবং আইনগত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তাব করেন। পরিস্থিতিগত কারনে বেশ কিছু আইন কানুন নতুন করে প্রনয়ন করা হয় এবং অনেক পুরাতন আইনের সংশোধন করা হয়।

নয়া আইনে দারিদ্রতাকে অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং কেহ যেন নিজের স্বতঃস্ফুর্ততার কারনে পিছিয়ে না পড়েন সেই দিকে তাকিদ করা হয়েছে। নয়া আইন কানুনে ম্যালতাসিয়ান ভাবধারাকে নানাভাবে জনগনের সামনে হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছে, মালিক পক্ষকে দিয়ে এর প্রশংসা করা হয়ে, বলা হয়েছে এই পদ্বতী একটি বিশাল উদ্ভাবন। ম্যাথিউ, যিনি জন সংখ্যা তত্ব নিয়ে কাজ করার জন্য খুবই প্রশংসিত তিনি গডউনের রাজনৈতিক বিচার নামক গ্রন্থে এই ব্যবস্থার জবাব দিয়েছেন। তিনি এই ব্যবস্থাকে খুনের নামান্তর বলে অভিহিত করে বলেছেন, দরিদ্রদের পরিবারে নয়া মুখের আগমনকে বারিত করার অধিকার কারো থাকা উচিৎ নয়। ‘জন্ম নিয়ন্ত্রনের মত’ এই ধরনের দৃষ্টি ভংগী, অবশ্যই, শিল্প কারখানার মালিকদের জন্য মিলিত ভাবে সীমাহীন শোষণের পথ করে দেয়াই ছিলো নয়া আইনের প্রধান লক্ষ্য।

নয়া আইন দরিদ্র জনগণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্যারিস কর্তৃপক্ষের বাহিরে রাষ্ট্র পক্ষের নিয়োজিত একটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়। শ্রমিকদেরকে আর্থিক সহায়তা দান বা বর্তমান কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়, সেই ব্যবস্থাটি ও ছিলো গনমানুষের জন্য ভয়ঙ্কর, তাই লোকেরা সেই নয়া আইনকে বলতে থাকল “ গরীবের ব্যাস্টাইল আইন”। মানুষের মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তাঁরা ভাবতে থাকেন, যাদের ভাগ্য খারাপ তারাই বাধ্য হয়ে সেই কলখানায় বন্দ্বির মত আত্মসমর্পন করে। যেখানে তাঁদেরকে অত্যাচার ও শাস্তি ভোগ করতে হয়। অর্থাৎ কর্ম ক্ষেত্র হয়ে পড়ল বন্দ্বিশালা। সেই কর্মক্ষেত্র সমূহ ছিলো প্রচণ্ড নিয়ম শৃংখলায় পরিপূর্ন, কেহ নূন্যতম নিয়ম ভঙ্গ করলেই নেমে আসত সীমাহীন শাস্তির খড়গ।

প্রতিটি ব্যাক্তির জন্য নির্ধারিত থাকত তাঁর কাজ; যদি সে তাঁর কাজটি কোন কারনে করতে ব্যার্থ হত হবে তাঁর ভাগ্যে খাদ্য জোটত না, দেয়া হত ব্যাপক শাস্তি। জেল খানার বন্দ্বিদের জন্য খুবই নিম্নমানের ও স্বল্প পরিমান খাবার শ্রমিকদের জন্য বরাদ্ব করা হত। চিকিতসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলো না। তাঁদের শিশুরা পর্যন্ত অত্মহত্যার পথ বেচে নিত। শ্রমিকদের অবস্থা এমন ভাবে তৈরি করা হয় যে শ্রমিকদেরকে তাঁদের পরিবার পরিজন থেকে পৃথক করে দেয়া হয়। তাঁদের আপনজন ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেখা করতে পারত না।

দেখা করলে ও তাঁদের পর্যবেক্ষকদের সামনে দেখা করতে হত। মালিক পক্ষের প্রতিটি নির্দেশনা ও পদক্ষেপই ছিলো শ্রমিকদেরকে সন্ত্রস্ত্র করা রাখা, যেন সকলেই নিজেদেরকে উদ্বাস্তুদের মত শিকরহীন ভাবতে থাকে। আর এটাই ছিলো নয়া আইন কানুনের আসল মতলব। বৃহৎ শিল্প কারখানা ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে, যারা বস্ত্র শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল নিজেদের জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য। সেই সময়ে প্রায় ৮০,০০০ হস্তচালিত শ্রমিক ছিলেন যারা প্রায় ভিক্ষুকে পরিণত হন। তখন শ্রমের বাজেরে মারাত্মক মন্দ্বা দেখা দেয়, মালিক পক্ষ শ্রমিকদের মজুরী ব্যাপক হারে কমিয়ে দেয়।

সেই যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতিতে সামাজিক ভাবে এক নয়া শ্রেনীর জন্ম হল, ঐতিহাসিক ভাবে যাদের তেমন কোন উল্লেখ নেইঃ এঁরা হলো আধুনিক শিল্প প্রলেতারিয়েতঃ এত দিন যারা ছিলেন ক্ষুদ্র কুটির শিল্প শ্রমিক, স্থানীয় ভাবে মানুষের চাহিদা মেটাতেন, এবং তুলনা মূলক ভাবে সুন্দর ও সুখী জীবন যাপন করতেন, তাঁদের জীবন যাত্রায় তেমন কোন বার্তি ঝামেলা বা উপদ্রপ ছিলো না। সে তাঁর শিক্ষানবিসি হিসাবে সেবা দিত, একজন ভ্রমণকারীর মত ছিলো তাঁর জীবন। কিন্তু পড়ে পুজির করাল গ্রাস এসে সকল কিছু বদল করে দেয়। মানুষ মেশিনের সাথে সাথে পুজির কারায়ত্বে চলে চায় –আর হারিয়ে ফেলে স্বীয় স্বাধীনতা। সেই যুগটাকে বলা হয়ে থাকে মেশিনের যুগ। মানুষ মানুষের জন্য কাজ করত, এবং প্রকৃতিক বৈচিত্রময় পরিবেশে নিজের ইচ্ছায় অন্যের খুশির জন্য নিজেকে নিবেদন করত, কিন্তু মেশিনের যাঁতাকলে সকল কিছুতে এক আমূল পরিবর্তন এসে হাজির হয়।

পুঁজিবাদ বিকাশের সূচনা লগ্নে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পের মালিকেরা নিজেদের উৎপাদিত পন্য শহরের বড় বড় পুঁজিপতি ব্যবায়ীদের নিকট বিক্রি করে দিতে থাকে, যা সত্যিকার ভাবে প্রলেতারিয়েতের নাগালের বাইরে ছিলো। শিল্প, বিশেষ করে বস্ত্র শিল্প, যাদের উৎপাদন কেন্দ্র ছিলো গ্রামীন জেলা শহর সমূহ, আগের ক্ষুদ্র শিল্প সমূহ ছিলো ছোট জায়গা নিয়ে যার ব্যবস্থাপনা ও ছিলো সহজতর। কিন্তু বৃহৎ শিল্প বিশাল জায়গা নিয়ে গড়ে উঠার কারনে ব্যস্থাপনায় ও আসে ব্যাপক পরিবর্তন ও জটিলতা। ফলে পন্যের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে সর্বরাহ একটি বড় বিষয় হয়ে দেখা দেয়। তা করতে গিয়ে ও শ্রমিকদের সুরক্ষার নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের সৃষ্টি করে।

আধুনিক যন্ত্রপতির উৎপাদন শুরুর পর থেকেই চারিপাশের সব কিছুতে একটা ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসছিলো, সাধারন বাজারে পণ্যের চাহিদা ও দিনে দিনে বাড়তে থাকে, এবং বিদেশী বাজার দখলের প্রবনতা ও লক্ষ্য করা যায় প্রবল ভাবে। প্রতিটি নয়া আবিস্কার, উৎপাদনে নয়া মাত্রা যুক্ত হয়, বাড়তে থাকে উৎপাদনের পরিমাণ, অন্যদিকে ঝামেলা মুক্ত কল কারখানার মালিকদের শিল্প পুঁজির পরিমাণ বৃদ্বি পায় ব্যাপক ভাবে, আয় বৃদ্বি পায় ব্যবসা বানিজ্যের ও সকল ক্ষেত্রে। বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতার সময় থেকেই অর্থনীতির তাত্ত্বিকগণ সকল প্রকার নিয়ন্ত্রন প্রয়োগ করা থেকে বিরত ছিলেন, তাঁর জন্য স্বল্প মেয়াদি বা দির্ঘ মেয়াদি কোন প্রকার উৎপাদন নিয়ন্ত্রনের কথা বলে নাই।

তাঁরা বাজারের চাহিদার আলোকে সরর্বরাহকে সকল সময় কর্মরত রাখতে গুরত্ব দিয়ে এসেছেন। এই প্রক্রিয়া্য উৎপাদনে এক সময় নেমে আসে বিপর্যয়, তৈরি হয় তথাকথিত সঙ্কটের, যার ক্ষতিকর প্রভাব পতিত হয় প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর উপর, মালিক পক্ষ সকল কিছুর জন্য দায়ীকরে শ্রমিকদেরকে, ফলে তাঁদের জীবন যাত্রার মান আরো কমিয়ে দেয়া হয়। আর সেই পরিস্থিতিটি সৃষ্টি হয়েছিলো তথাকথিত “অতি উৎপাদন” হবার কারনে, এটা ছিলো আধুনিক পুঁজিবাদের একটি কুৎসিত চিত্র, সেই সময়ে গুদাম গুলো মালামালে পরিপূর্ন হয়ে উঠেছিলো, সেই বিশাল উৎপাদনের পরিনামে উৎপাদন কারিদের জন্য নেমে এলো সীমাহীন দূর্ভোগ। এটা পরিস্কার যে, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের কোন মূল্য নেই, এবং প্রাণহীন সম্পদের মালিকানাই সব কিছুর উপরে।

অর্থনৈতিক পরিমন্ডল বৃদ্বির পাশাপাশি প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর মানুষের সংখ্যা ক্রমশ ও বাড়তে থাকে, এই বৃদ্বির ক্ষেত্রে আসলে সেই পরিস্থিতি ও প্রচলিত ব্যবস্থায় কারো পক্ষেই কিছু করা সম্ভব ছিলো না। ফলে মানুষের মাঝে যে হাজার হাজার বছর ধরে একটি বন্দ্বন ছিলো তা শ্রমিক ও মালিকে ভাগ হয়ে গেল তিব্রভাবে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টির ফলে যে বিভাজন হয় তা নিয়ে, আধুনিক একজন সাধারন শ্রমিকের কোন অনুভূতিই ছিলো না। সে হয়ে উঠলো একজন শোষণের বস্তু, একটি বিশেষ শ্রেনীর মানুষ, পূর্বেকার সেই লোকদের সাথে তার আর কোন স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কই থাকল না। একজন কারখানার মালিক হয়ে গেলেন একজন প্রভূ, তিনি আর মানুষ রূপে গন্য হতে চাইলেন না। সেই শ্রমিক হয়ত বলবেন, নগর আর শহরে শিল্প কারখানার বিপ্লব হয়েছে, তাই আমরা ও আমাদের সামাজিক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছি। সামাজিক ভাবে উদ্ভাস্ত মানুষ গুলো বলবে, আমরা সকলেই হয়ত একেই জাহাজের যাত্রী ছিলাম এখন সকলের ভাগ্যেই একেই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

একজন আধুনিক শ্রমিকের পরিচয় হলো তিনি একজন সাধারন মানুষ নন, তিনি এখ একটি যন্ত্রের অংশ, রক্তে মাংশে মিশে গেছে যান্ত্রিক আচরন। তিনি এখন একটি মেশিনের মতই ঘোড়পাক খান। তিনি এখন অন্যের জন্য পন্য তৈরি করেন, এই পন্য আর সম্পদ তৈরি করতে করতেই তাঁর জীবনের সারা সময় কেটে যায়।

তিনি এখন এমন সব বন্দ্বুদের সাথে বসবাস করেন, শিল্প কারখানায় তাঁর মত নানা স্থান থেকে এসেছে, তাঁদের আচার আচরন কথা বার্তার সাথে তিনি নতুন ভাবে পরিচিত হন, চিন্তায় ভাবনায় দেখা দেয় পরিবর্তন, ক্রমশ বদলে যায় তাঁদের জীবন প্রবাহ। পরিবর্তিত এই দুনিয়ায় তিনি একটি মেশিনে পন্ডিংপ্যাড চিমনিতে স্থাপন করতে গিয়ে নিজেকে এই বিশাল শক্তিশালী মেশিনের একটি চাকার একজন চালক হিসাবে চিন্তা করতে গিয়ে অসহায় ভাবে ভাবতে থাকেন। তিনি ভাবতে থাকেন যেখানে এসেছি সেখান থেকে হয়ত আর ফেরা হবে না কোন দিন। ফিরে যাওয়ার পথ চার দিক থেকে বন্দ্ব হয়ে গেছে।

তিনি কেবল একা নন এমন আরো অনেকের ভাগ্যেই ঘঠেছে এই অসহনীয় অবস্থার। সামাজিক যে বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে, ব্যাক্তিগত ভাবে এর বিপরীতে তাঁর কিছুই করার ছিলো না। তাই নতুন কিছু করতে চাইলে, ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাইলে, একেই পরিস্থিতির শিকার যারা তাঁদের সকলকে নিয়ে ভালো কিছু করতে হবে। তা হলেই মেশিনের চাকা, গাড়ির ইঞ্জিন, বন্দরের মালামাল উঠানো নামানো সব বন্দ্বকরে দেয়া যাবে নিমিশে। এই ধরনের চিন্তা গুলো যেন তাদেরকে বিপন্ন না করে তুলে, সকল কিছু বিনষ্ট না হয় সেই জন্য তাঁরা জোট বাধতে থাকে নিজেদের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে তুলে। এই ভাবে সৃজন হয় শ্রম জীবী কর্মজীবী মানুষের আন্দোলন।

এটা কোন এমন “আন্দোলন” নয় যা সাধারন মানুষের জীবন বিপদাপন্ন করে দেয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংকির্ন মানসিকতা নয় সাহসী উচ্চারনে কথা বলার সুযোগ তৈরি করার প্রায়সঃ এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলা যাবে, নিজেদের দাবী দাওয়া নিয়ে আলোচনা করা যাবে। শ্রমিক শ্রেনীর জীবন ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে তার জীবন যাত্রা আরো উন্নত করতে, আরো মানবিক করে তুলতে সকলেই জোট বাঁধার উদ্যোগ নেয়া হয়। মজুরী দাসত্বের অবসানের প্রস্তাব আসে আঠার শতকের মাঝামাঝিতে, পরবর্তীতে পুঁজিবাদের সমূল বিলুপ্তির প্রস্তাব ও দাবী জোরদার করা হয়, লক্ষ্যই ছিলো সকলের জীবন যাত্রার মান উন্নত করা একটি সাম্যবাদি নয়া সমাজ বিনির্মান করা।
১৩৫০ সালে ইংল্যান্ডে আইন অনুসারে শিক্ষানবিশদের মজুরী রাষ্ট্র ঘণ্টা অনুসারে নির্ধারন করে দিত। সেই সময়ে কুটির শিল্পের যে সম্মিলিত সমিতি ছিলো তা উৎপাদন বা কাজের পরিমাণ নির্ধারন করে বেতন দিত। কিন্তু যখন পুঁজিবাদের বিকাশ হলো এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থার উন্নয়ন হলো তখন শ্রমিক সংগঠন সমূহের জন্ম হতে থাকায় নয়া পরিস্থিতি অনুসারে সিদ্বান্ত নিতে হয়। নয়া সময়ে উদ্ভাবিত শ্রমিক সংগঠন সমূহের নানা পশ্চাতপদ সিদ্বান্ত ও মালিকদের প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্বিতা করে পরিস্থিতি বদল করার জন্য উদ্যোগী হয় উঠে। ১৭৯৯-১৮০০ সালে তথাকথিত সম্মিলিত সমন্বয় আইন পাশ করে পার্লামেন্ট। এটা সকল প্রকার সমন্বয়ের পথ বন্দ্ব করে দেয়, মুজুরীর পরিবর্ধন, কর্ম পরিবেশ উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের উপর যখন তখন যে শাস্তির বিধান ছিলো তা পরিবর্তনের সরল পথটি রুদ্ব করে দেয় সেই কালো আইন।

এই ভাবে শর্তহীন ভাবে শ্রম শোষণের জন্য পুঁজিবাদকে সুযোগ করে দেয়া হয়। শ্রমিকদের সামনে তখন একমাত্র পথ হল হয় আইন মেনে চলবেন, নয়ত এই আইন অমান্য করে দাসত্বের পথ পরিহার করে মুক্ত মানুষের পথে এগিয়ে যাবেন। এই ধরনের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি একজন সাহসী শ্রমিকের জন্য কঠিন কাজ নয়, তার অভাব ও দারিদ্রতা এর জন্য কোন সমস্যা নয়। তাঁরা মানুষকে অপমান করে বেইজ্জতী করে এমন আইনকে উপেক্ষা করতে কুন্ঠিত হয়না। শ্রমিক শ্রেনী তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে সকল প্রকার চেষ্টা করতে থাকে। আধুনিক শ্রমিক সংগঠন সমূহ স্থানীয় ভাবে কাজ শুরু করে, প্রাথমিকভাবে এঁরা স্ব স্ব কারখানায় নিজেদের সংগঠন তৈরি করে। তাঁরা প্রচলিত নিপিড়ক আইন কানুনের বিরুদ্বে কথা বলা শুরু করে, তাঁরা তাঁদের মত আরো যারা নিপীড়ন ও শোষণের শিকার তাঁদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করে, তাঁদের সকলকে নিয়ে সামগ্রীকভাবে মানব মুক্তির পথকে প্রসারিত করতে প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে জোরদার করে।

শ্রমিক আন্দোলনের ভেতরে আরো একটি ভিন্ন শ্রুত গোপনে ঘনিভূত হতে থাকে, যারা ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসীমূলক কাজে জড়িত ছিলো, ছোট বড় গ্রুপে এঁরা গোপনে প্রতিজ্ঞা করে পরস্পরকে সহায়তা করবে। ইংল্যান্ডের স্কটল্যান্ডের নানা স্থানে তাঁদের গোপন শাখা প্রশাখা চড়িয়ে পড়ে, এই গ্রুপটি নিয়োগ কারীদের উপর এবং যারা শ্রমিকদের উপর নানা ভাবে নিপীড়ন নির্যাতন করে তাঁদের উপর ছড়াও হতে থাকে। এই সকল কর্ম কান্ডের কারনে শ্রমিক আন্দোলন একটি সন্ত্রাসী রূপ পেতে থাকে। ফলে উৎপাদনে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক আস্থিরতা দেখা দেয়, তখন একদিকে চলে আইনের আশ্রয়ে বিচার আচার অন্যদিকে কতিপয় শ্রমিকের জীবন যাত্রার উন্নয়নের জন্য মালিক পক্ষ্য উদ্যোগী হয়।
আইনের এমন কড়াকড়ি আরূপ করা হলে যে কোন আইনের বিধান একটু এদিক সেদিক হলেই শ্রমিকদের উপর নেমে আসে কঠিন শাস্তির খড়গ। সেই সময়েই অর্থাৎ ১৮২৪ সালে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ আইনী স্বীকৃতি পায়। শ্রমিকদের পক্ষে কোন প্রকার মামলা গ্রহন করা হত না, সচেতন ভাবেই শ্রেনী স্বার্থে বিচারকগন মালিক পক্ষে কাজ করতে থাকেন সেই সময়ে, ছোট ছোট আপরাধে শ্রমিকদেরকে বিপুল পরিমানে এমন কি শত শত বছর পর্যন্ত সাজা দিতে থাকে আদালত সমূহ। যা ছিলো মানব ইতিহাসে শিক্ষিত মানুষের জন্য কলঙ্কজন অধ্যায়।

১৮১২ সালে গ্লাসগোতে গোপন শ্রমিক সংগঠন একটি সাধারন ধর্মঘট পালনের ডাক দেয়। পরের বছরে ও উত্তর ইংল্যান্ডে হরতাল ও অস্থিরতা বৃদ্বি পায়, এবং চূরান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য শ্রমিকগন ১৮১৮ সালে ল্যাংকশায়ারে একটি ব্যাপক ধর্মঘটের ডাকদেয়। তাদের দাবি ছিলো শ্রমিকদের বেতন বৃদ্বি, ফ্যাক্টরী সমূহে কাজের সুন্দর পরিবেশ, নারী ও শিশুদের জন্য ভালো পরিবেশ এবং সুরক্ষার ব্যবস্থার করা। একেই বছরে স্কটল্যান্ডের শ্রমিকগন ও একটি বিশাল ধর্মঘটের ডাকদেয় যার পেছনে ছিলো গোপন শ্রমিক সংগঠন। একেই সময়ে স্কটল্যান্ডের বস্ত্র শ্রমিক সংগঠন গুলো বিভিন্ন সময়ে তাঁদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কারখানা বন্দ্ব রেখেছেন। সেই ধর্মঘট গুলো কোন কোন সময় সহিংস রূপ ও ধারন করেছে, ভেঙ্গে ফেলেছে সম্পদ ও সরকারী অফিস আদালত। এর প্রধান কারন ছিলো সরকার যখন তখন শ্রমিকদের দমনের জন্য সেনাবাহিনী বা আদা সামরিক বাহিনী প্রেরন করে শ্রমিক শ্রেনীর উপর অকথ্য নিপীড়ন চালাত।

ইংল্যান্ডের মত, পরবর্তীতে দুনিয়ার অন্যান্য দেশে ও শ্রমিকগন তাঁদের স্বার্থে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেচে নেয়, তাঁরা ও সকল ক্ষেত্রে নিজেদের স্বীকৃতি দাবি করে, যদি ও এখনো তাঁদের দাবীর অনেক কিছুই পুরন হয় নাই। ১৯৬৯ সালের সূচনা লগ্নে যন্ত্রপাতির সুরক্ষার জন্য অনেক আইন করা হয়েছে; কিন্তু পরবর্তীতে, যখন স্টীম ইঞ্জিন আবিস্কার হয় তখন নয়া আইনের দরকার হয়, আর তৈরি হতে থাকে নয়া নয়া মেশিন পত্র, বিশেষ করে বস্ত্র শিল্পের মেশিনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। তার ক্ষতিকর প্রভাব ও পরে শ্রমিকদের উপর অনেকেই তখন কাজ হারাতে থাকেন, মেশিন তাঁদের দৈনিন্দিন জীবন প্রায় ধ্বংস করে দেয়। এই সময় কালটিকে বলা হয় তথাকথিত লুডিজম। ১৮১১ সালে, প্রায় দুইশত কাপড় বুনন মেশিন নটিঙ্ঘ্যামে ভেঙ্গে ফেলা হয়, আর্নল্ডে মজুত থাকা বুনন মেশিন ও ভেঙ্গে ফেলা হয়, প্রতিটি মেশিন চল্লিশ পাউন্ডে কেনা ছিলো, শ্রমিকদের মাঝে নানা কারনে প্রতিবাদ ও অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও ষাটটি মেশিন স্থাপন করা হয়। এই ধরনের পদক্ষেপ সকল শিল্পাঞ্চলেই চলতে থাকে।

আইন শৃংখলা রক্ষার প্রয়োজন বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজন, কারখানা ব্যবস্থাপক ও সরকারের মধ্যে চলতে থাকে বুঝাপড়া, বাস্তব পরিস্থিতি বুঝার কোন মনোভাব এঁদের ছিলোনা এবং শ্রমিকদের প্রতি তাঁদের কোন প্রকার সহানুভূতি ছিলো না। কিং লুড্ড (১) শিল্পা এলাকায় তার ব্যাপক প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে, সে কোন আইন সৃংখলার তোয়াক্কা করত না। তার কথা ছিলো, “ সাহস থাকলে থামাও ! কেহ পাড়লে থামাও”! গোপন শ্রমিক গ্রুপের এই ঘোষনা ছিলো। নয়া মেশিন তাঁরা ভেঙ্গে দিলো, বুঝাতে চাইল এভেবে যা খুশি চলতে পারেনা। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য মানুষের ও মূল্য আছে। তবে তাঁরা তাৎক্ষনিক ভাবে তেমন কিছু করতে পারেনি। মালিক ও সরকার জোট বেঁধে দমন মূলক পথ বেচে নেয়।

১৮১২ সালে পার্লিয়াম্যান্টে আইন করে দেয়া হল যে কোন শ্রমিক যদি কোন মেশিন নষ্ট করে ফেলে তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড। সেই সময়ে লর্ড বায়রন বিতর্কিত এই কালা কানুনের তিব্র নিন্দাবাদ করে সরকারে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই আইনের মাধ্যমে আদলনগৃহ গুলো বারজন বিচারকের কসাই খানায় পরিণত হবে। (২)

সরকারী ভাবে আন্দোলনরত আত্মগোপন কারী শ্রমিক নেতাদের মাথার মূল্য চল্লিশ হাজার পাউন্ড করে ঘোষণা করে বসে। ১৮১৩ সালে ১৮জন শ্রমিককে কারখানার সামনে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে মালিক পক্ষ, এবং শত শত শ্রমিককে নির্বাসন দেয়া হল আস্ট্রেলিয়ায়। এই সকল নির্মম কাজ করা হয়েছিলো লুড্ডিজম নিয়ন্ত্রনের নামে। কিন্তু আন্দোলন তিব্রতর হতেই থাকে, ফলে বড় বড় ব্যবসায় দেখা দেয় অচল অবস্থার, অন্যদিকে দেখা দেয় নিপোলিয়ানের যুদ্ব। সৈনিক, মাঝি,ও বেকার লোকেরা তখন ঐক্য গড়ে তুলে। এই পরিস্থিতিতে শস্য উৎপাদন কমে যায়, তার উপর সরকার আইন করে শস্য আইন-১৮১৫, ফলে খাদ্য শস্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।

কিন্তু আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে একটি বিরাট অংশ সহিংস হলে ও এঁদের অনেকেই প্রকৃত বিপ্লবী চিন্তার ধারক ছিলেন না। তাঁরা সেই সময়ে বুঝেতে পারেন নাই, প্রচলিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার আসল সমস্য কোথায় নিহিত আছে, আর এই পরিস্থিতি পাল্টাতে চাইলে দরকার হল সমাজবাদের। সহিংসতার পরিনামে নেমে আসবে নির্মম সহিংসতা, যা শ্রমিক শ্রেনীর উপরই আপতিত হবে। নতুন ভাবে গড়ে উঠা আন্দোলনের পদ্বতীতে পুঁজিবাদের উচ্ছেদ, শোষনের নীতিমালার বিরুদ্বে সুনির্দিস্ট কর্মসূচী ছিলো না। শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি মান সম্পন্ন জীবন যাত্রার রূপকল্প তাঁদের সামনে পরিস্কার ছিলোনা। তাঁদের শ্লোগান ছিল, “একটি সুন্দর দিনের জন্য একটি সুন্দর কাজ”। কিন্তু যখন শ্রমিকগন নিয়োগকারীগন নানা নির্মমতার মাধ্যমে শ্রমিকদের কষ্ট দিতে থাকে, তখন বাধ্য হয়েই শ্রমজীবী লোকেরা তাঁদের সাধ্যমত বাচার উপায় খোঁজে নেয়।

ঐতিহাসিক মহান এই আন্দোলনে প্রথমিক ভাবে মানুষের সামাজিক চলমান নূন্যতম চাহিদা গুলো উপস্থাপন করা হয়। এই আন্দোলন ক্রমে সমাজের গভীরে অবস্থিত অর্থনৈতিক অবস্থার সংকটের কারনে মানুষ যে শিল্পাঞ্চলের দিকে দাবিত হচ্ছে সে দিকে ইঙ্গিত করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করে। এটা সামাজিক সচেতনতাকে শানিত করে দেয়। শ্রেনী সংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে পারস্পরিক সংহতির গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে নিপীড়িত মানুষকে জাগিয়ে তুলে। এই আন্দোলন নিপিরিত, নির্যাতিত ও শোষিত মানুষে্র নয়া স্বপনের জন্ম দেয়, এত দিন যারা শোষক শ্রেনীর সামনে মাথা তুলে কথা বলতে পারত না তাঁরা এখন মানুষ হিসাবে নিজের দাবী উত্থাপনের সুযোগ এনে দিল।

এটা শ্রমিক শ্রেনীকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কথা বলার ও আগামীতে আরো বেশী কিছু করার তাক্বত এনে দেয়। এই আন্দোলন শ্রমিকদেরকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও লড়াই সংগ্রাম করার প্রশিক্ষন স্বনিয়ন্ত্রন ও সংগঠিত হবার শিক্ষা দেয়। ফলে সামাজিক পরিমণ্ডলে শ্রমিকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হয়। সামাজিক এই অবস্থানের কারনে পরিস্থিতি এমন হয় যে শ্রমিকদের দুঃখ ও কষ্টের কথা যারা বলেন না তাঁদের ও সামাজিক মূল্য কমে যায়। শ্রমিকদের পক্ষে কথা বললে যে কোন মানুষ সমাজে সমাদৃত হতে শুরু করে।

সেই সময়ে, ১৮২৪ সালে শ্রমিকদের উপর চেপে বসা সমন্বয় আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়, সেই সময়েই মধ্যবিত্ত শ্রেনী ও সরকার শ্রমিকদের উপর নিপীড়ন, নির্যনের পথে না গিয়ে তাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কাজ আদায়ের চেষ্টা করে, তাঁরা আন্দোলন সংগ্রামকে ভয় পেতে থাকে, পাশাপাশি সারা দুনিয়ার শিল্পাঞ্চল গুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠন গড়ে উঠে। আগের তুলনায় অনেক বেশী পারস্পরিক সংহতির মাত্রা বৃদ্বি পায়। ছোট ছোট গ্রুপ মিলে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। প্রতিক্রিয়াশীল সরকার গুলো এই ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাড়াবার মত সাহস দেখায় নাই।

ইংরেজদের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পরে ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক চরমপন্থার নতুন উত্থান হয়, স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণীর উপর এর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। বার্ডেট, হেনরি হান্ট, মেজর কার্টরাইট এবং উইলিয়াম করব্যাটের মত পুরুষ, যার সম্পাদিত পত্রিকা ‘রাজনৈতিক রেজিস্টারের’ বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যায়, এর ফলে ৬০ হাজার লোকের সঞ্চালন ঘটে। তিনি নতুন সংস্কার আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান ছিলেন। এটি শস্য আইন ও ১৭৯৯-১৮০০ এর সমন্বয় আইন, এবং সর্বাধিক, দুর্নীতিবাজ নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে। যার মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশকে ফ্রাঞ্চাইজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এটি প্রধানত আক্রমণের নির্দেশ দেয়।

দেশটির প্রতিটি বিভাগে সভা সমাবেশে এবং বিশেষ করে শিল্প অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চলের জেলায় বিপুল জনসাধারণের সমাবেশ ঘটে, সর্ব সাধারনের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাস্টলরিগার অধীন প্রতিক্রিয়াশীল সরকার যেকোন সংস্কারের বিরোধিতা করেছিল এবং প্রথম থেকেই এটি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখান করেছিল যেন সংস্কারের প্রক্রিয়াটি কার্যকর করা না যায়। ১৮১৯ সালের আগস্ট মাসে, ম্যানচেস্টারের পিটারসফিল্ডে ৬০ হাজার লোক ঢুকে সরকারের কাছে গণভোটের দাবীতে সমাবেশ করে। সরকার মিলিশিয়া দ্বারা তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং প্রায় ৪০০ জন লোক সেখানে আহত হয় এবং বেশ কয়েক জন শহিদ হন।

"পিটার্লু" এর গণহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালায় যার জন্য সরকার কুখ্যাত ছয়টি কালা কানুন দিয়ে নিপীড়নের ব্যবস্থা করে, যার ফলে সমাবেশের স্বাধীনতা এবং প্রেসের স্বাধীনতা স্থগিত করা হয়েছিল এবং সংস্কারকরা কঠোরভাবে প্রসিকিউশনের সম্মোখিন হন। তথাকথিত "ক্যাটা রাস্তার ষড়যন্ত্র" দ্বারা, যেখানে বলা হয়েছে, আর্থার থিস্টলউড এবং তার সহযোগীরা ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্যদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। সরকার সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে এগিয়ে যায়। তবে, ১লা মে, ১৮২০ সালে থিস্টলেউড এবং তার চারজন সংগীকে ফাঁসি থেকে রক্ষার জন্য ঘুষ হিসাবে অর্থ প্রদান করলে তা সরকার গ্রহন ও করে : হাবিইস কর্পাস অ্যাক্টকে দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিলো, এবং ইংল্যান্ডকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের অধীন ঠেলে দেয়া হয়। যা তার নাগরিকদের কোনও অধিকারকে সম্মান করে নাই।

এই সময় সাময়িক ভাবে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। তারপর ফ্রান্সে ১৮৩০ সালের জুলাই বিপ্লবের ফলে ইংরেজি সংস্কার আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়, যা এ যাবত কাল, একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের উপর পরিচালিত হয়েছিল। সংসদীয় সংস্কারের লড়াই আবার নতুন করে শুরু হয়, কিন্তু বুর্জোয়াদের সংস্কার বিল- ১৮৩২ সাল, পাশ করার পর তাঁরা সন্তুষ্ট হয়। শ্রমিকদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তারা মালিক পক্ষের উপর জয়লাভ করেছে বলে মনে করছিলো, তারা সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখান করে, কিন্তু নতুন সংসদ বেশ কয়েকটি প্রতিক্রিয়াশীল আইন প্রণয়ন করে, যার ফলে সংগঠিত শ্রমিকরা আবারও হুমকির মুখে পড়ে। এই নতুন আইনগুলি ছিলো নিপিড়নের জ্বলন্ত উদাহরণ। ১৮৩৪ সালের সেই কুখ্যাত দুর্বিষহ আইন, যা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। যে আইনের আওতায় শ্রমিকরা মনে করে যে, তাদেরকে বিক্রি করা হয়েছে এবং তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং এই অনুভুতিই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাথে তাঁদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়।

খ্রিস্টবাদের মধ্যে ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য একধরনের সংস্কার মূলক আন্দোলন দানা বাঁধে, এটা সত্য যে বুর্জোয়া দল সমূহ শ্রমিকদের মাঝে একটি সক্রিয় উপাদান দেখতে পায়, তাই তাঁরা এদেরকে ও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে অনুপ্রানিত হয়। খ্রিষ্টান আন্দোলন সমূহের মধ্যে ছয় দফার আন্দোলনই ছিলো প্রধান যাদের মূল লক্ষ্য ছিলো পার্লামেন্টারী সংস্কার সাধন করা, আবার তাঁরা শ্রমিকদের দাবী দাওয়ার প্রতি ও ছিলো শ্রদ্বাশীল, তবে সামাজিক আমূল পরিবর্তনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে সেই সময়ে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন, জে, আর স্টিভেন্স, তিনি ম্যানচেস্টারে এক জনসভা আহবান করেন, তিনি সেখানে বলেন, আমাদের আন্দোলন কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। আমরা জনসাধারনের দুঃখ কষ্ট লাগবের দাবী করছি। আমরা দাবী করছি, “মানুষের রুটি, রুজির ব্যবস্থা হোক”। মানুষের গৃহ, খাদ্য, সমিতি করার অধিকার, ও শ্রমিকের শ্রমদান সময় কমিয়ে দেবার জন্য।

খ্রিষ্টান আন্দোলন একসময় ইংল্যান্ডের মাটিতে বিপ্লবী হয়ে উঠে, তারা বুর্জোয়া ও শ্রমিক উভয় শ্রেনীর মধ্যে ব্যাপক সারা ফেলে দেয়, তাঁরা বলতে থাকেন যে, দেশে যে কোন সময় গৃহযোদ্ব লেগে যেতে পারে। সেই সময় ব্যাপক হারে চারদিকে সভা-সমাবেশ, মিছিল শ্লোগান চলতে থাকে, কল কাখানায় ধর্মঘট, হরতাল চলতে থাকে। ভীত সন্ত্রস্ত কারখানার মালিকগন, স্ব স্ব শিল্প কারখানায় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে, “ তাঁদের সম্পদ ও জীবন সুরক্ষার জন্য”। এই পরস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেনী ও সশস্ত্র হয়ে উঠে। ১৮৩৯ সালে খ্রিষ্টান নেতাগন সারাদেশের মানুষকে তাঁদের আন্দোলনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বুঝানোর জন্য বেশ কিছু ভালো বক্তা নির্বাচন করে নানা স্থানে প্রেরন করেন। কেবল বার্মিংহামেই পাঠায় ১২ জন সুবক্তা। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো খ্রিষ্টান পিটিশনে মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা। তাঁদের সমাবেশ গুলো লোকে লোকারন্য হয়ে উঠে। এতে তাঁরা প্রামান করেন যে তাঁদের আন্দোলনের প্রতি জনগনের ব্যাপক সাড়া দিয়েছে।

খ্রিস্টানদের এই আন্দোলনে অনেক বুদ্বিজীবী ও সুবক্তা ছিলেন, এমনকি অনেক ত্যাগী ও সৎ লোক সেই সময় আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন ( যেমন- উইলিয়াম লাভেল, ফিরাজু কর্নার, ব্রান্টিয়ার, ও বেরিন, জে আর স্টিফেন্স, হেনরী হিটারিংটন, জেমস ওয়েস্টন, হেনরি ভিনসেন্ট প্রমুখ।) এই আন্দোলনের নির্দেশনা, গনমাধ্যমে ব্যাপক ঝড় তুলে সেই সময়। দি পোর ম্যান্স গার্ডিয়ান, এবং নর্দান স্টার সামাজিক প্রভাব বলয় তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সত্যিকার অর্থে খ্রিস্টবাদের সত্যিকার কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলো না, তবে তাঁরা সামাজিক অশান্তি দূরী করনের জন্য কিছু সুদূরপসারী প্রস্তাবনা হাজির করেন। চার্টিস্টদের সময়ে সমাজবাদিরা খ্রিস্টবাদের এই কর্মকান্ডকে প্রচণ্ড ভাবে নাকচ করে দেয়, তাঁরা সেই আন্দোলনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু এর পর ও উইলিয়াম থমসন, জনগ্যারি, এবং বিশেষ করে রবার্ট অয়েনের চিন্তাধারা ইংরেজ শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক সারা ফেলে দেয়।

ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং রাইন দেশ সমূহে এবং যে মহাদেশে প্রথম শিল্প পুঁজিবাদের জন্ম হয়, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে, সেই পরিস্থিতিতে বাস্তব প্রয়োজনেই আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে এবং সেই আন্দোলন প্রতিটি দেশে প্রাথমিক অবস্থা থেকে ক্রমে আন্দোলন কারীদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্দির সাথে আন্দোলন ও পরিপূর্নতা অর্জন করে। নয়া সমাজিক ব্যবস্থার দাবী উত্থাপিত হয়। শ্রমিকদের ঐক্য ও সমাজবাদি লোক উভয়ের বক্তব্য একেই ছিলো। কিন্তু তা রাজনৈতিক ধ্যানধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিটি সমাজবাদি তত্ত্বের ধারায় নিজনিজ মতবাদ অনুসারে চলমান ও ভবিষ্যৎ আন্দোলনের গতিমূখ নির্ধারন করে দেয়।

এমন একটি সময় ছিলো যখন কিছু সমাজবাদি আন্দোলন শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলনের তেমন কোন প্রকার গুরুত্বই দিত না, তাঁরা তাঁদের আন্দোলন সংগ্রামের প্রতি কোন সংহতি এবং প্রয়োজন ও অনুভব করত না। তাঁরা মনে করত শ্রমিকগন এখন যা করছে তা তাঁদের কেবল দৈনিন্দিন কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াই মাত্র। তাই, তাঁদের অনেকেই মনে করলেন যে, শ্রমিকদেরকে বুঝানো দরকার তাঁদের লড়াইয়ে আশু লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সমাজবাদ। সেই লড়াই সংগ্রামের জন্য, আরো জোড়দার সংগ্রাম তৈরি করা দরকার। তাদেরকে বুঝানো দরকার এবং এটা গভীর ভাবে উপলব্দি করতে হবে যে মজুরী দাসত্ব রেখে সামগ্রীক মুক্তি কোন দিন আসবে না। তবে এটা সত্য যে যদি ও দৈনিন্দিন দাবী দাওয়া নিয়ে শ্রমিকগন আন্দোলন সংগ্রাম করেন তবে তা গুরুত্বহীন নয়, এর মধ্যে ও বৃহৎ আন্দোলন সংগ্রামের বীজ নিহিত থাকে। তবে সেই আন্দোলন সংগ্রামে দরকার হল নয়া লক্ষ্য নির্ধারন করা। বাস্তবতা থেকে অনেক কিছু নির্গত হতে পারে। একটি শূন্য খালি স্বপ্ন থেকে নয়া দুনিয়ার জন্ম হবে না, কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে রুটি রুজির যে সংগ্রাম, শ্রেনী বৈষম্যের বিরুদ্বে যে লড়াই তা থেকে উন্মেষ ঘটবে এক বৈপ্লবিক মহা সংগ্রামের। যে সংগ্রাম নয়া সমাজ, নয়া জীবন একজন শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষকে উপহার দিবে।

নিয়োগ কর্তা ও তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্বে যে প্রতিদিনের সংগ্রাম, তার ভেতর দিয়েই একজন শ্রমিক ক্রমশ লড়াই সংগ্রামের মৌলিক বিষয়াদি উপলব্দি করতে সক্ষম হবে। প্রাথমিক ভাবে একজন শ্রমিক তাঁদের তাৎক্ষনিক দরকারী বিষয় গুলো যা প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতিতে গ্রহন যোগ্য তা প্রকাশ করবে, পরে ক্রমশ অর্থনৈতিক একচাটিয়াবাদের বিষ চক্রের বিরুদ্বে এবং প্রচলিত সমাজের অসংগতি সমূহ নিয়ে কথা বলবে। তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে প্রতিদিনের লড়াই সংগ্রাম সত্যিকার শিক্ষার জন্য একটি বড় ও কার্যকরী অস্ত্র।

সামন্তবাদের আমলে সামন্ত প্রভূদের অধীনস্থ কৃষকগন ক্রমাগত বিদ্রোহ বিক্ষোভ করাতে থাকে। ফলে সামন্ত প্রভূদের মাঝে ও এই চিন্তার উদ্রেক হয় যে প্রচলিত ব্যবস্থায় দির্ঘ কাল আর ঠিকে থাকা যাবে না, তাই চাষি মজুর শ্রেনীর জীবন যাত্রায় পরিবর্তন না করলে একটি মহা বিপ্লবের সূচনা হতে পারে। ফলে বর্তমান ব্যবস্থাটাই ভেঙ্গে পড়তে পারে। তাই পুঁজিবাদী সমাজে এখন যে পরিমাণ শ্রমিক সমাবেশ ঘটেছে, তাঁরা সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করতে সক্ষম, সমাজবাদ এখন একটি জীবন্ত বাস্তবতা হিসাবে দেখা দিয়েছে। কৃষক বিদ্রোহ ছাড়া ও ফ্রান্সের বাস্তিলে প্রায় পাঁচ শত বিদ্রোহের রিপোর্ট করেন টেইনী ১৭৮১ সালে। এই ধারনা সকল জায়গায় স্বাধীনতাকামী মানুষ সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সারা দুনিয়াময় এই রকমের এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি পেছনে কেবল আধুনিক শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলনই প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। এটা বলা সমীচীন নয় যে শ্রমিকদের বস্তুগত বা তাঁদের মানসিক পরিস্থিতির কারনেই এমনটি করতে সক্ষম হয়েছে। পুঁজি ও শ্রমের যে দ্বন্দ্ব তা কেবল কিছু ব্যাক্তির মনে জন্ম নিয়েছিলো, সেই চিন্তার সাথে শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রাম যুক্ত হয়ে এতে রক্ত মাংশের মিলন ঘটায়। শুধু তাই নয়, এটা একটি নয়া সমাজ ব্যবস্থা ও আগামীদিনের সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রক্রিয়া জোরদার করে। উন্মোচন করে এক নয়া দিগন্তের।

নোট:

১। সত্যিকার ভাবে কেহই এই শব্দটির অর্থ জানেনা। কেহ কেহ বলেন এটা নিড লুড্ড র নাম। কিন্তু এর কোন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নেই। কোন কোন জায়গায় এটাকে বলে, “জেক সুইং” এবং “গ্রেট এঙ্কো” কিন্তু এ সব কিছু অর্থ একেই দাঁড়ায়।
২। লর্ড বায়রন লুড্ডিতের প্রতি প্রচণ্ড সহানুভুতি প্রকাশ করে কবিতা লিখেন, যার প্রথম কয়েকটি লাইন এইরূপ:

“ সামগ্রীক স্বাধীনতা কেবল সমূদ্রের উপর
অকাতরে রক্তদিয়ে স্বাধীনতা এলো
তাই আমরা, বালকেরা আমরাই
স্বাধীন ভাবে বাঁচার লড়াই করব, নইলে মরব
সকল রাজা নিপাত যাক, বেঁচে থাকুক রাজা লুড্ডি!”

তৃতীয় অধ্যায়

সিন্ডিক্যালিজমের অগ্রদূতগন

প্রাথমিক স্তরের সমাজবাদি ভাবধারায় গড়ে উঠা শ্রমিক আন্দোলনের সাথে আমাদের বর্তমান বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিজম আন্দোলনের একটি গভীর যোগসূত্র আছে। এই ভাবধারাটি প্রথমিক ভাবে বিরাট শিল্পের মাতৃভূমি ইংল্যান্ডে সূত্রপাত হয়, এবং পরে ইংলিশ শ্রমিক শ্রেনীর নানা বিভাগের মাঝে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। কম্বিনেশন আইন বাতিলের পর শ্রমিক শ্রেনী বৃহত্তর পরিসরে তাঁদের ট্রেড ইউনিয়ন গুলো শক্তিশালী করার সুযোগ পায়, এত কাল তাঁদের স্থানীয় বা স্ব স্ব কর্ম ক্ষেত্রে কাজ করার যে অভিজ্ঞতা তাঁরা অর্জন করেছে তা এখন বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগাবার সুযোগ পায়।

প্রথমিক আন্দোলনের মধ্যে সামাজিক রাজনৈতিক বিষয় গুলো গভীর ভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তবে সেই সময়ে শ্রমিকগন রাজনৈতিক সংস্কার মুলক কাজের সাথে কিছু কিছু পরিচিত ছিলেন। তবে তাঁদের আর্থ সামাজিক আমূল পরিবর্তনের কোন লক্ষ্য স্থির করা হয়নি। এমন কি ত্রিশের দশকের আগে পর্যন্ত সমাজবাদি ভাবধারা সত্যিকার অর্থে প্রভাবিত করতে পারে নাই। সেই সময় কাল পর্যন্ত ব্যাপক অংশের শ্রমিক জন গুষ্টি রবার্ট ওয়েনের মতবাদেই আস্থাশীল ছিলেন। পার্লামেন্টে জাতীয় শ্রমিক ইউনিয়ন সংক্রান্ত তথাকথিত সংস্কার আইন পাশের আগে পর্যন্ত, কেবল বস্ত্র শিল্পের শ্রমিকগনের মধ্যে একটি অগ্রসর অংশ বৈপ্লবিক ভাবধারা পোষন করতেন। সেই পরিস্থিতে তাঁরা মাত্র চারটি উল্লেখযোগ্য দাবী মালিক পক্ষের সামনে উত্থাপন করেন:

১। একজন শ্রমিককে তার প্রকৃত শ্রমের মূল্যদিতে হবে;
২। শ্রমিকদেরকে সামগ্রীকভাবে তাঁদের কাজের সূরক্ষা দিতে হবে, যেন নিয়োগ কর্তা কোন ভাবেই তাদের সাথে অন্যায় আচরন করতে না পারে;
৩। পার্লামেন্ট সংস্কারের মাধ্যমে সকল নারী পুরুষের কষ্ট লাগবের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪। অর্থনৈতিক সমস্যার উপর শ্রমিকদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কারের কথা তুলে ধরে বলা হয়, সকল স্বৈরাচারী ব্যস্থার অবসান ঘটিয়ে সমগ্র দেশকে একেই বিধি বিধানের আওতায় আনতে হবেঃ এই কথার মাধ্যমে এটা প্রকাশ পায় যে শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা তখনো রবার্ট ওয়েনের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আছেন।

১৮৩২ সালের সংস্কার বিল, ও চলমান রাজনৈতিক ধোঁয়াশা ইংলিশ শ্রমিক শ্রেনীর একটি বিরাট জোটকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিলো। যখন বিলটি আইনে পরিণত হল তখন দেখা গেল মধ্যবিত্ত শ্রেনী ভূমি মালিকদের উপর বেশ কিছু সবিধা পেলে ও শ্রমিক মজুরদের সাথে আবারো বিশ্বাস ঘাতকতা করা হয়েছে। বুর্জোয়া শ্রেনীর লোকেরা তাদেরকে এক অগ্নি গহব্বরের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। ফলে এটা তখন আরো দিবালকের মত স্পষ্ট হলো যে, শ্রমিক শ্রেনী বুর্জোয়া শ্রেনীর জোটের নিকট থেকে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর আগে স্বতস্ফুর্ত ভাবে শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলন ব্যাপক রূপ ধারন করেছিলো, সেই আন্দোলনে অনেক ধনী গরীব,মালিক শ্রমিক নানা শ্রেনীর মানুষ যুক্ত হয়, কিন্তু এই ঘটনার পর শ্রমিক শ্রেনীর মনে নতুন ভাবনার সৃষ্টি হয়। তাঁরা তখন বুঝে গেল শ্রমিক শ্রেনীর মানুষ ছাড়া তাঁদের স্বার্থ অন্য কেউ দেখবে না। তাঁরা তাঁদের সত্যিকার শক্তি ও দূর্বলতা চিহ্নিত করার প্রায়স চালায়। শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা তখন সংস্কার মূলক আন্দোলনে অংশ গ্রহনের ক্ষেত্রে আরো বেশী সচেতন হয়, নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের ক্ষেত্রে ও আর্থ-সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্বি পায়।

রবার্ট ওয়েনের প্রচারনার উপর তাঁদের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়, যার সংগঠিত শ্রমিক শ্রেনীর উপর প্রতিনিয়ত প্রভাব বৃদ্বি পেতে থাকে। ওয়েন স্বীকার করেন যে সরল ভাবে যে সকল শ্রমিক সংগঠন গড়ে উঠছে, তাদেরকে অর্থনৈতিক ভিত্তি উপর দাঁড় করতে হবে এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির মৌলিক নীতিমালা সংশোধনের জন্য জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি ব্যাক্তিগত ভাবে এই বিশ্বাসের উপর খুব জোর দিতেন। তিনি দেখান যে, পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান আছে তা কোন সাধারন আন্দোলন সংগ্রাম দিয়ে সমাধান হবে না, তাই তিনি কোন ভাবেই আমূল পরিবর্তনকামী লড়াই সংগ্রামের বিষয়কে কম গুরুত্বদেননি। অন্য দিকে তিনি শ্রমিকদেরকে বলেছেন আইনগত ভাবে খুব বেশী কিছু পাওয়া যাবে এমন আশা করে কোন লাভ নেই।

সামগ্রীক মুক্তি তখনই মিলবে যখন শ্রমিক সকল কিছুর দায়িত্ব নিজদের হাতে নিতে পারবেন। এই ধারনাটি ইংরেজ প্রাগ্রসর শ্রমিক শ্রেনীর অনেকেই গ্রহন করেন, আর সেই ধারনাই তাঁদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ের প্রেরনা যোগায়। নির্মান শ্রমিকদের ইউনিয়ন স্থানীয় ভাবে ও কম শক্তিশালী ছিলো না, তাঁদের সংগঠন সমূহ ও কোন ভাবেই পিছিয়ে থাকেনি। তাঁদের শক্তি সামর্থ নিয়োগ কর্তাদের কাঁপিয়ে দেবার মত অবস্থায় ছিলো। ১৮৩১ সালে ওয়েন ম্যানচেস্টারের এক সভায় উপস্থিত সদস্যদের সামনে একটি সমাজ পূর্গঠন মূলক পরিকল্পনা পেশ করেন। সেই পরিকল্পনায় তিনি সমাজবাদি কাউন্সিলের প্রস্তাব করেন, যেখানে তিনি উৎপাদক শ্রেনীর সমবায় সমিতি গঠনের প্রাস্তাব করেন যা নিয়ন্ত্রিত হবে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে। তার সেই প্রস্তাব সভায় গৃহিত হয়, এবং নির্মান শ্রমিকগন কিছু দিনের মধ্যেই মালিক পক্ষের সাথে দির্ঘ সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে, সেই সময়ের অসন্তোষ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে শ্রমিকদের সংগঠন হুমকির মুখে চলে যায় এবং ফলে ওয়েন বাধ্য হয়ে আন্দোলনের রাশ টেনে ধরেন। ফলে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠে।

রবার্ট ওয়েন এই পরিস্তিতিতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন নাই, কিন্তু তিনি নিজের হতাশা কাটিয়ে নয়া উদ্যমে পুনরায় কাজ চালিয়ে যান। ১৮৩৩ সালে লন্ডনে তিনি এক সম্মেলনের ডাকদেন, এতে ট্রেড ইউনিয়ন ও সমাবায় সমিতি সমূহকে যোগদানের আহবান জানান। সেই সম্মেলনে তিনি তার নয়া পরিকল্পনা সকলের সামনে উপস্থাপন করে যেখানে ছিলো সামাজিক সংস্কারের বা পুনর্গঠনের নয়া নক্সা। সেই সম্মেলনের প্রতিনিধিদের প্রতিবেদন সমূহ পাঠ করলে সহজেই একজন লোক বুঝতে পারবেন যে, ইংরেজ অগ্রসর শ্রমিকদের উপর ওয়েনের চিন্তার প্রভাব কত তিব্রতর ছিলো। দি ফোর ম্যানস গার্ডিয়ান পত্রিকা সংক্ষিপ্ত আকারে সম্মেলনের প্রতিবেদন গুলো তুলে ধরেন এই ভাবে:
“সাবেক কম্বিনেশন আইনের সাথে এই সম্মেলনের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে আসা উদ্দেশ্য সমূহের লক্ষ্যের কিছু পার্থক্য স্পস্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রতিবেদন সমূহ সামগ্রীক সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলছে – তাঁরা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবী করছে- আর তা করতে হবে শ্রমিক শ্রেনীকেই। তাঁরা সমাজের উঁচু তলার মানুষের জন্য তা করবেন না, করা হবে নিচু তলার সাধারন মানুষের জন্য– বা উঁচু নিচু নয় সকলের জন্য সামাজিক পরিবর্তন করতে হবে।”

এই সম্মেলনের ফলে ১৮৩৪ সালের প্রারম্ভেই গ্র্যান্ড ন্যাশনাল কনসোলিডেটেড ট্রেড ইউনিয়ন অব গ্রেট ব্রিটেন এন্ড আইয়ারলয়ান্ড গঠিত হয়। সেটা ছিলো উৎসাহ ও উদ্দীপনার সময়। সেই সময় সমগ্র দেশ অসংখ্য ধর্মঘট, লক আউট ও হরতালে ছিলো উত্থাল। এবং বিপুল পরিমাণ শ্রমিক সেই সময়ে ইউনিয়নের সদস্য পদ গ্রহন করতে এগিয়ে আসেন, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই প্রায় ৮০০,০০০ শ্রমিক সদস্য ভূক্ত হন। জি,এন,সি প্রতিস্টার পর পর ই তাঁরা উদ্যোগী হয়ে ছোট বড় নানা স্থানে গঠিত সংগঠন সমূহকে নিয়ে একটি ফেডারেশন গঠন করেন। যা শ্রমিক শ্রেনীর শক্তি সামর্থ বাড়িয়ে দেয় ফলে তাঁরা যে কোন কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়ে উঠেন।

কিন্তু তাঁদের এই বিশাল সংগঠন সত্যিকার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন নাই, এমন কি শ্রমিকদের সত্যিকার সংহতি, ইউনিয়নিজম, বা পারস্পরিক সহযোগীতার ক্ষেত্র ও প্রস্তুত করতে, এবং রাজনৈতিক সংস্কার মূলক কিছুই করতে পারে নাই। দি জি, এন, সি স্ব স্ব দেশে শ্রমিকদের জীবন যাত্রার মান বাড়ানোর জন্য নিজেকে একটি লড়াকু সংগঠন হিসাবে গড়ে তুল, সাথে এই কথা ও ঘোষনা করে যে তাঁরা পুঁজিবাদের শিকর উপড়ে ফেলতে চায়, আর সেই খানে তাঁরা উৎপাদক শ্রমিকদের সমবায় ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে চায়, যেখানে কোন ব্যাক্তি নিজের জন্য কোন মুনাফা করার সুযোগ পাবেন না, উৎপাদন হবে সকলের চাহিদা পুরনের জন্য। জি এন সি সেই সময় ঘোষণা দেয় তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য বাসতবায়নের জন্য যা যা করনীয় তা করতে কিছুতেই পিছপা হবেন না।

ফেডারেশন গড়ে তুলার উদ্যোক্তাগন চাইছিলেন শিল্পকারখানা, কৃষি উৎপাদনকারী প্রতিস্টান সমূহকে একটি ছাতার আওতায় এনে প্রতিটি উৎপাদন সংক্রান্ত বিশেষ বিভাগ খোলে সামগ্রীক উৎপাদন ও বন্ঠন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবেন। প্রতিটি শিল্প কারখানা বিশেষ বিভাগের আওতায় তাঁদের উৎপাদন কাজ চালিয়ে যাবে। এবং যেখানে যেখানে সম্ভব সেখান থেকে শ্রমিকগনকে নিয়ে এসে সমবায় সমিতিটি পরিচালনা করবে, যারা পরিচালনাগত খরচ সহ প্রকৃত উৎপাদন খরচ অনুসারে পন্য সমূহ ভোক্তাদের নিকট বিক্রি করবেন। সার্বজনীন সংগঠন সমূহ কোন একটি শিল্প কারখানার সাথে যুক্ত হবে এবং তাঁদের কার্যক্রম সকলের স্বার্থে পরিচালিত হবে। পন্য বিনিময় করার ক্ষেত্রে তথাকথিত শ্রমবাজার হয়ত কিছু সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে– সেই ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থ বা শ্রম টিকেটের ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্থির প্রতিস্টানিক সম্প্রসারনের জন্য তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা ছিলো যে, সেই ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের সাথে প্রতিযোগীতায় সামাজিক পুনগঠনের দরকার হতে পারে।

সাথে সাথে তাঁরা এই কথা ও বুঝতে পারছিলেন যে, কৃষি খামার ও শিল্প কারখানায় শ্রমিকগন সহজেই দৈনিন্দিন লড়াইয়ে পুজিবাদকে পরাস্ত করে দিতে পারবেন। এই বিষয়ে তাঁরা তাঁদের সাত দফার মধ্যে তিন দফাতেই বক্তব্য রেখেছেন। জি এন সি তার জন্ম লগ্নেই এই বিষয়ে বক্তব্য জনতার সামনে হাজির করেছিলো: “জমিই হলো জীবন প্রবাহ ঠিকিয়ে রাখার প্রথমিক ও প্রধান সহায়ক উৎস, সুতরাং এর মালিকানা অর্জন করা ছাড়া, উৎপাদক শ্রেনীর লোকেরা পুঁজিবাদী শ্রেনীর সাথে প্রতিযোগীতায় ঠিকতে পারবে না, ব্যবসা বানিজ্যে সকল সময়েই উঠা নামা আছে, তাই কমিটি এই প্রস্তাব করছে যে জমি লিজ নিয়ে ইউনিয়নের কার্যক্রমের ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে, সেই জন্য কর্মে নিয়োগকৃত একটি অংশ সকল সময়েই উৎপাদনে জড়িত থাকতে হবে, যদি তা না করা হয় তবে কৃষি ক্ষেত্রে যেমন ভূমি লিজের শর্ত ভঙ্গ হবে অন্য দিকে পন্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, কেন না উৎপাদন, সরবরাহ এবং ভোগের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতেই হবে।”

“কমিটি অত্যন্ত দৃঢ় চিত্যে ঘোষনা করছে যে, দাবী দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে প্রচলিত ব্যবস্থার আওতায় ধর্মঘট করতে হবে, লোকেরা কাজ করছে, উৎপাদন করছে, পন্য তৈরি করছে সকলের জন্য, তাঁদের জন্য তৈরি করেছে একটি জোট তা হল ইউনিয়নঃ তাঁরা তাঁদের ভাই বোনদের জন্য আন্ত্রিক ভাবে পন্য তৈরি করছে। তাঁরা যদি সমস্যায় পড়েন, কর্ম ক্ষেত্রে, বিক্রয় কেন্দ্রে যদি অব্যবস্থাপনার শিকার হন তবে অবশ্যই তাঁদের ও উৎপাদনে বাঁধা দেবার, সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি করার অধিকার আছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাস্তব সম্মত ও ব্যাপক আকারে বিকেন্দ্রীকরনের ও কাঁচামাল এবং পন্য দ্রব্য সরবরাহের ব্যবস্থা করবে। যখন যেখানে সম্ভব, প্রতিটি জেলায় এক এক টি করে সংরক্ষনকারী গুদাম ঘর নির্মান করা হবে, গৃহস্থালী পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য সেই গুদামে মালামাল সংরক্ষিত থাকবে: আর সেখান থেকেই উৎপাদন খরচের উপর ভিত্তিকরে মালামাল বিক্রি করা হবে।”

জি এন সি ও তার প্রতিস্টাতাগন ট্রেড ইউনিয়ন এবং সমবায় বলতে সকলের জন্য কল্যাণ বুঝতেন। বাস্তবে সমাবায় ও ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনায় অংশগ্রহন করে শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা জ্ঞান অর্জন করবে কেমন করে শিল্প কলকারখানা পরিচালনা করতে হবে, উৎপাদন ব্যবস্থা যঝন তাঁদের নিয়ন্ত্রনে আসবে তখন কেমন করে পরিচালনা করতে হবে তা শিখবে এবং সত্যিকার শোষন প্রক্রিয়া গুলো সম্পর্কে হাতে কলমে শিখে ও বুঝে নিবেন উৎপাদক শ্রমিক শ্রেনী। এই ধারনা গুলো শ্রমিক সভা সমাবেশে ও প্রেসের সামনে দৃঢ় ভাবে তুলে ধরা হবে। উদাহরন হিসাবে বলা যায় যে, দি পায়নিয়ার হিসাবে জি এন সি পরিচালিত জেমস মরিসনের পুনঃ পুনঃ বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রতিউত্তর বাস্তব আধুনিক জ্ঞানকে সমৃদ্ব করেছে। রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য এই ধরনের আলোচনা খুবই কার্যকরী ও প্রয়োজনীয় বিষয়।

বিরোধী পক্ষের বক্তব্য ছিলো অর্থনৈতিক পরিবর্তনে শ্রমিক শ্রেনীর কোন ভূমিকা নেই, এতে তাঁদের কোন স্বার্থ ও নেই- সমাজবাদের সূত্র উল্লেখ করে তাঁরা হাউজ অব কমন্সে এই ধরনের বক্তব্যই দিচ্ছিলো । এই ধরনের হাউজের পরিবর্তে ফেডারেশন গড়ে তুলা হবে, এই গুলো জনসাধারনের স্বার্থকে ধারন করেনা , এঁরা হাজারো সমস্যার জন্মদাতা। এঁরা যেমন উৎপাদনের শত্রু এঁরা ভোগের ও শত্রু। এই সংগঠন সমূহ বর্তমান প্রচলিত ব্যবসা বানিজ্যে হাল ধরবে; আর অন্যান্য সকল সাধারন সম্পত্তির অধিকার নিজেদের হাতে নিয়ে নিবে। তখন কোন রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রের দরকারই হবে না। জাতীয় সম্পদ তখন আর পরিমাণ দিয়ে নির্ধারন করা হবে না। বরং মানুষ কত টুকু সন্তুষ্ট আছে তা দিয়ে নির্ধারিত হবে। এখন যে হাউস অব কমন্স আছে তা হাউজ অব ট্রেড হিসাবে গন্য হবে।

জি এন সি গঠিত হবার পরই ব্যাপক সারা পায় শ্রমিক শ্রেনীর পক্ষ থেকে। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষ এর সদস্য হিসাবে নাম লিখায়, যদি এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রাথমিক ভাবে শ্রমিক ও বুদ্বিজীবী মহলের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন, তবে তাঁরা এর বাহিরে থাকতে পারছিলেন না, কম পক্ষে সকলের এর উত্থাপিত দাবী ও বক্তব্যের সাথে ঐক্যমত পোষণ করে চলছিলেন। দশ ঘন্টার হরতাল পালনে তাঁদের শক্তি পরিক্ষা হয় এবং সকল শ্রমিকের মধ্যে এর সারা জাগে। জিএন সি তাঁদের দাবী আদায়ের জন্য সর্ব শক্তি নিয়োগ করে মাঠে নামে। ওয়েন নিজে এবং তার গনিস্ট বন্দ্বু ডরতি, ফিল্ডেন ও গ্রান্ট আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তবে জি এন সি র কার্যক্রমে যে জংগীপনা দেখা গেল তা দেখে পার্লামেন্ট সদস্যরা ও কিছু নমনিয় হয়ে পড়েন। তবে তাঁরা শ্রমিক শ্রেনীর লোকদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করে, তাঁরা বলেন, এই দশ ঘন্টার হরতাল সামগ্রীক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলবে। “ তাঁরা বলেন, পুর্নবয়স্ক লোকদেরকে নিয়ে ইউনিয়ন গঠিত হবে এই মর্মে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিল পাশ করা হবে”। এটাই পরে স্লোগানে পরিণত হয়।

ধর্মঘটের ধারনাটি নানা ভাবে বিভক্ত শ্রমিকদেরকে এক ছাতার নিচে ঐক্যবদ্ব করে, তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। ১৮৩২ সালে, ইউলিয়াম বেনবো, সেই নয়া আন্দোলনের একজন অত্যন্ত সফল প্রচারক একজন ব্যাক্তি, তিনি একটি চমৎকার পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিলো গ্যান্ড ন্যাশনাল হলিডে এবং কংগ্রেস অব দি প্রোডাক্টিভ ক্লাসেস, পুস্তিকাটি ব্যাপক ভাবে প্রচার ও করা হয়।সাধারন ধর্মঘটের ধারনার উদ্ভাবন ও চর্চা শ্রমিক শ্রেনীর গুরুত্ব সর্বমহলে নাড়া দেয়। বেনবো বলেন, যদি শ্রমিকদেরকে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় তবে তা হবে দাসত্বের নামান্তর, তাই তাঁদের নিজেদেরকে সংগঠিত করে নিজেদের স্বাধীকার নষ্ট এমন কোন কাজে জড়িত হওয়া যাবে না।

এই ধরনের লড়াইয়ের অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে শারিরীক শক্তির দরকার হয় না, অনেক ক্ষেত্রে কোন কাজ না করে ও উন্নত সৈনিকের লড়াইয়ের চেয়ে ও বেশী উপকার পাওয়া যায়। প্রচলিত ব্যবস্থার পতন ঘটাতে, শ্রমিকদেরকে সংগঠিত করতে, এই পদ্বতি একটি বুদ্বিবৃত্তিক পথ ও পন্থা। বেনবো আরো অগ্রসর প্রস্তাব পেশ করেন, এই ধরনের ধর্মঘট জাতীয় কর্মসূচী পালনের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সমগ্রদেশে পরিকল্পনা করতে হবে। যা সকল দেশকে অচল করে দেয়া যায়, এই কর্ম সূচী পালিত হবে শ্রমজীবী কর্মজীবী মানুষের হ্রদয় থেকে উৎসারিত হয়ে, তা কোন ভাবেই চাপিয়ে দেয়া হবে না।

জি এন সি এর দ্রুত সম্প্রসারন এবং এর চেতনা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে যুগ যুগ ধরে চলে আসা মালিক ও নিয়োগকারীদের প্রতি ঘৃনা ও ভীতি দূরীভূত হতে লাগল। তাঁরা অনুভব করলেন তাঁদের আন্দোলনকে আরো আগ্রসর করে সকল স্থানে প্রতিস্টা করতে হবে, বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন কায়েম করে এগিয়ে যেতে হবে। এই অবস্থা অবলোকন করে সমস্ত বুর্জোয়া গণমাধ্যম জি এন সি র কার্যক্রমকে একটি “অপরাধ মূলক” কাজ বলে প্রচার করতে শুরু করে, তাঁরা বলতে থাকে এই কার্যক্রমের ফলে সমস্ত দেশে উৎপাদন মারত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, উৎপাদনে বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই সকল শিল্প কারখানার মালিকেরা পার্লামেন্টের নিকট এই মর্মে লিখিত দাবী করল যে, তাঁরা যেন শ্রমিকদের এই ধরনের কাজের বিরুদ্বে আইন প্রনয়ন করে, শ্রমিকদের চলমান কার্যক্রমকে বেয়াইনী ঘোষণা করে দেয়। অনেক কারখানার মালিক শ্রমিকদেরকে ব্যাক্তিগত ভাবে ডেকে নিয়ে তাদেরকে ইউনিয়নের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বলে, নইলে তাদেরকে চাকুরীচ্যুত করা সহ কারখানা বন্দ্বকরে তাদেরকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলার হুমকী দমকী দিতে থাকে।

পার্লামেন্ট তখন কিন্তু মালিক পক্ষের কথা শোনে নাই, তাঁরা সমন্বয় আইন পুনস্থাপনের জোরদেয়, কিন্তু সরকার বিচারকদের কে শ্রমিকদের বিরুদ্বে আইনের আওতায় সকল প্রকার কঠোর শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়। বিচার বিভাগ সেই রকম ব্যবস্থা নিতে থাকে, তাই অনেক শ্রমিককে আত্মগোপন করে কাজ চালাতে হয়। কিন্ত সেই সমন্নয় আইনের আওতায় বহু শ্রমিককে গ্রেফতার করে বিচারে সম্মোখিন করা হয়। আইনের শাসনের নামে হাজার হাজার শ্রমিককে ছোট ছোট অপরাধের জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা ঘোষনা করে আদালত সমূহ। নিরিহ শ্রমিকদেরকে সন্ত্রাসী বানিয়ে তাঁদের উপর অসংখ্য কল্পকাহিনী তৈরী করে শাস্তি দিয়ে মালিক ও সরকার পক্ষ তাঁদের মনের জ্বাল মিটাতে থাকে। জে এন সি র গৃহিত উদ্যোগে অনুপ্রানীত হয়ে ডোরচেস্টার গ্রামের একজন মাঠ পর্যায়ের শ্রমিক একটি সংগঠন করেন তার নাম টুলপডলে। তিনি তাঁদের সাথীদের নিয়ে সাপ্তাহে তাঁদের বেতন সাত সিলিং থেকে বাড়িয়ে আট সিলিং মজুরী বৃদ্বি করার জন্য দাবী করে। দাবী উত্থাপন কারীদেরকে তাৎক্ষনিক ভাবে গ্রেফতার করে ভয়ঙ্কর শাস্তি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কোলোনীতে সাত বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাঁদের একমাত্র অপরাধ হলো তাঁরা ইউনিয়নের সদস্য।

জি এন সি প্রথম থেকেই দির্ঘকাল মজুরী বৃদ্বির লড়াই সংগ্রাম চালিয়েছে, এবং ক্রমাগত ভাবে নানা প্রকার বিচার আচারের সম্মোখিন হয়েছে। এই ভাবেই তারা নানা প্রকার চড়াই উৎরাই পার হবার মধ্য দিয়ে জনগণকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলার চেষ্টা করেছে। হয়ত এমন অনেক কাজ করতে হয়েছে যা সেই সময়ের জন্য উপযুক্ত ছিলো না। কোন কোন শ্রমিক সচেতন ভাবেই এসেছে, কেহ কেহ তার তাৎক্ষনিক চাহিদা মেটাতে এসেছে, এঁদের অনেকে ধর্মঘটের পক্ষে খোলাখোলী ভাবে প্রচারনায় অংশ নিয়েছেন। ফলে ১৮৪২ সালে ল্যাংকশায়ার, ইয়র্কশায়ার, স্টেফোর্ডশায়ার, পার্থ এবং স্কটল্যান্ড জেলার ওয়েলসের কয়লা খনিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সত্যিকার আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, কেন না সেই সময়ে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ওয়েনের প্রভাবে চার্টিস্টবাদের দিকে ঝুকে পড়ে, কারন তাঁদের মধ্যে সত্যিকার অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞান ছিলো না। তাঁরা আমূল পরিবর্তনের পরিবর্তে সংস্কারের দিকে বেশী মননিবেশ করে। ১৮৪৮-৪৯ সালের অস্থির বিপ্লব চার্টিস্ট আন্দোলনে রূপ নেয়। এবং মাঠ পর্যায়ে ইউনিয়নিজম ইংলিশ শ্রমিক আন্দোলনের কবলে চলে যায়, ছিলো সত্যিকে মুক্তিপরায়নতার বিপরীত ধারা।

ফ্রান্সে সমাজবাদিদের সাথে শ্রমিক আন্দোলনের একটা জোটবদ্বতা ছিলো, তাঁদের একটা লক্ষ্য স্থির ছিলো যে অবশ্যই পুঁজিবাদকে বিতাড়িত করতে হবে, গড়ে তুলতে হবে একটি নয়া সমাজ ব্যবস্থা। শ্রমিকশ্রেনী ও বুর্জোয়াদের মধ্যে একটি প্রচণ্ড বিরুধ বিদ্যমান, তাই তাঁরা চাইছিল একটি বিপ্লবের মাধ্যমের এর ফয়সালা করতে। বিপ্লবের পূর্বে তথাকথিত কম্পাগঞ্জোনাগেজ এর প্রচারনায় ঐক্যবদ্ব হয়, যাদের সম্পর্কে পনর শত শতকের দিকে কিছু তথ্য জানা যায়। এটা ছিলো অনেকটা দিনমজুর ও কুটির শিল্পীদের একটি সংস্থা বা সমিতি। তাঁরা সেই সমিতি গড়ে তুলেন নিজেদের দাবী দাওয়া আদায় ও সমসাময়িক সমস্যা সমূহের চাহিদা পুরনের জন্য, তাঁরা হরতাল ধর্মঘট করত তাৎক্ষনিক আর্থিক ইস্যুতে। জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ, বড় শিল্পের বিকাশের জন্য তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিলো না, অনেক ক্ষেত্রে সেই সময়ে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক গুরুত্ব কমে যাচ্ছিলো। তখন নয়া ধরনের প্রলেতারিয়েতের উত্থান পর্ব চলছিলো ফ্রান্সে।
১৭৯০ সালের, ২১শে আগস্টে পাশ করা আইন জন সাধারন প্রচলিত আইনের মত করেই মেনে নিয়েছিলো, সেই আইনের আওতায় শ্রমিক শ্রেনীর মানুষেরা ও নিয়োগ কর্তাদের নিকট থেকে নিজেদের স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন বলে মনে করতেন। তবে সেই সময়ে অনেক স্থানীয় ধর্মঘট হয়, বিশেষ করে বিল্ডিং শিল্পের মধ্যে। নিয়োগ কর্তাগন অনেক ক্ষেত্রে চিন্তিত হয়ে পড়েন, চারিদিকে তখন শ্রমিক সংগঠন গড়ে উঠে, কেবল প্যারিসেই ৮০,০০০ শ্রমিক সদস্য সমিতি ভুক্ত হন।

সরকার একটি পরিপত্রের মাধ্যমে নিয়োগ কর্তাদের নিপীড়ন মূলক কাজের নিন্দা করে, নিয়োগ কৃত শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে, এবং নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকদের মধ্য মুক্ত স্বাধীন চুক্তি করার পরামর্শ প্রদান করে। সরকার অত্যন্ত সদয়ভাবে পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, এবং শ্রমিকদের জন্য কর্মের একটি সন্দর পরিবেশ বজায় রাখার আহবান জানায়, যেকোন ধরনের ক্ষতিকর কর্মকে নিষিদ্ব করে দেয়, কারন সরকারের দৃষ্টি এই ধরনে অবস্থা চলতে দেয়ার অর্থ হলো একটি সরকারের ভেতর আরো একটি সরকাকে চলতে দেয়া। ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত এই ধরনের সরকারী আদেশ চালু ছিলো। সেই সময় অনুভূত হচ্ছিলো যে পরিস্থিতি যেন আইনের চেয়ে ও অধিকতর শক্তি শালী। ইংরেজ শ্রমিকদের মত ফ্রান্সের শ্রমিকদের মাঝে ও গোপন সংগঠন গড়ে উঠে, কেননা তখন প্রচলিত আইন শ্রমিকদের দাবী দাওয়া সমূহ প্রকাশ্যে আমলে নেবার মত অবস্থা ছিলো না। বরং প্রকাশ্যেই শ্রমিকদের দাবীকে অবজ্ঞা করে অস্বীকার করত।

তথাকথিত মিউচুয়ালিটি ছিলো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক মিউচুয়ালিটি, যা প্রায়স প্রকাশ্য কাজ করে যেত, এটা সামাজিক ভাবে একটি আইনী বাতাবরন প্রদান করত, এবং গোপন শ্রমিকদের প্রতিরোধ সংগঠন সমূহের বৈধতা দান করত। এটা সত্য যে তাঁরা ছিলো, নানা ভাবে মামলা মোকদ্দমা মোকাবিলা করত, এবং বিভিন্ন ভাবে ত্যাগ ও স্বীকার করতে হত, তবে কোন আইনই তাদেরকে নির্মূল করে দেবার মত শক্তি ছিলো না। তাঁদের প্রতিরোধ অব্যাহত ছিলো। লুই ফিলিফের অধীনে শ্রমিকদের আইন আরো শক্ত ও কঠিন হয়ে উঠে, কিন্তু প্রতিরোধ সংঠনের কার্যক্রম থামে নাই বরং দিনে দিনে বাড়তেই থাকে, এমনকি গোপনে বড় ধরনের ধর্মঘট পালনের মত কার্যক্রম ব্যাপক ভেবে এগিয়ে চলছিলো। লিয়নসের যুদ্বের মত একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনা ১৮৩১ সালে ইউরূপে ব্যাপক নাড়া দেয়। শ্রমজীবী শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা নিয়োগ কর্তাদের নিপীড়ন থেকে বেপরোয়া ভাবে বেড়িয়ে আসে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর লোকেরা বাঁধা প্রদান করলে ও সেই দ্রুহকে থামানো যায়নি। শ্রমিকগন সাহসের সাথে অত্যন্ত দৃড়ভাবে নিজেদের ব্যানার বহন করে দ্রুত এগিয়ে যায়, তাতে লিখা হয়ঃ “লড়াই করে মর বা কাজ করে বাঁচ!”

ত্রিশের দশকের প্রথম দিকে বেশ কিছু শ্রমিক সংগঠন সমাজবাদি ধারনার সাথে পরিচিত হয়, ১৮৪৮ সালে ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পর ফ্রান্সের শ্রমিক সমিতি সমবায় আন্দোলনের সাথে ট্রেড ইউনিয়ন ও সামাজিক পুর্গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। এস ইংল্যান্ডার আন্দোলনের ইতিহাসে এই সমিতির আন্দোলনকে দুইহাজার নামে অবিহিত করে। তবে, লুই বোনাপার্টের অভ্যুত্থান অনেক ভালো কাজ বাঁধগ্রস্থ করার মত এই আশা আকাংখাকে ও মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি গঠনের পর থেকে গঠন মূলক ও বিপ্লবী সমাজবাদের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, এবং সেই চেতনা দুনিয়ার সকল স্থানে ছড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা জোরদার হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেই আন্দোলনের প্রভাব শ্রমিকদের বুদ্বিবৃত্তিক বিকাশকে শক্তিশালী করে, যার চম্বুক শক্তি এখনো ল্যাতিন আমেরিকায় বিদ্যমান আছে, ১৮৬৪ সালে সেই আন্দোলনের দানা বেঁধে ছিলো ইংরেজ ও ফরাসী শ্রমিকদের যৌথ প্রচেস্টায়। আর সেটাই ছিলো আন্তর্জাতিক শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ব করা প্রথম উদ্যোগ, যা শ্রমিক শ্রেনীর মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে প্রসস্ত করে দেয়। এটাই ছিলো বুর্জোয়া সংগঠন ও পার্টির বাহিরে শ্রমজীবী মানুষের নিজস্ব মুক্তির প্রচেষ্টা, কারখানার কাঁচা মাল ও যন্ত্র হিসাবে যে শ্রমিককে ব্যবহার করা হত যা ছিলো তাঁদের জন্য দাসত্বের বড় কারন, সেই সময়ে বুদ্বিজীবীদের অধপতন হয়, ও রাজনৈতিক নিপীড়নের তিব্রতা বৃদ্বি পায়। সেই কারনেই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির কথা রাজনীতিতে প্রধান হয়ে উঠে।

যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় বস্তুকে কেন্দ্র করে ইউরূপের নানা ধরনের সামাজিক আন্দোলন সংগ্রাম গুলোকে একত্রিত করতে উদ্যোগ নেয়া হলো, বিপুল সংখ্যক শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ব করতে সংগঠনের কাঠামো ফেডারেটিভ আকারে তৈরী করা হয়, প্রতিটি দল ও গ্রুপের স্ব স্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও আলাদা আলাদা নীতির চর্চা ছিলো কিন্তু সকলকে একত্রিত করার জন্য কিছু সাধারন নীতি প্রনয়ন করা হয়। স্ব স্ব দেশের অঞ্চলের ধ্যান ধারনার সাথে সংগতি রেখে কার্যক্রম গ্রহনের প্রতি গুরুত্বারূপ করা হয়। আন্তর্জাতিক কোন একটি নির্দিস্ট সংজ্ঞার আওতায় দাড়ায়নি; বরং এটা এমন একটি আন্দোলনে পরিণত হয় যা কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয় এটা একটি ব্যবহারিক বিষয় হিসাবে মানুষের দৈনিন্দিন জীবনের সাথে একাকার হয়ে যায়। এই আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। এটার কাজ ছিলো দুনিয়ার সকল শ্রমিকদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী করার ব্যবস্থা করা, তাদেরকে পরস্পরের মধ্যে বুঝাপড়া ও একেই পথে হাটার জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয়া হয়, কেননা এটাই যে শ্রম জীবী কর্মজীবী মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ। সারা দুনিয়ার শ্রমজীবীরা তো একেই ব্যবস্থার শিকার। এই পরিস্থতে তাঁদের মধ্য ঐক্য সংহতি জোরদার করে দেশীয় সিমান্ত অতিক্রম করে নিজেদের ঐক্য গড়ার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য কাজ করা হয়, এর পিছনে কোন জাতীয় স্বার্থ কাজ করবে না, তবে তা তাঁদের শ্রেনীর জন্য বিশাল ভূমিকা রাখবে।

শিল্প লড়াইয়ের জন্য শ্রমিকদের ঐক্য ও সংহতি জোরদার করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শ্রমিক শ্রেনীকে প্রতিবাদি করে আমদানী রপ্তানীর ক্ষেত্রে ধর্মঘট ও হরতাল পালনের মত কার্যক্রম গ্রহন করে সরকার ও শিল্প মালিকদেরকে চাপে ফেলতেই হবে, এই প্রক্রিয়া সকল লভিস্ট ও দালাল চক্রকে হার মানাতে সহায়তা করবে। শ্রমিকদেরকে সামাজিক দর্শনের প্রায়োগিক দিক গুলো শিক্ষা দিতে হবে। এটা সত্য যে, আন্তর্জাতিক পরিসরে ধর্মঘট পালন করা একটি বিরাট শক্তিশালী ও শানিত অস্ত্র। একটি দাঁড়ালো তলোয়ার যা শ্রমিক দুষমন দমনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটা জাতীয় সহানুভূতি বৃদ্বি, একাত্মত্বতা প্রাকাশ ও ঐক্য দিনে দিনে বৃদ্বি করবে।

এই আন্তর্জাতিক মহান উদ্যোগ সমূহ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সমূহের সাথে একাত্ম হয়, পরে তা পুঁজিবাদের মুখোমুখি হয় এবং দুনিয়ার নানা দেশের শ্রমজীবী মানুষের সাথে নিজেরকে সম্পৃক্ত করে রাখে। প্রথম দুটি আন্তর্জাতিক, ১৮৬৬ সালে জেনেভায়, এবং ১৮৬৭ সালে লাউসানে অনুষ্ঠিত হয়, সেই সম্মেলন গুলোতে সংযমী মনোভাব প্রকাশ করা হয়। সেই গুলো ছিলো তাঁদের আন্দোলনের সম্ভাব্য কাজের সূত্রপাত যা পরবর্তীতে বিস্তারিত ভাবে প্রকাশ পায়। তবে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ সমূহে বিশাল আকারে ঘর্মঘট পালন শ্রমজিবী মানুষের শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে, শ্রমিকদের বিপ্লবী মনোভাব গড়ে উঠে। সেই সময়ে সকল স্তরে একটি বিরাট পরিবর্তন ও লক্ষ্য করা যায় তা হলো মানুষের মাঝে গনতান্ত্রিক ভাব ধারার সঞ্চালন হতে থাকে। তবে ১৮৪৮-৮৯ সালের বিপ্লবে বিপর্যয় সামগ্রীক ভাবে একটি রাশ টেনে ধরে, কিন্তু তা একেবারে থেমে যায়নি।

ব্রাসেসের সম্মেলনে, ১৮৬৮ সালে সম্পূর্ন এক ভিন্ন ধারার পূর্বসূরীদের চেতনার আলোকে নিজেদের অভিপ্রকাশ ঘটায়। সেই সময়ে এমন একটি কথা সর্বত্রই চালু হয় যে, শ্রমজীবী মানুষ জেগে উঠেছে, তাঁরা এখন অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশী প্রাণবন্ত। এই সম্মেলন বিপুল সংখ্যা গরিস্ট ও স্পষ্ট ভাবে ঘোষনা করে জমির যৌথকরন, এবং অন্যান্য উৎপাদন পন্থার একত্রি করনের উপর। তাঁরা সকল দেশের বিভাগ সমূহের উপর এই মর্মে আহবান জানান যে, স্ব স্ব দেশে এই সর্বাত্ম কাজ অব্যাহত রেখে আগামী সম্মেলনে আরো অধিকতর স্পস্ট ঘোষনা প্রদান করা হবে। সেই আন্তর্জাতিক ছিলো সত্যিকার ভাবেই একটি মুক্তিপরায়ন সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট মণ্ডিত। সেই মুক্তিপরায়ন চিন্তাধারা ও বক্তব্য লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একটি প্রস্তাবনা তৈরী করা হয়েছিলো যুদ্বের বিরুধিতা করার জন্য। সরকার গুলোকে সাধারন ধর্মঘটের চাপে ফেলে মানুষ খুন, হত্যা, লুন্ঠন থেকে বিরত রাখার জন্য। কেন না কেবল শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরাই হলো সমাজের সব থেকে সক্রিয় অংশ যারা সকল প্রকার গন হত্যা রোধ করতে পারে। সেই আন্তর্জাতিক তার দির্ঘ গবেষণা ও পরিক্ষা নিরিক্ষা থেকে সেই কথা ঘোষণা করেছিলো।

১৮৬৯ সালের ব্রাসেলসের কংগ্রেসে শ্রমিকদের জোট সমূহকে ঐক্যবদ্ব করার বিষয়ে প্রায় সকলেই চূড়ান্ত সিদ্বান্তে উপনিত হতে যাচ্ছিল। কংগ্রেসের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছিলো যে, শ্রমিক শ্রেনী প্রচলিত ব্যবস্থায় নানা প্রকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যায় আক্রান্ত। ব্রাসেলসের এই কংগ্রেসে কিছু সংশোধনী আনা হয় যে, যৌথ মালিকানা ও উৎপাদন পন্থার উপর নিয়ন্ত্রন কায়েমের বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা হয়। এমন কি শ্রমিকদের সংগঠন স্বেচ্ছায় ত্যাগের প্রশ্নটি ও বিবেচনায় রাখা হয়। ব্রাসেলস কংগ্রেসে এই সকল বিষয়ে খুবই আকর্ষনীয় বিতর্ক হয়, সব শেষে সকলেই ইতিবাচক সিদ্বান্তে উপনিত হতে সক্ষম হয়। তবে এই প্রসঙ্গে শ্রমিক শ্রেনীর সংগঠনের গুরত্বের কথা স্পষ্ট করে দেয়া হয়। ইউজিন হিন্স কংগ্রেসে বেলজিয়ামের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, উপর্যুক্ত বিষয়ে নয়া ধারনা উপর আলোকপাত করা হয়, ত্রিশের দশকে ওয়েন ইংল্যান্ডের আন্দোলনের কিছু চিত্র ও তুলে ধরেন।

একটি বিষয় সকলেরই মনে রাখা দরকার যে, রাস্ট্রবাদি সমাজতন্ত্রে শ্রমিক সংগঠনের কোন প্রকার গুরুত্ব দেয় নাই। তাঁরা এদেরকে নিজেদের অনুগত সংস্থা বানিয়ে রেখেছে। ফ্রান্সের ব্লেঙ্কাইস্টস ট্রেড ইউনিয়নের লোকেরা কেবল সংস্কার আন্দোলনের জন্য কাজ করত, অন্য কিছু করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না, তাঁরা চাইত কেবল সমাতান্ত্রিক একানায়কতন্ত্র। ফার্দিন্যান্দ লাসাল চাইতেন শ্রমিক শ্রেনীর সকল প্রকার কার্যক্রম একটি পার্টির আওতায় এনে পরিচালনা করতে, তিনি ট্রেড ইউনিয়নের সম্পূর্ন বিরুধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ট্রেড ইউনিয়ন একটি শ্রমিক শ্রেনীর রাজনৈতিক দলের জন্য অন্তরায় হতে পারে। মার্কস ও তার সময়ের সব চেয়ে জার্মানীর ঘনিস্টতম এই বন্দ্বু মনে করতেন, পুঁজিবাদী সমাজের সাথে সাথে এই ট্রেড ইউনিয়ন গুলো ও হারিয়ে যাবে।তাদের ধারনা ছিলো সমাজতান্ত্রিক সমাজে এই ধরনের সংগঠনের দরকারই পড়বে না। তাঁদের ধারনা ছিলো, প্রলেতারিয়ান একনাকত্ব কায়েম হলে এরাই সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবেন।

এই ধারনা সমূহ বাসেলে বিশেষ ভাবে পরিক্ষা নিরিক্ষা করার জন্য গৃহিত হয়। ইউজিন হিন্স বেলজিয়াম প্রতিবেদনে এই বিষয় গুলো কংগ্রেসের সামনে উপস্থাপন করে, স্পেনের প্রতিনিধিগন এইসকল বিষয়ে বিশেষ ভাবে আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন। সুইজারল্যান্ডের ও ফ্রান্সের ফেডারেশন সমূহ এই মর্মে বক্তব্য রাখেন যে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ কেবল তাৎক্ষনিক বিষয় নয় আগামী বিশ্বের জন্য সয়াজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মানের মত গুরুত্বপূর্ন কাজ সমূহ করার জন্য নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে। তাঁরা কেবল দেশীয় বিষয় নয় আন্তর্জাতিক বিষয়ে ও শিক্ষা গ্রহন করে ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত নিবেন। এই কথা গুলোর প্রেক্ষিতে কংগ্রেস নয়া কার্যবিবরনী প্রনয়ন করে: “কংগ্রেস এই মর্মে ঘোষনা করে যে সকল শ্রমিকদের উচিৎ তাঁদের স্ব স্ব কর্ম ক্ষেত্রে সংগঠন গড়ে তুলে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্ব স্ব কর্ম ক্ষেত্রে ইউনিয়ন গড়ে তুলে জাতীয় পর্যায়ের ইউনিয়নকে অবহিত করা। যাতে ইউনিয়ন সমূহের মধ্যে একটি কার্যকরী জোট গড়ে উঠে। এই জোট সকল কল কারাখানা সম্পর্কিত পন্য দ্রব্য সংগ্রহ করবে, সকলের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিবে, করনীয় কি কি তা বাৎলে দিবে, এবং সামগ্রীকভাবে শ্রমিকদের জন্য উপযুক্ত মজুরীর আন্দোলন করে, প্রচলিত মজুরী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি ফেডারেশনের আওতায় মুক্ত পরিবেশ তৈরী করবে। কংগ্রেস সকল দেশের সকল সাধারন কাউন্সিলকে এই আহবান জানায়।”

কংগ্রেসের এই ঘোষনা পত্রে হিনস বিষয় গুলো ব্যাখ্যা করেন এই ভাবে যে, “স্থানীয় কর্মীগন দুটি সংগঠনের জন্য কাজ করবেন, একটি হলো নিজেদের সংগঠনের অন্যটি হলো জোটের জন্য কাজ। প্রতিটি কারখানায় ও এলাকায় এই রকমেই কারযক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। অন্য দিকে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারাই প্রতিনিধিত্ব করবেন। শিল্প ও বানিজ্যের কাউন্সিল সমূহ সরকারের স্থান দখল করবে, যা আগের সকল পুরতান ব্যবস্থার সাথে চিরদিনের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন করবে।”

এই নতুন ধারনার একটি ফলপ্রসু স্বীকৃতি এসেছে, নয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, এটা কেবল রাজনৈতিক মতামত ব্যাক্ত করতে পারছে। তাই, সমাজবাদ একটি বিশেষ রাজনৈতিক নয়া প্রকাশ ভঙ্গী ও বটে। এটার মধ্য আছে এক ধরনের প্রাণবন্ত ব্যবস্থা, তাঁরা মনে করেন শ্রমিকদের কাউন্সিল হলো একটি কার্যকরি ব্যবস্থা যা শ্রমিক শ্রেনীর আশা আকাঙ্ক্ষাকে ধারন করে। ল্যাটিন আমেরিকার শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা আরো আগে থেকেই তাঁদের নিজস্ব অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রামকে জোরদার করার এবং সমাজবাদি প্রচার চালাবার জন্য, এবং বেসেলের ঘোষণার আলোকে কাজ করার জন্য আন্তর্জাতিকের সমর্থন পেয়ে আসছে।

তাঁরা রাষ্ট্র, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং মালিক পক্ষের নিকট থেকে স্বীকৃতি পেয়ে আসছিলেন, তাঁদের কার্যক্রমের লক্ষ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল কারা ছিলো না, তবে তাদের লক্ষ্য ছিলো রাষ্ট্রের বিলয় ও রাজনৈতিক শক্তির বিতারন করা। আর সেই লক্ষ্যে প্রাথমিক ভাবে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ও শোষণের বিরুদ্বে কথা বলছিলো। তাঁরা সেই সময়ে কেবল বুর্জোয়াদেরকে আক্রমনের লক্ষ্যে পরিণত করেন নাই, এমন কি কোন রাজনৈতিক দল ও সৃষ্টি করে নাই। তাঁরা সেই তথাকথিত পেশাদারী রাজনৈতিক ব্যাক্তি সৃষ্টি করেন নাই যাদের কেবল লক্ষ্য ই হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা।

তাঁরা বুঝতে পেরে ছিলেন যে, একক ক্ষমতা দখল, একক ভাবে সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রন নয়া সমাজ ব্যবস্থাকে বিনাশ করে ফেলতে পারে। সেই প্রক্রিয়া সমাজে মানুষের উপর মানুষের প্রভূত্ব কায়েম করে দিতে পারে। তাঁরা তাই একটি চমৎকার প্রশাসনিক ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেন। এই জন্যই শ্রমিক শ্রেনী রাষ্ট্র ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিরুধিতা করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন সামাজিক সংগঠন গুলো হবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক একটি ইউনিট, যা নানা শিল্প কারখানায় ও কৃষি বিভাগে বিস্তৃত হবে ক্রমশঃ এই ধারনা থেকেই তৈরী হয় শ্রমিক কাউন্সিলের।

এই ধরনের চিন্তা চেতনা রাশিয়ান বিপ্লবের সময় ব্যাপক ভূমিকা রাখে, এই চিন্তাধারা শ্রমিক ও কৃষকদের মাঝে বেশ শক্তিশালী ছিলো, কিন্তু প্রথম আন্তর্জাতিকের একটি সেকশন হিসাবে রাশিয়া এই চিন্তার পরিস্কার লালন কারী ছিলো না। বরং উপেক্ষাই করেছে। রাশিয়ায় জারের অধীনে শ্রমিক শ্রেনীর বুদ্বিজিবিদের মধ্যে ও এই চিন্তার অভাব ছিলো। কিন্তু বলশেভিকবাদ এই ফলদায়ক ধারনাটির মৃত্যু ঘটায়। একনায়কতন্ত্রের ধারনা শ্রমিক কাউন্সিল ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলে, এবং পন্য পয়দাকারী লোকদের দ্বারা একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মানের পথ রুদ্ব করে দেয় কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা। দুটি শক্তির মানুষে একত্রিত করে দেবার জন্য তাঁদের মধ্যে মারাতক্মক আমলাতন্ত্র ঝেঁকে বসে। যারা পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাশিয়ান বিপ্লবের বারটা বাজিয়ে দেয়।

শ্রমিক কাউন্সিল ব্যবস্থা একনায়কতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেয় না। এটা এক ভিন্ন ধরনের পরিচালন ব্যবস্থা। যার নির্দেশনা আসে একেবারে সমাজের তলা থেকে। সৃজনশীল শ্রমজীবী মানুষের ভেতরে এর উৎস মূল। অন্য দিকে একনায়কতন্ত্রের মধ্যে সৃজনশীলতা নেই, এটা এক ধরনের মরুভূমি। সেখানে প্রান নেই। চিন্তায় নেই কোন বৈচিত্রতা। সকলেই সেখানে উচ্চতর পদাধিকারীদের মনোরঞ্জনে ব্যাস্ত থাকেন। আর এটাই সেখানে নিয়ম। সেখানে দুইটি ধারার কোন জায়গা নেই। ভিন্ন চিন্তার জন্য খড়গ ঝুলতে থাকে। রাশিয়ায় একনায়কত্ব বিজয়ী হয়েছিলো। প্রমানিত হয়েছে – একনায়কত্ব একটি প্রানহীণ মতবাদ। এটা মরে যায়। পচে যায়। সেখানে সৌভিয়েত তুলে দেয়া হয়। তাঁরা যে নামেই ডাকুক নাকেন সকল কিছুই তার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে ফেলে। রূপ নেয় ভিন্ন এক দানবে।

কাউন্সিল পদ্বতীটি শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা ব্যাপক ভাবে গ্রহন করেছিলো, অর্থনৈতিক ভাবে সমাজবাদি সমাজ নির্মানের জন্য এটা ছিলো তাঁদের জন্য উপযুক্ত একটি পদ্বতী। একটি ফলদায়ক উন্নয়ন ব্যবস্থা হিসাবে সমাজবাদি ব্যবস্থায় ও শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এর উৎপত্তি হয়েছে। এই ব্যবস্থাটি একটি দক্ষ লোকের জন্য অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছে বুর্জোয়া সমাজ থেকে। ঐতিহ্য গত দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ফ্রান্সের জেকবিনবাদিরা বাবুভিস্ট সম্প্রাদায়ের লোকদের নিকট থেকে এটা ধার নিয়েছিলো, পরে এই ধারনাটি মার্ক্স ও তার অনুসারীগন অনুকরন করতে থাকেন। শ্রমিক কাউন্সিলের ধারনাটি সমাজবাদি ধারনার সাথে নিবির ভাবে জড়িত; একনায়কতন্ত্র সমাজবাদের সাথে কোন ভাবেই সংগতিপূর্ন নয় বরং এটা পুঁজিবাদী রাস্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথেই বেশী সামঞ্জস্যশীল।

একনায়কতান্ত্রিকতা হলো একটি স্পষ্ট রাস্ট্রবাদি ধারনাঃ রাষ্ট্র জিনিসটি ই হলো দখল করার মত একটি বিষয়। রাষ্ট্র ধারনার যারাই প্রবর্তক তারাই বলতে চেয়েছেন, একনায়কতান্ত্রিকতার মত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় চলে আসতে পারে, তাই তাঁরা সকল সময় ই জনগণ ক্ষমতার উৎস, জনগণ ক্ষমতার মালিক, জনগণের ইচ্ছাই হবে আইন এমন অনেক কথাই তাঁরা বলেছেন। কিন্তু একনায়কতন্ত্রের ধারনাই বার বার ফিরে এসেছে রাস্ট্রীয় ব্যবস্থায়, এটা স্বাভাবিক সামাজিক পরিবর্তনে বাঁধা দিয়েছে, মানুষের নিজস্ব চিন্তার জগতে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে, ফলে কোন কোন সময়ে দরকার হয়ে পড়েছে সহিংস বিপ্লবের। একনায়কতন্ত্র সত্যিকার সামাজিক বিপ্লবের প্রধান বাঁধা, এটা নিচের মানুষের কথার কোন গুরুত্ব দেয় না, শ্রমজিবী মানুষের জন্য তাঁদের কোন অনুভূতি নেই, এঁরা একটি ক্ষুদ্র জনগৌস্টির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে থাকে।

এই মতবাদের অনুসারীরা যদি ভালো লক্ষ্য নিয়ে ও তা কায়েম করেন, তবু এঁরা তাঁদের বিরুধী যুক্তি বা বক্তব্য শ্রবণে ইতিবাচক হয় না। বরং এঁরা বিরুধীদের বিরুদ্বে চরম পন্থার আশ্রয় নিয়ে থাকে। রাশিয়ায় এই কথার উদাহরন দেখা যাবে অগণিত। এর পর ও অন্দ্বমতবাদের অনুসারী কিছু লোক বলেন, সর্বহারাদের একনায়কত্ব কোন ব্যাক্তির একনায়কত্ব নয় এটা হলো একটি শ্রেনীর একনায়কত্ব, এই প্রক্রিয়ার সাথে আমরা নিজেরাই যুক্ত আছি। গঠন মূলক সমালোকনাকে আমরা মূল্য দিয়ে থাকি। আসলে এই ধরনের কথা হলো সহজ মানুষকে বোকা বানানোর আধুনিক কৌশল মাত্র। আসলে শ্রেনী ভিত্তিক একনায়কত্বের ধারনাটি একেবারেই একটি অবাস্তব কথা, তাঁরা আসলে কায়েম করে একটি বিশেষ দলের একনাকত্ব, আর সেই পার্টি চলে শ্রেনীর নাম করে, যেমন বুর্জোয়ারা জনগণের নামে নিজেদের একনাকত্বকে জায়েজ করে নেয়। বাস্তবে এদের মধ্যে কোন ফারাক নেই।

শ্রমিক শ্রেনীর এই কাউন্সিলের ধারনাটির লক্ষ্যই ছিলো রাষ্ট্র ভিত্তিক ধারনার মূলচ্ছেদ করা; তাই সর্বাত্মক সংগ্রাম আর লড়াই হলো সকল প্রকার একনায়কত্বের অবসান ঘটিয়ে তাঁদের ক্ষমতার আঁধার রাষ্ট্রের বিলয় সাধন করা। এই ধরনার মৌল উৎস হলো প্রথম আন্তর্জাতিক, সেখানে বলা হয়েছিলো অর্থনৈতিক সাম্য কায়েম করতে চাইলে অবশ্যই রাজনৈতি সাম্য চাই। তাই তাঁরা সেখানে প্রস্তাব করেছিলেন, সকল প্রকার রাজনৈতিক প্রতিস্টানাদির বিলুপ্তি সাধনের আহবান করেছিলেন। সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে এই কর্ম সম্পাদন করতে না পারলে শোষণ নিপীড়ন বন্দ্ব করা যাবে না। তাঁরা গভীর ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সকল শ্রেনীর শ্রমিক একেই পতাকাতলে সমবেত হবেন, এবং মালিক পক্ষ, রাষ্ট্র, ও রাজনৈতিক নিপিড়নের অবসান ঘটিয়ে নয়া সামাজিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করবেন। এই ঘোষণা এসেছিলো স্বাধীন শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক বিভাগ থেকে। মাইকেল বাকুনিন তার নিম্নের বক্তব্যে বিষয় তুলে ধরেন এই ভাবে:

“প্রতিটি সংগঠন আন্তর্জাতিকের আদর্শকে নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে স্বাক্ষর দেয়, নয়া রাষ্ট্র বা কোন স্বৈরশাসক প্রতিস্টা করা নয়, বরং প্রতিটি সার্বভৌম শক্তির বিলয় সাধন করে, একটি ভিন্ন ধারার সংস্থা বা সংগঠন কায়েম করবে, যা অবশ্যই হবে রাষ্ট্রের বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। তা কর্তৃত্বপরায়ন হবে না, কৃর্তৃত্বপরায়ন হবে না, কৃত্রিম বা সহিংস হবে না, উপর থেকে চেপে বসা বা প্রাকৃতিক উন্নয়ন ও মানব স্বার্থ বিরোধী হবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হবে উন্মূক্ত ও মানুষের প্রতি হবে মর্যাদাপূর্ন এবং সম্মানজনক। কিন্তু জনগনের জন্য সত্যিকার ভাবে কেমন একটি সংগঠন হতে পারে? এটা হতে পারে মানুষের দৈনিন্দিন পেশাগত কাজের সাথে সংগতি রেখে, যিনি যেমন কর্মের সাথে জড়িত এমন পেশা ভিত্তিক সংগঠন। যখন সকল শিল্প ও বানিজ্য প্রতিস্টান, এমন কি সকল কৃষি ক্ষেত্রে কর্মরত প্রতিনিধি ও তার সংগঠন আন্তর্জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করবেন, এটা হবে সাধারন মানুষের সংগঠন বা সকলের মিলন ক্ষেত্র।”

এই ধরনের চিন্তা ধারা এর বিপরিতে ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে, যেমন বুর্জোয়াদের পার্লিয়াম্যান্ট, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী সমিতি যা বেলজিয়ামে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। সেই শ্রমিক চেম্বার তাঁদের বিভিন্ন কল কারখানায় শিল্প ও বানিজ্য সংস্থায় গড়ে তুলা হয়েছে, তাঁরা ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন ও পেশাগত দিকের উপর গুরুত্বারোপ করেছে, সাম্যবাদি কিছু রীতিনীতি অনুসরনের কথা বলছেন, তাঁরা ও উৎপাদন পদ্বতীর উপর নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েমের কথা বলছেন। তাঁরা এই চেতনার আলোকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা প্রকার প্রশিক্ষন প্রদান করছেন। এই সংস্থা সমূহ বুর্জোয়া পার্লাম্যেন্টের নানা কর্মকান্ড নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যাক্ত করতে শুরু করে। তাঁরা ও বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা ও তাঁদের নানা বিধি বিধানের সমালোচনা করে শ্রমিক শ্রেনীর দৃস্টিভঙ্গী তুলে ধরে বক্তব্য প্রদান করেন। ম্যাক্স ন্যাটালো তার গ্রন্থে জনগণের সামনে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তার গ্রন্থের মধ্যে ছিলো ডার এনার্কিসজম ভন প্রুদোয়ান জো ক্রোপথকিন এবং বাকুনিনের পান্ডোলিপি থেকে বিশেষ ভাবে ভাষ্য তুলে ধরনেঃ

“ সমাজ বিজ্ঞানের সকল গুরুত্বপূর্ন প্রায়োগিক অধ্যয়ন ও গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ ইতিমধ্যে শ্রমিক স্বার্থে লড়াই সংগ্রামে যুক্ত হয়েছেন। সেটা কেবল তত্ত্বগত দিকে নয় তা প্রায়োগিক ভাবে ও বিস্তৃত হয়েছে। তাঁরা শ্রমজীবী মানুষের সত্যিকার স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য কয়েকটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে। তার মধ্যে, পুঁজি ও কাঁচা মাল এবং এর মধ্য গুরুত্ব পূর্ন উপাদান হলো শ্রমিকের শ্রমী সবের মধ্য অধিক গুরুত্বপূর্ন হলো- শ্রমিকগনের কায়িক শ্রম ও ভূমি উল্লেখযোগ্য। ট্রেড ইউনিয়নের সকল সংগঠন ও ফেডারেশন সমূহ ও তাঁদের শ্রমিক চেম্বারের প্রতিনিধিগন কেবল একাডেমিক কার্যক্রমই গ্রহন করেন নাই তাঁরা তাঁদের তত্ত্ব ও প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তাঁদের সামগ্রীক কার্যক্রমে। তাঁদের অর্থনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন তাঁদের মাঝে বিপ্লবের বীজ বপন করেছে, নয়া দুইয়া গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। এঁরা বুর্জোয়া বিশ্বের জায়গায় একটি শ্রমিক বিশ্ব গড়ে তুলার শপথে এগিয়ে যাচ্ছেন।”

এই ধারনাগুলি সাধারণভাবে বেলজিয়াম, হল্যান্ড, সুইস জুরা, ফ্রান্স ও স্পেনের আন্তর্জাতিক বিভাগগুলিতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং শ্রমিকদের জোটের গড়ে তুলা সমাজবাদকে একটি অদ্ভুত সামাজিক চরিত্র প্রদান করে, যা রাজনৈতিক শ্রমজীবনের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইউরোপে দলগুলিতে প্রায় পুরোপুরি ভুলে যাওয়ার উপক্রম ছিল, এবং শুধুমাত্র স্পেনেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জয়ী হওয়ার জন্য তার শক্তি নিঃশেষ করা যায়নি, আর সেটাই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে এই দেশে পরিষ্কারভাবে দেখানো হয়েছে। তারা জেমস গুইলোওম, আর্মার স্কুইৎসজিয়াল, ইউজিন ওয়ারলিন, লুই পিনডি, সিয়ার দে পায়েপ, ইউজিন হিইন, হেক্টর ডেনিস, গুইলেমো ডি জিইফ, ভিক্টর আর্নল্ড, আর। ফার্গা পেলিকার, জি। সেন্টিজন, এনেসেলো লোরেঞ্জো মত পুরুষদের সক্রিয় সক্রিয় সমর্থন সেখানে পাওয়া যায়। এখানে এঁরা ব্যাপক পরিচিত নাম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এঁরা শ্রেষ্ঠ চমৎকার সব মানুষ হিসাবে এবং উন্নত মানের সমগ্র বুদ্ধিজীবী বিকাশে এই উদারবাদী উপাদানগুলির উত্সাহের সাথে যুক্ত হয়েছিলো, এবং ইংল্যান্ডে সুইজারল্যান্ড বা বিশুদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন ভুক্ত রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক দলসমূহ থেকে কোন উদ্দীপক পাওয়া যায়নি।

তাই যতদিন আন্তর্জাতিক এই সাধারণ লাইনগুলি অনুসরণ করে, এবং স্বতন্ত্র ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের অধিকারকে সম্মান করে, তার বিধিমালা হিসাবে দেওয়া হয়, সংগঠিত শ্রমিকদের উপর এটি অসীম প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু এটি পরিবর্তিত হয়ে যায় যখন লন্ডন জেনারেল কাউন্সিলে মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের জাতীয় সংসদীয় কার্যক্রমের জন্য পৃথক জাতীয় ফেডারেশনের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। ১৮৭১ সালের অনাকাংখীত লন্ডন কনফারেন্সে এটি প্রথম ঘটেছিল। এই আচরণটি কেবল আন্দোলনের আত্মা নয় বরং আন্তর্জাতিক আইনের বিধিসমূহেরও কঠোর লঙ্ঘন ছিল। এটা হয়তো আন্তর্জাতিক মানের সব উদারবাদী উপাদানগুলির একক প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে থাকে, যাতে আরও বেশি প্রশ্ন আসে যা কংগ্রেসে আগে বিবেচনা করা হয়নি।

লন্ডন কনফারেন্সের কিছুদিন পরে জুরা ফেডারেশন সোয়ানভিয়ারের উপর ঐতিহাসিক পরিমাপ প্রকাশ করে, যা্তে লন্ডন জেনারেল কাউন্সিলের অহংকারী অনুমানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত এবং অস্পষ্ট শব্দগুলিতে প্রতিবাদ জানানো হয়। কিন্তু ১৮৭২ সালে হেগের কংগ্রেসে, যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগত এবং সবচেয়ে নিন্দনীয় পদ্ধতির কর্মকান্ডের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হয়েছিল, যা লন্ডন সম্মেলনে একটি নির্বাচনী মেশিনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল। ব্ল্যানকাইস্ট, এডউয়ার্ড ভ্যালেন্ট, এর মধ্যে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানোর জন্য জেনারেল কাউন্সিলের প্রস্তাবিত প্রস্তাবের জন্য তার যুক্তি অনুযায়ী শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক ক্ষমতার বিজয়কে ব্যাখ্যা করে যে, "খুব তাড়াতাড়ি এই প্রস্তাবটি কংগ্রেস কর্তৃক গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা ই ইন্টারন্যাশনাল দলিলের অন্তর্গত হয়েছে, প্রতিটি সদস্যকে বহিষ্কারের শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব প্রদান করা হবে। " মার্কস ও তার অনুসারীরা সরাসরি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী আন্দোলন বিকাশের পথে বাঁধা দেবার জন্য তার সমস্ত বিপজ্জনক পরিণতির দিকে এগিয়ে যান বিভক্ত হয়ে পড়েন। আন্দোলন, এবং সংসদীয় রাজনীতির সময়কালের উদ্বোধন যা প্রাকৃতিক চাহিদা যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্থিরতা ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে নৈতিক অধঃপতনের দিকে পরিচালিত করে, যা আজ আমরা বেশির ভাগ দেশে এর নজির দেখতে পাই।

হেগ কংগ্রেসের পর শীঘ্রই আন্তর্জাতিক কৃতৃত্ববাদ বিরুধী ফেডারেশনের প্রতিনিধিবৃন্দ সেন্টম এমিয়ারে সহ-কর্তৃত্ববাদী কংগ্রেসের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যা হেগ এ নিষ্ক্রিয় ও বাতিলকৃত সমস্ত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে। তারপর থেকে সরাসরি বিপ্লবী কর্মের সমর্থক এবং সংসদীয় রাজনীতির মুখপাত্রদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ক্যাম্পে বিভাজনের তারিখগুলি, যা সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে ক্রমবর্ধমান এবং আরও অযৌক্তিক হয়ে উঠে। মার্কস ও বাকুনিন সমাজতন্ত্রের মূলনীতির দুটি ভিন্ন ধারণার মধ্যে এই সংগ্রামে বিরোধিতাকারী দলগুলোর মধ্যে নিছক বিশিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু এই সংগ্রামকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি একটি বড় ভুল হবে যে, কেবল দুটি ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব; এটি দুইটি ধারার ধারণার মধ্যে বিরোধিতা ছিল যা এই সংগ্রামকে তার প্রকৃত গুরুত্ব দিয়েছে এবং আজও তা দেয়। মার্কস এবং এঙ্গেলসদের বিরোধিতা এই ধরনের একটি হিংসাত্মক এবং ব্যক্তিগত চরিত্র দিয়েছেন যা সত্যি একটি বিপর্যয় ছিল।

ইন্টারন্যাশনাল প্রতিটি দলের জন্য সুযোগ ছিল, এবং বিভিন্ন মতামত একটি ক্রমাগত আলোচনা শুধুমাত্র তাদের স্পষ্টীকরনে যাতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু একটি বিশেষ ধারার চিন্তার অবদানকারীর সমস্ত বিভাগ তৈরির প্রচেষ্টার ফলে একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের একটি সংখ্যালঘুকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, তবে একটি বিচ্যুতি হতে পারে এবং শ্রমিকদের মহান জোটের পতন হতে পারে, তবে সেই প্রতিশ্রুতিশীল জীবাণুগুলি ধ্বংস করতে পারে যা প্রত্যেক দেশের শ্রম আন্দোলনে খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে।

ফ্রাঙ্কো-প্রুশীয় যুদ্ধ, যার ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় বিন্দুটি জার্মানিতে স্থানান্তরিত হয়, যেখান কার শ্রমিকরা বিপ্লবী ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যেমন পশ্চিমের সমাজতান্ত্রিকদের অর্জিত অভিজ্ঞতা দ্বারা সমৃদ্ধ নয়, এই পতন ব্যাপকভাবে অবদান রাখে। প্যারিস কমিউনিুনের পরাজয় এবং ফ্রান্সে প্রারম্ভিক প্রতিক্রিয়া, যা কয়েক বছর স্পেন ও ইতালি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এই পটভূমিতে শ্রমের জন্য একটি কাউন্সিল পদ্ধতির ফলপ্রসূ ধারণাটির উৎপত্তি হয়ে অব্যাহত ছিল। ঐসব দেশের আন্তর্জাতিক অংশগুলি কেবল একটি গোপন অস্তিত্ব বহন করে ঠিকে ছিলেন এবং এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের সমস্ত শক্তিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য ছিলেন। ফ্রান্সে বিপ্লবী সিনডিসিলিজমের সৃজনশীল ধারণাগুলি জন জাগরণের সাথেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিস্মৃতি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, আবার সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনকে প্রাধান্য দেবার জন্য।

চতুর্থ অধ্যায়

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উদ্দেশ্য

আধুনিক এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের উৎপত্তি হয়েছে প্রথম আন্তর্জাতিকের আকাঙ্ক্ষার ভেতর থেকে, সেই সময়ে শ্রমিক শ্রেনীর জোট ও সংগঠন যে সকল বিষয়ে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন তার ধারাবাহিকতাই এই আদর্শের জন্ম দিয়েছে। ১৯২২ সালে সেই আদর্শের আলোকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ফেডারেশন গঠন করা হয়েছিলো, যা এখনো এগিয়ে চলছে। এঁদের মধ্যে স্পেনে গঠিত কনফিডেসিওন ন্যাশনাল ডি ত্রাবোজো সব চেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রভাব সৃষ্টি কারী সংগঠন হিসাবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। এই সংগঠনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিলো মুক্তিপরায়ন সমাজবাদের দিক্ষা। সিন্ডিক্যালিজমের প্রভাব এর উপর ও কোন অংশে কম ছিলো না। ১৯০০ সাল থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে এই সংগঠনের ব্যাপক উত্থান ঘটেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে এর প্রভাব ছিলো ব্যাপক। এটা সরাসরি রাজনৈতিক সমাজবাদের বিপরীতে অবস্থান নেয়, বিভিন্ন দেশে এটা শ্রম অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে। প্রথম আন্তর্জাতিকের সময়ে ও জার্মান, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে এই ধারা অবস্থান ছিল। আজ আমরা বিগত ষাট বছর ধরে পরিচালিত নানা দেশে শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজবাদের বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপের একটা মূল্যায়ন করতে পারছি।

বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেনীর অংশগ্রহণ খুব জোরালো ভাবে গ্রহন করা হয় না, কেননা তাঁরা সমাজবাদের আলোকে কথা বলেন, এই জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। এখন যদি ও সমাজবাদ অনেকাংশে বিলিয়মান। তাঁরা বিচ্ছিন্ন ভাবে কেবল প্রতিবাদ করতে পারছেন। প্রবাদ আছে, “যে লোক ধর্ম গুরুকে খেয়ে ফেলে, তাকে আপনি আর কি করতে পারেন।” এছাড়া ও আরো সত্য কথা হলো। যারা রাষ্ট্রের খায় পড়ে, তারাই আবার এটাকে ধ্বংস করে দেয়। সংসদীয় রাজনীতিতে শ্রমিক আন্দোলনের অংশগ্রহন অনেকটা বিষের মত প্রভাব ফেলছে নানা দেশে। গঠন মূলক সমাজবাদের উপর মানুষের বিশ্বাসকে তিরোহিত করে দিচ্ছে। এটা সকল শ্রমজিবী আন্দোলনের জন্য সর্বনাশ। এটা আত্মনির্ভরশীলতাকে বিনষ্ট করছে, তাঁদের মধ্যে এমন ধারনা সৃষ্টি করছে যে সকল শান্তি ও সমৃদ্বি আসে উপর থেকে।

সুতরাং পুরাতন আন্তর্জাতিকের সমাজবাদের স্থলে এমন এক সমাজবাদের আমদানী করা হয়েছে, যেখানে কেবল নামটি ছাড়া প্রকৃত সমাজবাদের কোন মিল নেই। সমাজবাদ ক্রমে নিজের প্রকৃত সাংস্কৃতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে, ধারনা দেয়া হয় পুঁজিবাদের সমাজে একটি সমাধান করে ফেলা যেতে পারে। নিজেদের দেশের সীমার ভেতরে থেকে প্রকৃত সামাজিক পরিবর্তন যে একেবারেই অসম্ভব তা ও ভুলিয়ে দেয়া হয়। সমাজবাদি নেতাদের মানসিকতার বদলের ফলে তাঁরা তাঁদের জাতীয় রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে থেকেই নিজেদের দলীয় কার্যক্রমের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে ব্যাপক পরিবর্তন করতে থাকেন। তাঁরা বেমালোম ভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদ বাদ দিয়ে নিজেদের দেশের সীমায় আবদ্ব হয়ে পড়েন। এঁরা জাতীয় রাষ্ট্রের যন্ত্রে পরিণত হয়ে পড়েন। তাই শ্রমিক আন্দোলন সমূহের দায়িত্ব হলো জাতীয় রাষ্ট্রের কবল থেকে সামগ্রীক আন্দোলনকে মুক্ত করে আগের জায়গায় নিয়ে আসা। অর্থাৎ আন্দোলনকে আন্তর্জাতিকতাবাদে রূপান্তর করা।

এটা ঠিক হবে না যে, বিশ্বাস ঘাতক আন্তর্জাতিক নেতাদের মুখোশ সকলের সামনে এখনি খোলে দেয়া, তাঁরা যা করেছে তা প্রকাশ করে ফেলা। এটা সত্য যে, আমরা সব কিছুই ক্রমে বুঝে সুঝে করতে চাই, পুঁজিবাদী সমাজের চিন্তাধারার সাথে বুঝা পড়াটা ঠিক ঠাক মত চালিয়ে যেতে চাই। এখন শ্রমিক দল বাস্তবে এমন কিছু কাজই করে চলেছে। তাঁদের কর্মকান্ড বুদ্বিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের চিন্তা চেতনাকে ও প্রভাবিত করে ফেলেছে। এই সমাজবাদি দল গুলো এক সময় কঠিন কঠিন সব যুক্তি নিয়ে বেড়িয়ে এসেছিলেন, তাঁরা জাতীয় রাষ্ট্র, সরকারকে নিপাত করতে বদ্বপরিকর ছিলেন। তাঁরা সেনাবাহিনীর বিরুধিতা করেন, তাঁরা জনগণকে বুঝাতেন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জনগনই যতেস্ট, সমাজবাদই সব কিছুর রক্ষা কবচ। তাঁরা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দখলে আনার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ব ছিলেন, সেখানে ক্রমে সমাজবাদ কায়েম করে সর্ব স্তরে মানুষের ক্ষমতায়ন চাইতেন।

এর পরের দৃশ্য ভিন্ন রকম, দেশে দেশে শ্রমিক দল সমূহে সংসদীয় রাজনীতি ঝেঁকে বসল খুবই দ্রুত, ক্ষমতা লোভী নেতা/নেত্রীগন সমাজবাদের ক্ষেত্র গুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার শুরু করে দেয়। আর এই সকল পদক্ষেপ দলের ভেতরে শুরু হয় পতনের ধারা, তাঁরা ক্রমে সমাজবাদের মৌলিক নীতিমালা বর্জন করে ভিন্ন পথে হাঁটা শুরু করে দেয়। সমাজবাদ একটি সময়ে সকল প্রকার সৃজন শীলতা হারিয়ে ফেলে, সংস্কারের পথ ধরে শুভেচ্ছা আকাংখীতে পরিণত হয়। লোকেরা ভোটে জয় লাভ করার মধ্যেই নিজেদের আনন্দ খোঁজে নেয়, নয়া সমাজ বিনির্মানের লক্ষ্যে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল, শ্রমিক শ্রেনীর রাজনীতির যে শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো তাঁরা তা বর্জন করে ফেলে। এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কেবল মাত্র চলমান সমস্যার প্রতি উপেক্ষা আর সমাজবাদকে সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে না পারার কারনে।

অথচ সেই সময়ে দুনিয়া জুড়ে একটি বিপ্লবী পরিবেশ উদ্ভব হয়েছিলো, প্রথম বিশ্ব যুদ্ব কালিন সময়ে ইউরূপের অনেক দেশেই তখন বিপ্লবের জন্য উন্মূখ ছিলো। দেশে দেশে তখন পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে, সমাজবাদি চিন্তাধারা তখন খুবই জনপ্রিয় শ্লোগান। কিন্তু সমস্যা ছিলো অনেকেই সমাজবাদের সত্যিকার মর্ম বুঝতেন না। রাশিয়াতে রাস্ট্রবাদি সমাজবাদিগন ক্ষমতা দখল করে, ফলে বলশেভিকদের রাস্তা প্রসারিত হয়, তাঁদের লক্ষ্য সমাজবাদি সমাজ বিনির্মান ছিলো বলে কখনই মনে হয় নাই। বরং তাঁদের মাঝে পুরনো ধারার আমলাতান্ত্রিকতা অনুসরন করাই লক্ষ্য হয়ে উঠে। তাঁরা রাস্ট্রীয় পুঁজিবাদ, একনায়কতন্ত্রকে বিকাশ ঘটায়। যা ইতিমধ্যে অনেক দেশে বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে তিরোহিত হয়ে গিয়েছিলো। জার্মানীতে মধ্যপন্থী সামাজিকগনতন্ত্রীরা ক্ষমতায় আসে। সেখানে দির্ঘকাল যাবত সমাজবাদ পার্লাম্যান্টারী পদ্বতী হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছিলো। এটা এতই অকেজো হয়ে পড়ে যে তা আর কোন প্রকার সৃজন কাজ করা ক্ষমতাই ধরে রাখতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ফ্রাংফ্রোটের জিতং বুর্জোয়া গনতান্ত্রিক লোকেরা ও বলতে থাকেন যে, “ইউরোপ পূর্বে বিপ্লবের অনেক কাজ করেছে কিন্তু এখন এত দূর্বল হয়ে পড়েছে যে, তাঁদের পক্ষে কোন প্রকার সৃজনশীল কাজ আর করা সম্ভব হচ্ছে না।”

কিন্তু এখানে শেষ নয়ঃ রাজনৈতিক ভাবে সমাজবাদ এমন অবস্থায় এসে দাঁড়ায় যে, তাদের পক্ষে গঠন মূলক সমতাবাদি চিন্তার লালন করা ও দুরূহ হয়ে পড়ে। নৈতিক ভাবে ও এমন অবস্থায় উপনিত হয় যে, তাঁদের পক্ষে বুর্জোয়া গণতন্ত্র, স্বাধিকার রক্ষা করা এমন কি নিজেদের অস্থিত্ব রক্ষার জন্য ও ফ্যাসিবাদের আশ্রয় নিতে হয় তাঁদের। শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলন সংগ্রামকে উপর্যোপরি আঘাত করে দমন করে রাখে। এই অবস্থা দেখে বুর্জোয়া রাষ্ট্র গুলো ও অবাক হয়ে দেখে যে, সমাজবাদ একটি অথর্ব ও অকার্যকর মতবাদে পরিণত হয়েছে। এটা যেন টেবিলে শিকল দিয়ে বাঁধা একটি কৃতদাস। আধুনিক এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম হলো রাজনৈতিক সমাজবাদের একটি সরাসরি বিপরীত ধারার মতবাদ। এই বিপরীত ধারার মতবাদটি বিকশিত হবার জন্য লড়াই করছে ফ্রান্সের, ইতালী, এবং অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের মাঝে সিন্ডিক্যালিজমের আন্দোলন দানা বাঁধার পর থেকে। আর সেই আন্দোলনের উৎস ছিলো প্রথম আন্তর্জাতিকের মুলমন্ত্র। শ্রমিক গন সেই মৌলিক নীতিমালার ভিত্তিতে লড়াই সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলো।

“শ্রমিক সিন্ডিকেট” শব্দটি ফরাসি শব্দ এর অর্থ হলো- ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা। যার তাৎক্ষনিক লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করা। কিন্তু এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম বিকশিত হবার পর এর অর্থগত ও কর্মপরিসর আরো প্রসারিত হয়। এই ধারার কাজে সংযুক্ত সংগঠন সমূহ আধুনিক রাজনৈতিক, সাংবিধানিক রাষ্ট্র সমূহে চলমান বুর্জোয়া বিধি বিধানের আমূল পরিবর্তন করে, নতুন ধারা প্রবর্তন করতে চায়। তাই সিন্ডিক্যালিজমের মতে, ট্রেড ইউনিয়ন, সিন্ডিকেট সমূহ এবং শ্রমিক সংগঠন গুলি পন্য পয়দা কারীদের সামগ্রীক স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সামাজিক পরিবর্তন সাধন করতে চায়। প্রচলিত সমাজ কাঠামো বদল করে সমাজবাদের ভিত্তিতে নয়া সমাজ প্রস্তুত করতে চায়।
তাই এটির দুইটি লক্ষ্য রয়েছে: (১) শ্রমিকগন নিয়োগ কর্তাদের বিরুদ্বে লড়াই করবে নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার জন্য। যেন তাঁদের জীবন যাত্রার মান আরো উন্নত হয়। (২) শ্রমিক শ্রেনীর লোকদেরকে বুদ্বিবৃত্তিক প্রশিক্ষন প্রদান করবে যেন তাঁরা সামগ্রীক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক জীবন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিজেদেরকে তৈরী করতে পারেন। বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি হলে যেন নিজেদের হাতে ক্ষমতা গ্রহন করে সমাজবাদের আলোকে সমাজ বিনির্মান ও পরিচালনা করতে পারেন।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম মনে করে, রাজনৈতিক দল সমূহ এমন কি যারা সমাজবাদের নাম ধারন করে, তাঁরা উক্ত দুটি কাজ সম্পাদন করতে পারে না। এমন কি যে সকল দেশে সমাজবাদি দল সমূহ নিজেদেরকে শক্তিশালী দল বলে প্রাচার করে ও মিলিয়ন ভোট পাওয়ার জন্য ভোটারের পিছনে লেগে থাকে। শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়নের সাথে কোনও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন না কারণ আইন তাদের দৈনিক রুটির জন্য তাদের সংগ্রামে কোন প্রকার সুরক্ষা প্রদান করেনি, এটা প্রমানিত সত্য। এটা প্রায়শই ঘটেছে যে দেশের এইসব ক্ষেত্রে যেখানে সমাজতান্ত্রিক দলগুলি সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল শ্রমিকদের মজুরি সেখানে সর্বনিম্ন এবং শ্রমের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সের উত্তর শিল্পকেন্দ্রগুলিতে, যেখানে সমাজবাদিরা বহুসংখ্যক শহর প্রশাসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং স্যাক্সনি ও সিলেসিয়াতে, যেখানে তাদের বিদ্যমান অস্তিত্বের মধ্যে ও জার্মান সমাজতন্ত্রের নিম্নলিখিত দিকগুলি আমরা দেখতে পাই।

সরকার ও সংসদ নিজেদের উদ্যোগে অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে খুব কমই সিদ্ধান্ত নেয় এবং যেখানে এইরকম ঘটনা ঘটেছে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সত্যিকার উন্নতির কথা সবসময়ই একটি মৃত অক্ষরে পরিণত হয়েছে।এভাবে বড় শিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজ সংসদের প্রচলিত প্রচেষ্টায়, যখন আইন পরিষদ শিশুদের ক্ষতিকারক অবস্থার প্রভাব থেকে রক্ষা করতে চেয়ে ছিলো, তখন এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে দীর্ঘদিনের সমস্যাটির উপর এর কোনও প্রভাব ই ফেলতে পারে নাই।একদিকে তারা নিজেদের শ্রমিকদেরকে বুঝতে না পারার কারণে পিছু হটে, অন্যদিকে তারা নিয়োগকর্তাদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাক্ষাত হয়। ইতালির সরকার ৯০ এর দশকে আইনপরিষদ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সাথে একই রকম আচরণ করেছিল। নারীদের নিষিদ্ধ করার জন্য সিসিলিতে স্যাল্ফার খনিতে তাদের সন্তানদের কড়াকড়ি ভাবে নিয়োগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

এই আইনটিও একটি মৃত অক্ষরমালা ছিল মাত্র, কারণ এই দুর্ভাগা নারীরা এতটা কস্টকর ভাবে অর্থ প্রাদান করেছিল যে তারা আইন উপেক্ষা করতে বাধ্য হয়ে ছিলো। একটি নির্দিস্ট সময়ের শেষে, যখন এই কর্মরত নারী্রা সংগঠন করতে সফল হয়েছেন, এবং এইভাবে তাদের জীবনযাত্রার ও মানসিকতা উন্নতি হয়েছে, তখন মন্দ দিক গুলো নিজেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রত্যেক দেশের ইতিহাসে এমন অনেকগুলি দৃষ্টান্ত রয়েছে।

এমন কি সংস্কারের ও আইনী অনুমোদনের কোন নিশ্চয়তা নেই। যদি জাগ্ররত জনতার চাপ না থাকে বা লড়াকো মানসিকতা নিয়ে সংসদের বাহিরে জনগণ অবস্থান না নেয় তবে আইন জনতার পক্ষে আসেনা। ১৮৮৪ সালে এই ভাবে ফ্যাক্টরী মালিকেরা একটি আইন করিয়ে নিয়েছিলো যাতে ১০ ঘণ্টা কাজ করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই আইনের সুবাদে তাঁরা শিল্প সঙ্কটের কথা বলে শ্রমিকদেরকে দিয়ে এগার বার ঘণ্টা কাজ করিয়ে নিত। কিন্তু যখন ফ্যাক্টরী পরিদর্শকগন এই কাজ পরিদর্শন করে যখন কোন আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করতে চাইতেন তখন অভিযুক্তরা নির্দোষ প্রমানিত হত। অধিকন্ত সরকার পরিদর্শদেরকে নির্দেশনা দিতেন তাঁরা যেন আক্ষরিক অর্থে আইন প্রয়োগ না করেন। এই ভাবে শ্রমিকদের উপর কাজ চাপিয়ে দেয়া সহজতর হত। ফলে শ্রমিকদের আবার দশ ঘণ্টা কাজের জন্য মাঠে নামতে হয়। ১৯১৮ সালে জার্মান শ্রমিকগন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবীতে নভেম্ভর বিপ্লব সাধন করে, অন্যদিকে সেখানে ইতিমধ্যে তাঁদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও সাধিত হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের নিকট থেকে তা নিয়োগ কর্তারা ছিনিয়ে নেয়। যা ছিলো সম্পূর্ন বে আইনী ও জগন্যতম অন্যায়।

আদতে রাজনৈতিক দল গুলো প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেনীর জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে তেমন কোন ভূমিকাই রাখতে পারে না। তাই তাঁরা একটি সমাজবাদি সমাজ বিনির্মান করে দিবেন এটা কল্পনা বিলাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন কি তার জন্য কোন প্রকার অবাদান রাখা ও তাঁদের জন্য অসম্ভব। মূলত এই ধরনের কাজের জন্য এঁদের জন্মই হয় নাই। রাশিয়া ও জার্মানীতে এর প্রচুর উদাহন বিদ্যমান আছে।

শ্রমিক আন্দোলন শুরু করতে হবে, কোন রাজনৈতিক দল নয়, সমাজবাদি চেতনা ধারন করে দৈনিন্দিন সমস্যার সমাধান করার জন্য কাজ করতে হবে। কেবল অর্থনৈতিক পরিমন্ডলেই শ্রমিকগন নিজেদের সামাজিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পারেন। পন্য উৎপাদন কারী হিসাবে নিজেদের মাঝে ঐক্য গড়া ও সামাজিক কাঠামো বিনির্মান করতে পারেন। কর্ম ক্ষেত্রেই শ্রমিকগন স্বাভাবিক জীবন অনুভব করতে পারেন। অন্য জায়গায় লড়াই সংগ্রামে যুক্ত হলে এঁরা নিজেদেরকে বহিরাগত মনে করেন, তাঁদের আশা আকাংখার প্রতিফলন দেখতে পায় না। নিজেরা আশাহত হন বা তাঁদের লক্ষ্য অর্জনের কোন সম্ভাবনাই তাঁরা দেখেন না। ফলে নিরাশা আর নিস্কৃয়তা ভর করে তাঁদের জীবন জুড়ে।
সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে শ্রমিকটি গ্রীক কিংবদন্তি অ্যান্টিয়াসের মতো, যাকে হারকিউলিস তার মাকে পৃথিবী থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার পরে গলা কেটে ফেলতে সক্ষম হন। শুধুমাত্র সামাজিক সম্পদ সৃষ্টিকারী এবং পন্য সৃষ্টিকর্তা হিসাবে তিনি তার শক্তি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন; তার সঙ্গীদের সাথে একাত্মতাবাদী সংগঠনে তিনি ট্রেড ইউনিয়নে অজৈব ফালানক্স তৈরি করেন যা কোনও আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে পারে, এটি যদি স্বাধীনতার চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার আদর্শের দ্বারা প্রাণবন্ত ও উজ্জীবিত হয়।

এনার্কো-সিডিকা্লিস্টদের জন্য ট্রেড ইউনিয়নের অর্থ কোন পুঁজিবাদী সমাজের সময়কালের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা একটি প্রান্তিক ঘটনা নয়। এটি ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক সমাজের সাধারণ চেতনা বা সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রত্যেক নতুন সামাজিক কাঠামো নিজের জন্য প্রাচীন সমাজের দেহে নিজের ব্রুন তৈরী করে। এই প্রাথমিক ব্রুন ছাড়া কোন সামাজিক বিবর্তন অসম্ভব। আসল কথা হল, কাংখিত বিপ্লব কেবল মাত্র বর্তমানে বিদ্যমান যে সমাজ রয়েছে সেখানে এর চেতনার বিকাশ ও পরিপক্ক হতে হবে এবং লোকদের মধ্যে তাদের সচেতনতার পথ তৈরি করতে হবে ; তারা নিজেরা এই গুলি তৈরি করতে পারে না বা নতুন জগতে সৃষ্টি করতে পারে না। তাই আমাদের এই চেতনা গুলি বিকশিত করার জন্য উদ্দীপ্ত করার এখনও সময় আছে এবং তাদেরকে শক্তিশালী করতে হবে। এমন এক স্তরে বিকাশিত করতে হবে যাতে করে তা আসছে সামাজিক বিপ্লবের কাজ সহজ করতে ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারে।
এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের সকল শিক্ষা ও প্রশিক্ষন সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হতে হবে। সমাজবাদের জন্য শিক্ষা- এর মানেই নয় যে তা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারনার মতই হবে। বরং পন্য পয়দাকারী লোকদেরকে বুঝতে হবে যে এই সমাজের প্রকৃত, কৌশলগত ও পরিচালনাগত সমস্যা কি কি। তাঁদের নিজেদের জন্য কি কি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। অর্থনৈতিক জীবন ব্যবস্থার পুর্গঠনের জন্য এবং তার পরিচালনার জন্য কারনীয় কি কি তাও বুঝতে হবে। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রামের জন্য আর কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন উপযুক্ত নয়; এটাই শ্রমিক শ্রেনীর মানুষের জন্য জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় অন্যান্য দলের সমর্থকে পরিণত হলে বা কাজ করলে তাঁদের মধ্যে কোন প্রকার নৈতিক বা সামাজিক রূপান্তর অসম্ভব। কেউ তাঁদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করলে বা অনুসারী হলে তাদেরকে নিজে কাজ কর্ম দিয়ে প্রমান করতে হবে যে তাঁরা শ্রমিক বান্দ্বব।
এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের সকল শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের লক্ষ্য হলো মানুষকে স্বাধীন কর্ম ও চিন্তার দিকে অগ্রসর করা। তাঁরা যেন সকল প্রকার কেন্দ্রীকতা ও রাজনৈতিক শ্রমিক দলের বিরুধীতা করতে পারেন। কিন্তু কেন্দ্রীকতাবাদ কৃত্তিম ভাবে সংগঠিত প্রক্রিয়ায় সকলের উপর সংখ্যা লগুদের একটি অদৃশ্য বলয় সৃজন করে থাকে। একটি প্রানহীন কর্মসূচী দিয়ে কাজ করার প্রায়স চালায়; এই সকল প্রক্রিয়া সকলের ব্যাক্তিগত উদ্যোগকে বিনাশ করে দেয়, এবং একটি প্রানহীন শৃংখলার নামে মানুষের উপর আমলাতান্ত্রিকতা ঝেঁকে বসে। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের সংগঠন ফেডারেশন ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, এখানে নিচের দিক থেকে উপরের দিকে স্বাধীন মতামতের গুরুত্ব প্রাধান্য পায়, প্রতিটি সদস্য তাঁদের নিজস্ব সিদ্বান্ত গ্রহনের ক্ষমতা লালন করতে পারেন, সম্মিলিত সিদ্বান্তের প্রতি ঐক্যমত গ্রহন ও ভিন্নমত পোষনের সুযোগ দেয়া হয়।

প্রায়স ফেডারেলিজমের বিরুদ্বে একটা অভিযোগ করা হয় যে, এটা মানুষের মাঝে বিভক্তি আনে আর সংগঠিত প্রতিরোধ সংঠনের ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত করে দেয়। এবং বলায় হয় এটা রাজনৈতিক শ্রমিক দলের প্রতিনিধি এবং তাঁদের প্রভাবাধীন ট্রেড ইউনিয়নের মতই কাজ করে- আসলে এই ধরনের অভিযোগ মুখস্থ বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এখানে ও জীবনের কঠিন আসল সত্য ও বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে। সকল সময়েই তত্ত্বের চেয়ে জীবন অনেক মূল্যবান। এখন পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন কোন দেশ নেই যেখানে সকল শ্রমিক আন্দোলন কোন না কোন ভাবে নিজেদের ঐক্য নিখুত ভাবে গড়ে তুলতে পেরেছে। কেবল জার্মানীতে হিটলার শ্রমিক সংস্থাকে যুগান্তকারী উদাহরন সৃষ্টি করে নিজেদেরকে দৃঢ় কঠিন ঐক্যে আবদ্ব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সারা দেশকে একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় এনে সকল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সামাজিক গনতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় বার মিলিয়ন ভোটার তাঁদের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেন। এই নির্বাচনের পর হিটলার ক্ষমতায় এসে যখন মানবজাতির জন্য এক মহা বিপর্যয় সৃষ্টি করল তখন ছয় মিলিয়ন শ্রমিকের কেহই একটি অংগুল তুলে এর প্রতিবাদ করেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই হিটালার শ্রমিকদের সকল সংগঠন টুকরো টুকরো করে ফেলে।

কিন্তু স্পেনে কি ঘটল, প্রথম আন্তর্জাতিকের পর থেকেই সেখানে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের আদর্শের ভিত্তিতে সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। তাঁরা সেখানে মুক্তিপরায়ন ও প্রতিরোধ মূলক চিন্তা ধারার প্রচারনা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষন দিচ্ছিলো। সেখানে যে সংগঠন টি শক্তিশালী অবস্থানে ছিলো তা হলো সি এন টি। তাঁরা ফ্রাঙ্কো ও তার দেশীয় ও বিদেশী দালাল চক্রের বিরুদ্বে প্রথম থেকে অত্যন্ত দৃঢ় ভাবে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে। সিন্ডিক্যালিস্টগন তাঁদের বীরোচিত ভূমিকার মাধ্যমে স্পেনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে লড়াই ছালিয়ে যায়।ফ্রাঙ্কোর প্রতিটি পদক্ষেপের বিরুদ্বে তাঁরা শক্ত অবস্থান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতির কথা ফ্রাঙ্কো নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন প্রতিরোধ গড়ে না তুললে কয়েক দিনের মধ্যেই ফ্রাংকো সমগ্র স্পেনের উপর প্রভূত্ব কায়েম করে ফেলত।

যখন একজন ব্যাক্তি সি.এন.টি. এর ফেডারেল সংগঠনের কৌশলটি তুলনা করেন। জার্মান শ্রমিকরা নিজেদের জন্য কেন্দ্রীয় সহায়তার মাধ্যমে সংগঠন গড়ে তুলেন। এঁদের প্রাক্তন সাথীদের সরলতা দেখে কেউ কেউ অবাক হন। ছোট সিন্ডিকেট সংগঠনের প্রতিটি কাজ স্বেচ্ছায় সম্পাদিত হয়। বৃহত্তর সাংগঠনিক পরিসরে, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন হয়, সেখানে এক বছরের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকে এবং তাঁরা তাদের কাজের জন্য পারিশ্রমিক হিসাবে একই বেতন পেয়ে থাকেন। এমনকি সি.এন.টি. এর সাধারণ সম্পাদক ও তাই পান। এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম ছিল না। এটি একটি পুরানো ঐতিহ্য যা আন্তর্জাতিকের সময় থেকে এখন পর্যন্ত স্পেন চালু রাখা হয়েছে। এই সাধারণ সংগঠনটি শুধুমাত্র স্প্যানিশ শ্রমিকদের সি এন টি এটাই প্রথম লড়াই সংগ্রামে একত্রিত হওয়ার ক্ষেত্র, এটা তাদেরকে আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নিজেদের রক্ষাকারী হিসাবে ঠিকিয়ে রাখে এবং এই সংগঠনটি চরিত্রগত ভাবে একাত্মতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে তাদের সাহায্য করে এবং তাঁরা অন্য কোন দেশের সাথে মিলিত হয নাই।

রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীকরণের জন্য সংগঠনই উপযুক্ত কাঠামো, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য সামাজিক জীবনে সর্বাধিক সম্ভাব্য সামঞ্জস্য বজায় রাখার বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখে। কিন্তু একটি আন্দোলনের জন্য যখন কোনও অনুকূল মুহূর্তে অবিলম্বে পদক্ষেপের দরকার হয়ে পড়ে এবং তখন তার সমর্থকদের স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের শক্তির উপর নির্ভর করা জরুরী হয়ে পড়ে, তখন কেন্দ্রীকরণটি তার সিদ্ধান্তের শক্তিকে দুর্বল করে এবং সমস্ত তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি পরিচালনা করতে সমস্যা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানির কথা উল্লেখ করতে হয়। প্রত্যেক স্থানীয় ধর্মঘট পালনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অনুমোদন দরকরা হত, যা প্রায়শ শত মিলিয়ন মাইল দূরে ছিল এবং সাধারণত স্থানীয় অবস্থার উপর একটি সঠিক সিদ্বান্ত গ্রহন করার মতো অবস্থানে ছিল না। আশ্চর্যের কিছু নেই যে সংগঠনের যন্ত্রপাতির অদলবদল একটি দ্রুত আক্রমণকে অসম্ভব করে তুলেছে এবং এভাবে সেখানে একটি রাষ্ট্রীয় বিষয় উঠে আসে যেখানে শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্ককারী গোষ্ঠীগুলি এখন আর কম সক্রিয় করার জন্য নিদর্শন হিসেবে কাজ করে না, তবে এই সকল বিষয়ে নিষ্ক্রিয়তা মাধ্যমে নিন্দা করা হয়, নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন সংগ্রামে নিস্কৃয়তা, ও সব কিছু বন্দ্ব করে দেয়া একটি উপায়। যখন এটি নিজেই শেষ হয়ে যায়, তখন এটি তার সদস্যদের চিন্তা চেতনা ও উদ্যমকে হত্যা করে ফেলে এবং মধ্যবিত্তের দ্বারা এই সংগঠনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে যা সমস্ত আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য।
এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম হলো এমন একটি মতবাদ যা ট্রেড ইউনিয়নকে এমন ভাবে তৈরী করতে চায় যা শ্রমিক শ্রেনীর আশা আকাঙ্ক্ষাকে ধারন করে তাঁদের নিয়োগ কারীদের বিপরীতে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এবং সাথে সাথে নিজেদেরকে এমন ভাবে তৈরি করবে যাতে শ্রমিকগন সামাজিক বিপ্লব সাধন করে নয়া ধরনের সমাজ বিনির্মানে সক্ষম হয়ে উঠবেন। নয়া সামাজিক জীবনের এঁরা হবে অনুঘটক। শ্রমিকদের সংগঠনে যথাযথভাবে নিম্নোক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়: প্রতিটি এলাকায় শ্রমিকরা তাদের নিজ নিজ কাজের জন্য ইউনিয়নগুলিতে যোগদান করেন এবং এটিতে কোনও কেন্দ্রীয় ভেটো প্রয়োগ করে না বরং স্ব-সংকল্পের সম্পূর্ণ অধিকার ভোগ করে। একটি শহর বা গ্রামীণ জেলায় ট্রেড ইউনিয়ন একটি শ্রম অঞ্চলে একত্রিত হবে। শ্রম অঞ্চল গুলি স্থানীয় প্রচার ও শিক্ষার জন্য কেন্দ্র গঠন করে; তারা একসঙ্গে শ্রমিকদের একত্রে জড়ো করে এবং কোন সংকীর্ণ মনস্তাত্ত্বিকতার চেতনা গড়ে তোলার প্রতিরোধ করে। স্থানীয় শ্রম সংকটের সময়ে তারা পরিস্থিতির অধীনে প্রতিটি সংস্থা ব্যবহারে সংগঠিত শ্রম শক্তির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্বির ব্যবস্থা করে। সমস্ত শ্রম আঞ্চলিক শাখা গুলি জেলা অঞ্চলে ন্যস্ত করে জাতীয় ফেডারেশন অব লেবার কার্টেল গঠন করে, যা স্থানীয় সংস্থাগুলির মধ্যে স্থায়ী সংযোগ বজায় রাখে, বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের সহকর্মী লাইনের উৎপাদনশীল শ্রম শক্তির স্বাধীন সমন্বয় করার ব্যবস্থা করে। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করে, যার মধ্যে শক্তিশালী কার্টেলগুলিকে দুর্বলদের সহায়তায় আসতে হবে, এবং সাধারণ পরিষদ এবং নির্দেশিকা সহকারে স্থানীয় দলকে সহায়তা করবে।

প্রতিটি ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি, একটি ট্রেড ইউনিয়নের জোটে সমস্ত দেশের সাথে জড়িত হবে, এবং এইগুলির সব পারস্পরিক ভাবে সম্পর্কিত থাকবে, যাতে সমস্ত সাধারণ শিল্প সমিতির মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে। স্থানীয় সংগঠন সমূহের মধ্যে সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জোটের কাজ এবং প্রয়োজনীয় মূলধন তৈরির জন্য উদ্যোগ গ্রহন করবে। মূলধন ও শ্রমের মধ্যকার দির্ঘ কালের যে সংগ্রাম চলছে তা দূরীকরনের জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করবে। সুতরাং ফেডারেশন অব লেবার কার্টেলস এবং ফেডারেশন অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালায়েন্স দুটি পক্ষ গঠন করবে, যার ফলে ট্রেড ইউনিয়নের সমগ্র চাহিদা পূরনে সামগ্রীক ব্যবস্থা গ্রহন করবে।

সংগঠনের এই ধরনের একটি কর্মের ধরন কেবল কর্মীদের প্রতিদিনের রুটির জন্য সংগ্রামে সরাসরি কাজ করার সুযোগ দেয় না, বরং এটি তাদের নিজস্ব শক্তির দ্বারা সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনায় সমাজের পুনর্গঠন করতে বাহিরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রয়োজনীয় রূপান্তরের সুযোগ প্রদান করে থাকে। কোন একটি বিপ্লবী সঙ্কটের ক্ষেত্রে এনার্কো-সিন্ডিক্যালস্টরা বিশ্বাস করে যে, একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সরকার কর্তৃক প্রণীত আইন-কানুন দ্বারা তৈরি করা যায় না, তবে উৎপাদনকারী প্রতিটি শাখায় হাতে কলমে বা চিন্তাধারায় শ্রমিকদের অংশগ্রহনে বা একান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান আসতে পারে; যে সমস্ত উদ্যোগ দ্বারা এই ধরনের কর্মের মধ্যমে সমগ্র এলাকায় বিপ্লব পরিচালনার উপর নিয়ন্ত্রন গ্রহণের দরকার হয় সেই ক্ষেত্রে শিল্প কারখানায় পৃথক দল ও শাখাগুলিতে সাধারণ অর্থনৈতিক জীবনে স্বাধীন সদস্য এবং পদ্ধতিগতভাবে উৎপাদন ব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহন করে এবং উৎপাদিত পণ্যগুলির বিতরণ মুক্ত ও স্বাধীন পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে সমাজের স্বার্থে ব্যবহার বা উপভোগ করা হয়।

এই পরিস্থিতিতে শ্রম কার্টেলগুলি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের বিদ্যমান সামাজিক পুঁজিটি গ্রহণ করবে, তাদের জেলার অধিবাসীদের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করবে এবং স্থানীয় অধিবেশন অনুস্টান করবে। জাতীয় ফেডারেশন অফ লেবার কার্টেলস এর সংস্থা্র মাধ্যমে দেশের মোট প্রয়োজনীয়তা পরিমাপ করা এবং সেই অনুযায়ী উৎপাদন কর্ম সম্পাদন ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, উত্পাদন, যন্ত্র, কাঁচামাল, পরিবহণের মাধ্যম এবং অনুরূপ সকল উপকরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা উৎপাদনকারী দলগুলি সরবরাহ করার জন্য এটি শিল্প সহায়ক গোষ্ঠীর কাজ করবে। সংক্ষেপে বললেঃ ১। কারখানায় উৎপাদন হবে নিজেদের দ্বারা এবং তাদের দ্বারা নির্বাচিত শ্রম কাউন্সিলের দ্বারা পরিচালিত হবেন সকলেই ২। দেশের সমগ্র উৎপাদন সম্পন্ন হবে শিল্প ও কৃষি জোট দ্বারা। ৩। শ্রম কার্টেলস দ্বারা সম্পন্ন হবে সামগ্রীক খরচ ও ভোগ।

বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে সত্যিকার শিক্ষা দেয়। এটা আমাদেকে শিক্ষা দেয় যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সমস্যার সত্যিকার সমাধান কোন সরকারের পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। এমন কি পুরোমাত্রায় প্রলেতারিয়েতদের জন্য একনায়কতন্ত্র কায়েম করে ও তা করা অসম্ভব ব্যাপার। পার্টি রাশিয়াতে অর্থনৈতিক সংকট সৃস্টির আগেই প্রথম দুই বছরেই অসহায় হয়ে পড়ে। ফলে একের পর এক ডিক্রি জারি করে তার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এই সকল ডিক্রির বেশীর ভাগই বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। যদি দুনিয়াকে আইনের মাধ্যমে সমস্যা মুক্ত করা যেত তবে রাশিয়াতে কোন সমস্যার অস্থিত্ব থাকত না। সরকার গুড়ামীপূর্ন অযৌক্তিক সিদ্বান্ত গ্রহনের মাধ্যমে বলসেভিক সহিংসতা দিয়ে জোর করে স্থানীয় পর্যায়ে যে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিলো তা ধবংস করে দেয়। সমবায়কে সঙ্কুচিত করে দেয়, ট্রেড ইউনিয়ন সমূহকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা হয়, সৌভিয়েত সমূহকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। সূচনাতেই তাঁদের সকল প্রকার স্বাধীনতাকে খর্ব করে দেয় রাস্ট্র। চিন্তক ক্রপতকিন ন্যায় বিচারের আলোকে বলেন, “ এটা ছিলো পশ্চিম ইউরূপের দেশ সমূহের শ্রমিকদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা”।

“রাশিয়া যে উদাহরন দেখিয়েছে তাতে সমাজবাদ বুঝা মুশকিল, যদি ও জনগণ কোন প্রকার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। কিন্তু জনগন পুরাতন শাসন ব্যবস্থার জায়গায় এমন বিরক্তিকর প্রশাসন চায়নি। শ্রমিক কাউন্সিলের ধারনাটি রাজনৈতিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রনের জন্য ছিলো একটি ব্যাতিক্রম ধর্মী উদ্যোগ। কিন্তু দেশে চালু করা হলো পার্টির একনায়কত্ব। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিক ও কৃষক পরিষদ সমূহ নিজেদের সক্রিয় ভূমিকা হারিয়ে ফেলে। ফলে এঁরা আবার সেই পুরাতন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতই উপেক্ষিত ও নিস্কৃয় ভূমিকায় চলে যায়। শ্রমিক কাউন্সিল স্বাধীনভাবে যে উপদেশকের ভূমিকা রাখার কথা ছিলো তা আর সম্ভব ছিলো না, এমনকি স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম ও বিনষ্ট করে দেয়া হয়। প্রথম দুই বছরেই এই সকল পদক্ষেপ নিয়ে নয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে পুরাতন ধারায় যাত্রা করে কমিউনিস্ট পার্টি। পরিস্থিতি এত খারাপের দিকে গেল যে, শ্রমিক ও কৃষক পরিষদ জনগণের নিকটে যাবার অধিকার পর্যন্ত হারিয়ে ফেলল, ফলে নির্বাচনে একনায়ক পার্টির সিদ্বান্তের বাহিরে গিয়ে তাঁদের কিছুই করার ছিলো না। এই ভাবে একটি সরকার কাউন্সিল (সৌভিয়েত সরকার) দ্বারা নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্রমে পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করে। নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহনের বদলে বিপ্লব পূর্ব পুরাতন ব্যবস্থা কায়েমের ডিকে এগিয়ে যায়; যা ছিলো মূলত অচল ভিত্তির উপর দাড়িয়ে অচল নীতির চর্চা করা”।

প্রচলিত ঘটনা প্রবাহ নিয়ে পিটার ক্রপতকিনের বক্তব্য যথাযথভাবেই প্রমানিত হয়েছে। রাশিয়া এখন দুনিয়ার যে কোন দেশের তুলনায় সমাজবাদ থেকে অনেক দূরে। একনায়কতন্ত্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ও মুক্তি শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং মানুষের উপর নিপিড়ন নির্যাতন চেপে বসে, সকল প্রকার উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে, সাধারন মানুষের মর্যাদা ও সম্মান ভুলন্ঠিত হয়। এই শাসন কালে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেনী তেমন কিছুই অর্জন করতে পারেনি, শোষণ আর ধবংস তাদের জিবনকে করে তুলে দুর্বিসহ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যাঁতাকল সাধারন মানুষকে দাসের স্তরে নামিয়ে দেয়। স্টেখানভ ব্যবস্থার মত উৎপাদন বৃদ্বির জন্য প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠে। মানুষ তাদের জীবন ও শ্রম দানের উপর সকল প্রকার স্বাধীনতা হারিয়ে বসে। বাধ্যতা মূলক শ্রম দানের জন্য সমাজবাদ মানুষকে বাধ্য করে। এই পরিস্থিতি মানুষকে বিরক্ত করে, তাদের কর্মের সকল আনন্দ তারা হারিয়ে ফেলে, তাদের ব্যাক্তিগত কর্মোদ্যম হারিয়ে যায়, তারা সমাজবাদের কথা ও শুনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

আমরা এখানে জার্মানীর কথা বলছিনা। একটি পার্টি যেমন সামাজিক গনতন্ত্রী বা তাদের কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তে কোন একজন ব্যাক্তি দায়িত্বশীল নয়, যারা ১৯১৮ সালের নভেম্বরে একটি বিপ্লবের জন্য শ্রমিক শ্রেনীর লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়েছিলো। সেই সময়ে জার্মান জনগণ বিপ্লবের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না, সেটা তারা করেছিলো সমাজবাদের পরিক্ষা নিরিক্ষা করার জন্য। ক্ষমতার উত্থান পতন একদিনে হয় না, এই সম্পর্কে সুনির্দিস্ট করে কেহ তেমন কিছু বলতে ও পারেন না। এটা অবশ্যই একটি ধারাবাহিক কর্মের ফল হিসাবেই দেখা হয়।

স্পেনের এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট শ্রমিক ইউনিয়ন সমূহ, বিশেষ করে কাতালুনিয়ায় যেখানে তাদের প্রভাব ছিলো অত্যন্ত প্রবল, তারা সেখানে সমাজবাদি বিপ্লবের জন্য শ্রমিক আন্দোলনের একটি চমৎকার উদাহরন সৃষ্টি করে। তারা সেখানে দেখিয়ে দেয় যে শ্রমিক ইউনিয়নকে অবশ্যই বিপ্লবী ধারায় থাকা চাইঃ সমাজবাদের ধারায় নিজেদেরকে কায়েম মোকাম রেখে নিজেদের স্থান তৈরী করে নিতে হবে ক্রমশ। তার জন্য সমাজবাদি শিক্ষা ও প্রশিক্ষন এবং সরাসরী কাজ করার ধারায় থাকতে হবে। কোন প্রকার রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে নয়। স্পেনে শ্রমিক আন্দোলনের নির্ভরতা কোন রাজনৈতিক দলের উপর ছিলো না।তারা নির্ভর কত ট্রেড ইউনিয়নের উপর।

১৯ শে জুলাই ১৯৩৬ সালে, ফ্যাসিস্ট জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ষড়যন্ত্রের ফলে প্রকাশ্য বিদ্রোহের শুত্রপাত হয়। সেই সময়ে সি এন টি বিরোচিত ভাবে তাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এফ এ আই কাতালুনিয়ায় কর্তৃত্ব গ্রহন করায় ষড়যন্ত্র কারীদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। সেই উত্থান বা পদক্ষেপ হঠাত করে গড়ে উঠেনি। এটা পরিস্কার ছিলো যে কাতালুনিয়ার শ্রমিকগন মাঝ পথে থামবেন না। তাই তারা ভূমির যৌথ করন, কারখানা ও শ্রমিকদের কর্মস্থলে সমিতি গড়ে তুলে; সেই আন্দোলনের সামগ্রীক নেতৃত্ব দেয় সি এন টি এবং এফ এ আই। তারা এরাগন, লেভান্ত এবং দেশের অন্যান্য স্থানে মুক্ত এলাকা গঠন করে ইউ জি টি কার্যক্রম জোরদার করে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শক্তির উন্মত্ত তৎপরতা স্পেনের সামাজিক বিপ্লবের বিনষ্ট করে ফেলে।

এই রকমের ঘটনা প্রবাহ বুঝিয়ে দেয় যে, এনার্কো-সিন্ড্যাকালিস্ট শ্রমিকগন স্পেনে কেবল লড়াই সংরামই করবে না, তারা দির্ঘকাল ধরে যে সমাজবাদি শিক্ষা পেয়েছে তা বাস্তবে রূপায়ন করবে। স্পেনের উদারতাবাদি সমাজতন্ত্রীদের জন্য এটা ছিলো একটি ইতিবাচক দিক। সি এন টি এবং এফ এ আই প্রথম ইন্টারন্যাশনারের সময় থেকে যে স্বাধীন চেতনায় সমৃদ্ব হয়েছে তা এখন কাজে লাগাবার বুদ্বিবৃত্তিক বিকাশের মওকা পেয়েছে। স্পেনের স্বাধীকার পন্থী শ্রমিক আন্দোলনকারীগন যে আদর্শ লালন করতে শিখেছেন তাথেকে তারা পিছিয়ে যান নাই, যার বিপরীত চিত্র দেখি জার্মানীতে; তারা বুর্জোয়া পার্লামেন্টের পেছনে গিয়ে নিজেদের শক্তির ক্ষয় করেনি। জনগণের মধ্যে সমাজবাদ নিয়ে এক প্রকার ভয় কাজ করত, তারা তাদের অর্থনৈতিক প্রতিস্টানাদি নিয়ে ও আতঙ্কে ছিলো।

সি এন টি অন্যান্য দেশের শিল্প শ্রমিকদের মত কোন জোট ছিলো না। এটা শ্রমিক কৃষক এবং বুদ্বি বৃত্তিক কর্মী পর্যায়ের লোকদেরকে যুক্ত করে গড়ে উঠে। তাই দেখা যায় কৃষক, শ্রমিক অন্যান্য নগর কেন্দ্রীক কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে লড়াই করছে। আর এটা হলো দির্ঘ সময় ধরে শ্রমিকদেরকে সমাজবাদি শিক্ষা প্রদানের ফল। সমাজবাদের বিভিন্ন দল, সত্যিকার উদারতাবাদি এবং ফ্যাসিবাদ বিরুধী গ্রুপ সকলেই একত্রিত হয়ে কাজ করেছেন, এটা প্রমানিত হয়েছে যে,এই ধরনের উদ্যোগ সি এন টির সৃজনশীলতারই পরিচায় বহন করে। তাদের মধ্যে অনেকে প্রকৃতিক বুদ্বমত্তা, চিন্তাশীলতা, অযৌক্তিকসহনশীলতা ইত্যাদি সি এন টির কাজের ফলে সকল কিছুই মীমাংসিত ও সমন্বিত হয়ে যায়। শ্রমিক , কৃষক, কারিগর, বিজ্ঞানী সকলে মিলে সমবায় গড়ে তুলেন। মাত্র তিন মাসে মধ্যে সামগ্রীক পরিবেশে এক প্রকার ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। কাতালুনিয়াতে নয়া মানব সমাজের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।

কাতালোনিয়াতে তিন-চতুর্থাংশের চেয়ে ও বেশী জমি যৌথকরন করা হয় এবং শ্রমিকদের সিন্ডিকেট দ্বারা সমবায়ভাবে চাষ করা হয়। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি নিজেই একটি ব্যবস্থার উপস্থাপন করে এবং তার নিজস্বভাবে তার অভ্যন্তরীণ বিষয় সমন্বয় সাধন করে, ফেডারেশন হল সংস্থার সংস্থা এর মাধ্যমে তার অর্থনৈতিক নীতি স্থির করা হয়। এইভাবে নতুন ধারণা এবং পারস্পরিক উদ্দীপনা, এবং মুক্ত উদ্যোগের সম্ভাবনা সংরক্ষিত করা হয়। দেশের এক-চতুর্থাংশ জমি ছোট কৃষক মালিকদের হাতে থাকে, যাদেরকে যৌথভাবে গড়ে উঠা খামারে যোগদান বা তাদের পারিবারিক পশুপালন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে মুক্ত পছন্দের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ছোট হোল্ডিংসগুলি্র সঙ্খ্যা তাদের পরিবারের আকারের অনুপাতেও বৃদ্ধি পেয়েছে। আরাগানে সমষ্টিগত চাষের জন্য ঘোষিত কৃষকদের একটি অতি চমৎকার ব্যবস্থা। চার শত সমষ্টিগত খামারের মধ্যে যে সকল খামার এই প্রদেশে রয়েছে, যার মধ্যে দশটি সমাজতান্ত্রিক ইউ জি টি নিয়ন্ত্রণাধীন, বাকি সবগুলি সি.এন.টি. এর সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত হয়। কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাত্র এক বছরে চাষের আওতায় ফেলে রাখা ভূমির ৪০% জমি চাষের আওতায় আনা হয়েছে। লেভান্তে, আন্দালুসিয়া এবং ক্যাসিটালে, এছাড়াও, সিন্ডিকেট পরিচালনার অধীনে সমষ্টিগত কৃষি ক্রমবর্ধমান উন্নত অগ্রগতি অর্জন করছে। অনেক ছোটো সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সমাজতান্ত্রিক জীবনধারা ইতোমধ্যেই প্রকৃতিগত ভাবে গড়ে উঠেছে, বাসিন্দারা এখন অর্থের বিনিময়ে কিছু করা বা বহন করে না, বরং তাদের যৌথ শিল্পের পণ্যগুলি থেকে তাদের নিজেদের চাহিদা পূরণ করে এবং সম্মিলিতভাবে তাদের কমরেডদের সামনে দিকে জীবন যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে।

বেশীরভাগ গ্রামীণ সমিতির কর্মীদের ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে এবং যুদ্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত নতুন ব্যবস্থার আরও উত্সাহিত করা হয়েছে, যা বর্তমানে জনগণের সার্বভৌমত্ব দাবি করে। এই মজুরির পরিমাণ পরিবারের আকার দ্বারা নির্ধারিত হয়। সি এন টি এর দৈনিক বুলেটিনগুলির অর্থনৈতিক রিপোর্টগুলি ছিলো খুবই আকর্ষনীয় নয়া মেশিন ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করার মাধ্যমে সমষ্টিগত এবং তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের হিসাবগুলি সাথে সাথে জনগণকে জানিয়ে দিত। যা আগে প্রায় সকলেরই অজানা ছিল। কেবল কাস্টাইলে সমষ্টিগত কৃষি কাজে গত বছরের তুলনায় এইবার আরো দুই মিলিয়ন প্যাসেট ব্যয় করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের ইউ.জি.টি. গঠনের পর জমির সমৃদ্ধ করার অ যৌথকরনের বিশাল কাজটি অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে সাধারণ আন্দোলনে যোগদান অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে সমস্ত বিষয় সি.এন.টি. প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয়। সিএন টি এবং ইউ জি টি এই দুই সংগঠনের একটি সমবায়করণ সহজতর করে দেয় যা দুই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদেরকে একটি জোটে পরিনত করে।

কিন্তু শ্রমিকদের সিন্ডিকেটগুলি শিল্পের ক্ষেত্রে তাদের অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে, যেহেতু তারা নিজের হাতে শিল্পের পরিচালনার জন্য প্রশাসনকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছে। কাতালোনিয়াতে এক বছরের মধ্যে রেলপথ একটি সম্পূর্ণ আধুনিক সরঞ্জামের সাথে যুক্ত ছিলযাতায়াত ব্যবস্থায় পরিনত হয়, এবং সময়সীমায় এই পরিষেবাটি এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছেছিল যেটি এখন পর্যন্ত একটি রেকর্ড। একই অগ্রগতি ঘটেছিলো সমগ্র টেক্সটাইল শিল্পে, মেশিন নির্মাণে, বিল্ডিংয়ে এবং ছোট শিল্পগুলিতে, সমগ্র পরিবহন ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সিন্ডিকেটগুলি একটি বিস্ময়কর কাজ করেছে। তথাকথিত নিরপেক্ষ চুক্তির কারনে স্প্যানিশ সরকার বিদেশ থেকে কোনও প্রকার যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অস্ত্র আমদানি করতে পারছিলোনা তা একটি বাধা হয়ে ওঠে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট বিদ্রোহের আগে কাতালোনিয়ায় সেনা সরঞ্জাম নির্মাণের জন্য একটি কারখানা ও ছিলো না। অতএব, প্রথম উদ্বেগ ছিল, যুদ্ধের চাহিদা পূরণের জন্য অস্ত্র শিল্পের কারখানা পুনর্নির্মাণ করা। সিন্ডিকেটের জন্য এই ধহরনের একটি কাজ করা খুবই কঠিন ছিল, ওন্যদিকে ইতিমধ্যে তাদের হাতে একটি নতুন সামাজিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মত কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো। কিন্তু তারা কাজটি অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনা এবং কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে সম্পাদন করেছেন যা কেবলমাত্র শ্রমিকদের দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় এবং তাদের এই কাজের জন্যই অসংখ্য মৃত্যু ঠেকানো গেছে। শ্রমিকগন কারখানাগুলিতে বারো এবং চৌদ্দ ঘন্টা পর্যন্ত প্রতিদিন কাজ করেছেন। কাতালোনিয়া এখন প্রায় ২৮৩টি অস্ত্র নির্মান কারখানা আছে। যা যুদ্ধের উপকরণ তৈরিতে দিন ও রাতের কাজ করে, যা সিমান্ত এলাকায় সরবরাহ করা যায়। বর্তমানে কাতালোনিয়া সমস্ত যুদ্ধের চাহিদার বৃহত্তর অংশ সরবরাহ করছে। অধ্যাপক আন্দ্রে ওলটমারস একটি নিবন্ধের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে এই ক্ষেত্রে কাতালোনিয়ার শ্রমিকদের সিন্ডিকেট "বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাবের পরে চৌদ্দ মাসে ফ্রান্সে যতটা লাভবান হয়েছে এই ক্ষেত্রে সাত সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হয়েছে"।

এটা সত্য যে একটি কেবল চুক্তি দ্বারা সব কিছু করা সম্ভব হয় না। দুর্ভাগ্যজনক হলে সত্য যে, যুদ্ধ স্পেনের সমস্ত যুদ্ধবিমুখ প্রতিটি জেলখানার ভেতর যুদ্ব একটি প্রচন্ড ঝাঁকুনি দেয় যা তাদেরকে কাতালোনিয়াতে যুদ্বের মাঠে নিয়ে আসে; তাদের সংখ্যা এক মিলিয়নের বেশী কাতালোনিয়ার হাসপাতালের অসুস্থ এবং আহতদের প্রায় ৫০ শতাংশ ক্যাটালোনিয়ার লোক নয়। অতএব, এই সকল কাজের চাহিদার প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের সিন্ডিকেট যথাযত ভাবে সম্পাদন করেছে। সি.এন.টি. এর শিক্ষকদের দ্বারা সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন, শিল্পকর্মের সুরক্ষার জন্য সমিতি নিজ দায়িত্বে শত শত কাজ করেছেন। যার অন্যান্য বিষয়ে উল্লেখ করা নিস্প্রয়োজন।

সেই যুদ্বকালিন সময়ে সি এন টি ১২০,০০০ মিলিশিয়া গড়ে তুলে, যারা যুদ্ব ক্ষেত্রের নানা ফ্রন্টে লড়াই করছিলেন। এই এই রকমের যানবাজ কর্মী বাহিনী এর আগে আর কোন সংগঠন তৈরী করতে পারে নাই। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে সি এন টি-এফ এ আই যে বিরত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে যার জন্য ফ্রান্সিস্কু এস্কো এবং বিউনাভেন্টুরা ডরুতী তাদের জাতি স্প্যানিশদের নিকট বীর হিসাবে চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন।

এই পরিস্থিতিতে এটা বুঝা যাচ্ছিলো যে, সিন্ডিক্যাট গুলো সামাজিক পুনর্গঠনের কাজ সমূহ সঠিক ভাবে সম্পাদন করতে পারছিলো না, এবং নিজেদের সংগঠনকে মজবুত করার জন্য যথাযথ ভাবে মনোযোগ দিতে পারছিলো না। যুদ্বের প্রয়োজনীয় উপকরন, সরঞ্জামাদি ফ্যাসিস্ট বাহিনী জার্মান, ইতালীর দখলে ছিলো। পুঁজিবাদ সম্পূর্ন বৈরী আচরন করে প্রতিবিপ্লবে সহায়তা করেছে, অন্যদিকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টির সখ্যতা ছিলো খুবই গভীর ফলে এরা ও প্রতিবিপ্লবের পক্ষে কাজ করে। ফলে সিন্ডিক্যাট সমূহ সঠিক ভাবে নিজেদের কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারেনাই। কিন্তু সিন্ডিক্যাট সমূহ কারখানা ও জমি দখলে দিয়ে সমাজবাদের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলো। তারা প্রমান করে দিয়েছিলো যে কোন পুঁজিবাদী লোকের সহায়তা ছাড়া ও ব্যাপক আকারে উৎপাদন করা সম্ভব, মুনাফা পাগল চক্র ছাড়া ও শিল্প কারখানা পরিচালনা করে মানুষে চাহিদা সন্দর ভাবে মেটানো সম্ভব। যদি ও যুদ্ববাজ চক্র স্পেনে নানা ভাবে এর বিরুদ্বে প্রচারনা চালিয়েছে এর পর ও এটা স্পস্ট হয়ে উঠে যে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম মানুষকে নয়া ব্যবস্থা উপহার দিতে সক্ষম। শুধু তাই নয় সমাজবাদি আন্দোলনের জন্য একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন যদি শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে এবং প্রতিটি দেশেই সত্যিকার স্বাধীন সমাজতন্ত্র চায় তবে, তাদেরকে প্রচলিত সংগঠন সমূহকে অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সকল দেশে একেই ভাবে সকল কার্যক্রম অনুসরন করতে হবে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, রচম রেওয়াজ আছে। মানুষে মন মানসিকথা ও আলাদা ধরনের হয়ে থাকে। এই জন্য ফেডারেশন ভিত্তিক যৌথজীবন যাপনের জন্য মানুষকে ক্রমে আগ্রহী করে তুলতে হবে, তাদের প্রচলিত চিন্তা ভাবনায় যে উপাদান সমূহ বিদ্যমান আছে তা ব্যবহার করা যেতে পারে।

মহান চিন্তক ক্রপতকিন বলেছিলেন, ইংল্যান্ডকে উদাহরন হিসাবে গ্রহন করা যায়, সেখানে তিনটি বিশাল আন্দোলন হয়েছে। সেই বিপ্লবী আন্দোলনের সময়ে শ্রমিক শ্রেনীর লোকদের এবং সামগ্রীক সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার বেহাল দশা হয়ে পড়েছিলোঃ ট্রেড ইউনিয়নবাদ, সমবায় আন্দোলন, এবং নগর সমাজবাদের আন্দোলন তিব্ররূপ ধারন করেছিলো; সেই আন্দোলনের সময়ে তাদের একটি নির্দিস্ট লক্ষ্য স্থির করা ছিলো তারা এক যোগে কাজ ও করেছিলো, একেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর ছিলো সকলেই। শ্রমিক শ্রেনীকে ও এটা বুঝতে হবে যে মানুষের সামগ্রীক স্বাধীকারের বিষয়টির জন্য কাজ করা কেবল তাদেরই দায়িত্ব নয়। কিন্তু সেই স্বাধীকার তখনই সম্ভব যখন সাধারন জনগণ রাজনৈতিবিদদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে কাজ না করে শ্রমিকদের তৈরী সংগঠনে নিজেদের যুক্ত না করবেন।

সর্বোপরি, তাদের এই প্রচেষ্টাগুলি জাতীয় রাস্ট্রের স্বার্থের সাথে যুক্ত করা উচিত নয়, দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ দেশে এই ঘটনা ঘটেছে। দুনিয়ার সকল শ্রমিক নিজেদের স্বার্থে নিজেরা কাজ করে যাবেন। নিজের স্বার্থে লড়াই করবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা কেবল রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষের বিরুদ্বেই লড়বেন। বরং সামগ্রীক পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য নিরন্তর চেস্টায় লিপ্ত থাকবেন। শ্রমিক শ্রেনী ও ট্রেড ইউনিয়নের সম্মিলিত চেস্টায় সকলেই সমাজবাদি দলের পক্ষে লড়াই করবেন। জার্মানীতে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ দরিদ্র শ্রমিকদের দল সমূহে গুরত্ব দেয়নি। তারা শ্রমিকদের পরিবর্তে ধনীক শ্রেনীর আড্ডার টেবিল বেশী পছন্দ করত। যেখানে যেখানে পারস্পরিক সহযোগীতা করা দরকার ছিলো সেখানে তা পরিলক্ষিত হয়নি।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে বুর্জোয়া শ্রেনীর লোকেরে কিছু শ্রমিকদেরকে কতিপয় ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। তারা দেখাতে চায় অন্যদেশের শ্রমিকের তুলনায় তাদের দেশের শ্রমিক শ্রেনী সুখি জীবন যাপন করছেন। তবে তার বিনিয়ে ময়ে বুর্জোয়া শ্রেনী তাদের স্বাদীনতা কেড়ে নেয় আর সাথে সাথে অন্যদেশে লোকের উপর বেড়ে যায় শোষনের মাত্রা। ইংল্যান্ড, ফ্র্যান্স,হল্যান্ড ইত্যাদি দেশের শ্রমিকদেরে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে বুর্জোয়া দেশ সমূহ তাদের কলোনি ও অন্যান্য দেশের শ্রমিকের উপর শোষণের পরিমান বৃদ্বি করে ফেলে; তবে এই পরস্থিতি বেশীদিন ঠিকে না। এক সময় জনগণ বুঝতে পারে এবং জেগে উঠে এবং তারা ন্যায্য পাওনার জন্য দাবী জানায়। সাম্প্রতিক কালে এশিয়ার শ্রমিকদের মাঝে ও সেই প্রবনতা বেড়ে চলেছে। কোন কোন সময় স্বল্প সুবিধা মানুষের সামনে বিশাল সুযোগ এনে দেয়। উচ্চ বেতন ভাতাদি বাজারে পন্য দাম বৃদ্বি করে দেয়। কিন্তু একেই সময়ে তাদের অন্যদেশের ভাই বোনেরা সিমান্তের অপর পাড়ে নিম্ন মানের জীবন যাপন করেন।

এই ধরনে পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সামনে নয়া দিগন্তের উন্মোচন ঘটায়। যা আন্তর্জাতিক সংগঠনের কংগ্রেসে উত্থাপিত হতে পাড়ে। দেশে দেশে শ্রমিকে শ্রমিকে স্বাধীনতা ও মজুরীর ব্যবধান বাড়তেই থাকে। ফলে শ্রমিকে পারস্পরিক বন্দ্বন বা ঐক্য অনেক ক্ষেত্রে শিতিল হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংগঠন সমূহের উদ্যোগ শ্রমিক শ্রেনী বুর্জোয়া শ্রেনীর বিরুদ্বে লড়াই করে সঞ্চালিত করে থাকে। শ্রমিক শ্রেনী তখন মালিক পক্ষের বিরুদ্বে লড়াই সংগ্রামে ন্যায় প্রতিস্টায় এগিয়ে এসে শ্রমিক ও অন্যান্য সাধারন মানুষকে যক্ত করে সামাজিক বিপ্লবের পথকে সুঘম করে দেয়। কিন্ত জার্মান সমাজনাদি প্রেস বিশ্ব যুদ্বের কালে অন্য দেশের ভূমিক দখলে নেবার আহবান জানায়। আর এর পেছনে মুল কারন ছিলো শ্রমিক দল বা পার্টি সমূহ রাজনৈতিক দলের লেজুরে পরিনত হয়েছিলো। এই বিকৃতিটি আরো অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিলো। আসল কথা হল শ্রমিক শ্রেনী যখন বুঝবে যে সক্ল দেশে সকল স্থানে সকল কালে তাদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন তখনই কেবল তারা এক হয়ে কাজ করতে সক্ষম হবেন। যা শ্রমিক শ্রেনীর আন্তর্জাতিকের ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে।

ইতিহাসের প্রতিটি সময়েই তার সুনির্দিস্ট সমস্যা দেখা দেয় এবং তা সমাধানের জন্য বিশেষ কিছু পদ্বতি ও অনুসরন করতে হয়। আজ আমাদের সময়ে বড় সমস্যা হলো মানুষকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার সমস্যা। এখন রাজনৈতিক বিপ্লবের সময় নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নাগপাশ থেকে মানুষকে মুক্ত করার সময় এসেছে। এখন প্রতিনিয়ত এটা প্রতিয়মান হচ্ছে যে, পুঁজিবাদী বুর্জোয়া গণতন্ত্র মানুষের চাহিদা মেটাতে ব্যার্থ হয়ে নিজেরাই ফ্যাসিবাদে রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমাজবাদ বুর্জোয়া রাজনীতির শুকনো নদিতে সাঁতার কাটতে চাইছে। এরা এখন মানুষকে সত্যিকার সমাজবাদি শিক্ষা না দিয়ে ভূয়া সংস্কারবাদি পথে হাঁটছে। কিন্তু পুঁজিবাদের উন্নয়ন, আধুনিক বড় বড় রাষ্ট্র আমাদের জন্য নয়া পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, সেখানে আমরা সকল শক্তি নিয়োজিত করে একটি সার্বজনীন মহা বিপ্লবের জন্য কাজ করছি। বিগত বিশ্ব যুদ্বের সময়কার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এখনো অব্যাহত আছে, যা সকল মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে বিনাশ করে চলছে। আর সেই জন্যই আজ আমাদের একান্ত চেষ্টা যে, আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে আমাদের নতুন করে সমাজবাদের ভিত্তিতিতে গড়ে তুলা। তবে কেবল উৎপাদনকারীগনই এই কাজ করতে সত্যি সক্ষম, কেননা তারাই হলো সমাজে মূল্য সৃজনকারী শক্তি। যারা সকল কিছুতে নতুনত্ব আনতে পারেন। তাদের কাজ হলো শ্রমকে অর্থনৈতিক শোষন মুক্ত করা, সকল সামাজিক প্রতিস্টান সমূহকে রাজনীতির প্রভাব থেকে আলাদা করা, সমাজে নারী পুরুষ সহ সকল মানুষের মাঝে সহযোগীতামূলক শ্রম পরিবেশ সৃজন করা যারা কেবল সামাজিক স্বার্থে কাজ করবেন। একটি কর্মময় মানব সমাজ গড়ে তুলার জন্য শহরে, নগরে ও গ্রামে গঞ্জে সকলে মিলে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এক যোগে কাজ করে যেতে হবে।

পঞ্চম অধ্যায়

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের পদ্বতি

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের বিরুদ্বে অভিযোগ তুলা হয় যে, এটার কোন রাজনৈতিক কাঠামো নেই, ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের ও আগ্রহ নেই, এটা কেবল অর্থনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে নিয়োজিত থাকতে চায়। এই ধরনের অভিযোগ আসে মুলত সেই সকল লোকদের নিকট থেকে যারা আমাদের আদর্শ সম্পর্কে সাম্যক জ্ঞান রাখেন না বা ইচ্ছাকৃত ভাবে আমাদের বক্তব্যকে বিকৃত করে মানুষের সামনে হাজির করেন। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের সংগ্রাম প্রচলিত শ্রমিক দল সমূহের মত নয়, এটার কাজের নীতি-কৌশল ও পদ্বতী একরকমের নয়, এমন কি লক্ষ্য ও ভিন্ন। এটার আসল লক্ষ্যই হলো এমন একটি সমাজের ভিত্তি স্থাপন করা যেখানে মানুষের উপর মানুষের কোন প্রকার প্রভূত্ব বিরাজ করবে না।

এটার আসল উদ্দেশ্য হলো, এখন রাষ্ট্রীয় শাসনের নামে যে সকল কার্যক্রম করা হয় তা বন্দ্ব করা, সমাজকে সত্যিকার স্বাধীন ভাবে কর্ম সম্পাদনের পরিবেশ সৃজন করে দেয়া। আধুনিক সমাজে একটি শ্রমিক দল যে সকল কাজ করে এনার্কো- সিন্ডিক্যালিজম সম্পূর্নভাবে এর বিপরীত কাজ করছে, শ্রমিক দল রাজনৈতিক ক্ষমতাবলয় সৃজন করতে ব্যাস্ত, অর্থনৈতিক-সামাজিক জীবনে নিজেদের প্রতিপত্তি শক্ত করার জন্য কাজ করছেন, পুঁজিবাদী সমাজের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে। অথচ এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম সম্পূর্ন ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে সত্যিকার সমাজবাদ কায়েম করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্পর্কে এবং প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামো সম্পর্কে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের দৃষ্টিভঙ্গী হলো এই গুলো পুঁজিবাদী শোষণ প্রক্রিয়ারই নামান্তর। এটা সামাজিক শোষণ ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সম্পূর্ন ওয়াকিব হাল। কিন্ত এটার লক্ষ্য হলো প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিলয় সাধন করে সমাজবাদি ব্যবস্থার প্রবর্তন করা। এনার্কো সিন্ডিক্যালিস্ট গন এক মুহুর্তের জন্য ও ভুলে যেতে চান না যে, বর্তমান সমাজ কাঠামো সম্পূর্ণভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফল, এটা মুনাফার ভিত্তিতে পরিচালিত। উৎপাদক ও পন্য সৃজনকারী শ্রেনী সর্বদা শোষিত হয় যেখানে। তার বদল না করে উৎপাদক শ্রেনীর মুক্তির আশা করে কোন লাভ নেই।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম চায় রাষ্ট্র থেকে উদ্ভুত সকল প্রকার রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্বে লড়াই করে তার অপসারণ করতে। এটা বিশ্বাস করে রাষ্ট্র হলো পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একচাটিয়াবাদের ফলাফল, সামাজিক শ্রেনী বিন্যাস হয়েছে সামাজিক কারনেই, রাজনৈতিক শক্তি শ্রেনী ঠিকিয়ে রাখার জন্য ও নিপিড়ন জিয়ে রাখার জন্য রাজনীতি একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে শোষণ হলো রাজনীতির একটি সুরক্ষা মূলক কাজ, রাষ্ট্র বিলুপ্ত করে জনগণের স্বেচ্ছাকৃত চুক্তির মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করলে, সামাজিক রাজনৈতিক অধিকার খুব সহজেই সুরক্ষিত হতে পারে। এটা লংগীত হবার মত কোন পরিবেশই বিরাজ করবে না।

একজন শ্রমিক তার সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে যেমন উদাসিন থাকতে পারেন না, তেমনি রাজনৈতিক অবস্থা ও ভূলে থাকতে পারেন না। সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার জন্য, দৈনিন্দিন রুটি রুজির জন্য তাকে লড়াই করতেই হয়, সামাজিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য তাকে সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। তাই, এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের কথা হলো, সকল সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে আগ্রহী হবার খুব দরকার নেই। আমরা স্পেনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে সি এন টির বীরোচিত ভূমিকা দেখেছি। সম্ভবত এটা দুনিয়ার সামনে একটি বড় উদাহরন হয়ে আছে।

রাজনৈতিক আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু রাস্ট্রের আইন সভা বা অন্য কোন বিভাগ হতে পারেনা, তবে তা হতে পারে সাধারন জনগনের মাঝে আদর্শ ভিত্তি বিনির্মান। রাজনৈতিক অধিকার সত্যিকার অর্থে পার্লাম্যান্টে জন্মে না; তা জন্মে এর বাইরে জনগণের মধ্যে। এমনকি তাদের প্রনিত আইন ও জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারেনা। নিয়োগ কর্তাগন সকল সময়ই তাদের সুবিধামত আইন রদবদল করে থাকে যখন তখন। সেই সময় গুলোতে শ্রমিক দল গুলোতে কোন না কোন প্রকারের দূর্বলতা প্রকাশ পায়। ফলে সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারেনা। সরকার গুলি যখনই বুঝতে পারে যে জনগণের ভেতর থেকে কোন প্রকার প্রতিরোধ হবে না তখন তারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠে বা ইচ্ছেমত আইন ও বিধি বিধান প্রনয়ন করে থাকে। আর তখনই শৃংখলিত হয়ে পড়ে মানুষের স্বাধীনতা। এমন কি আমাদের দেশ সমূহে গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ও হরন করা হয়। সমাবেশের স্বাধীনতা, সংক্ষুব্ধ হবার অধিকার সঙ্কুচিত করে ফেলে।

আইন শৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে পরিবেশ পরিস্থিতিকে কঠোর নিয়ন্ত্রনে রেখে মানুষের স্বাভাবিক আচরনকে আইনের নামে অবদমন করা হয়। প্রকৃত পক্ষে রাজনৈতিক অধিকার তো থাকেই না, কেননা এই গুলি থাকে কেবল মাত্র কাগজে কলমে। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে মানুষের রক্ত মাংশে স্বাধীকারের বীজ নিহিত আছে, তবে যখন তাদেরকে সেই বিষয়ে উজ্জিবীত করা হয় তখন অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রতিরোধ হয় সহিংস। কোথাও যদি উজ্জিবীত হবার মত পরিস্থিতি না করা হয় তবে এরা প্ল্যাটনিক মানুষের মত গোলামীর জিঞ্জির ছিড়তে পারেনা। মানুষ একে অন্যকে সম্মান করবেন তবে এর সাথে সাথে নিজের সম্মান- মর্যাদা রক্ষার শিক্ষাও থাকা দরকার। এটা কেবল ব্যাক্তি জীবনে নয়, এটা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অনুসরন করা দরকার।

বর্তমান সময় কালে আমরা কম বেশী যে সকল রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা সমূহ পেয়ে থাকি তা কিন্তু রাস্ট্রের স্বেচ্ছাকৃত শুভ কামনার ফল নয়, তা হলো জনগণের আদায় করা অধিকার সমূহ। সরকার তার ক্ষমতা বলে নানা স্তরে এমন কিছু ব্যাক্তি বা প্রতিস্টান নিয়োগ করে রাখে যাদের কাজই হলো জনগণের আকাংখার প্রতিরোধ করা। তাই কখনো কখনো এমন অবস্থার তৈরী হয় যখন গনমানুষের ব্যাপক ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। এমন কি প্রয়োজন হয়ে পড়ে অভ্যুত্থানের। তাই দরকার হল কম পক্ষে বিগত তিন শত বছরের ইতিহাস অধ্যয়নের। যাতে বর্তমানকে সঠিক ভাবে বুঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন এবং অন্যান্য দেশের শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের অধিকার আদায় করার জন্য তাদের সরকারকে বাধ্য করার জন্য কঠোর সংগ্রাম করেছিলেন।

ফ্রান্সে ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। যদি শ্রমিকদের অবিরাম সংগ্রাম না চলত তবে হয়ত আজও ফরাসি দেশের মানুষের জন্য কোন অধিকার কায়েম হত না। শ্রমিকগন ডাইরেক্ট একশন কর্মসূচীর মাধ্যমেই পার্লামেন্টের সাথে বুঝা পড়ায় লিপ্ত হয়, ফলে সরকার বাধ্য হয় শ্রমিকদের অধিকার সহ ট্রেড ইউনিয়নের স্বীকৃতি দিতে। জনগনের জন্য সরকার কি কি সিদ্বান্ত গ্রহন করেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ন নয়, বরং জনগণ কি কি আদায় করতে পেরেছেন সেটাই আসল কথা। যারা এই সত্যটি বুঝতে চায় না তারাই ইতিহাসের অন্দ্বকার গলিতে হাতড়ে মরছেন।

অবশ্য কেহ যদি লেনিনের কথাকে সহি মনে করেন যে, স্বাধীনতা হলো “বুর্জোয়া কুসংস্কার” তবে বলতে হয় শ্রমিকদের স্বাধীকার ও রাজনৈতিক অধিকারের কোন মূল্য নেই। কিন্তু আমরা অতীতের অগনিত বঞ্চিত মানুষের লড়াই সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন করে থাকি। লেনিন তার বিচক্ষণতা বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জারের পতন ঘটানোর জন্য শ্রমিক ও জনগণের প্রতি আহবান করেছিলেন। জার সরকারের শত বাঁধা সত্ত্বে ও “বুর্জোয়া কুসংস্কারের” লক্ষ্যে তিনি তার ঘোষনায় অটল ছিলেন।

তবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম শেষ বারের মত করেই শ্রমিকদেরকে সাথে নিয়ে এই ধরনের একটি কাজ করবে। শ্রমিকগন বর্জোয়া পার্লামেন্টের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে আগ্রহী নয়। কেননা তারা রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহী নয়। তারা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পার্লামেন্টারী রাজনীতি সত্যিকার ভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষন করে না। পার্লামেন্টে যারা থাকেন তারা নিয়োগকারী মুনাফা অর্জনকারী লোকদের স্বার্থে কাজ করেন। শ্রমিক সংগঠনের স্বার্থের চেয়ে মালিক পক্ষের স্বার্থ বেশী দেখেন তারা। আইন ও বিধি প্রনয়নের ক্ষেত্রে ও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

প্রচলিত রাজনীতিতে সকলের স্বার্থকে একেই ভাবে বিবেচনায় নিয়ে দল গুলো সেবা দানের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু আদতে শ্রমিকদের স্বার্থ ও মালিক পক্ষের স্বার্থ একেবারেই আলাদা বিষয়। চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শ্রমিক শ্রেনীর স্বার্থ সংরক্ষন করে না। তা শ্রমিকদেরকে শোষণ করে। শোষনকারীরা সংগঠিত ভাবে আইনী ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে শ্রমজিবী মানুষকে নিজেদের সমৃদ্বির সোপানে পরিনত করে থাকে। এমন কি এখন যে প্রকাশ্য ভোট হয় তাতে ও মালিক শ্রমিকের ব্যবধান বুঝা যায় না। সকলেই একাকার। এই পদ্বতী সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার ও শোষনকে আইনী বৈধতা দিয়ে দেয়। মানুষের উপর মানুষের দাসত্বকে দির্ঘায়িত করছে।

তবে সব থেকে গুরুত্ব পূর্ন বিষয় হলো যে, বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে শ্রমিকদের সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ গ্রহন তাদের লড়াই সংগ্রামের শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল হয়ে পড়ে, অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবস্থায় তাদের বিরুধীদের নির্মমতার শিকার হতে হয়। সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে শ্রমিকদের অধীকারের চিটেফোট ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এটা অনেক সময় শ্রমিক শ্রেনীর স্বার্থ সংরক্ষনের অন্তরায় হয়ে দেখা দিতে পারে। এই প্রসঙ্গে উদাহরন হিসাবে উল্লেখ্য যে, জার্মানীর বড় শহর প্রুশিয়াতে হিটালারের আগে সামাজিক গণতন্ত্রী দল হিসাবে দেশের বেশ কিছু মন্ত্রনালয় নিয়ন্ত্রন করেছিলো।

হেরন ফন পেইন, হিন্দেনবার্গের রিচস্কানজলারের নিয়োগের পর, জমি সংবিধান লঙ্ঘন করে প্রুশীয় মন্ত্রণালয়কে কেবলমাত্র একজন লেফটেন্যান্ট এবং এক ডজন সৈন্যসহ ভর্তি করতে পারত। তখন সাম্যবাদী পার্টি তার চুক্তিগত অসহায়ত্বের কারণে সংবিধানের এই উন্মুক্ত লঙ্ঘনের দায়ে কিছুই করতে পারে না, তখন রাইচ হাইকোর্টের আপীলের ব্যপারে ওপেন প্রতিরোধের জন্য অভ্যুত্থানকারীকে সহায়তা করার পরিবর্তে বলত যে তারা ভয় পায়। তখন থেকে কিছুই তারা আর করতে পারে না। এটা সত্য যে, প্যাপেনের অভ্যুত্থানটি মূলত রাস্তার পাশে তৃতীয় রেইচ পর্যন্ত যাত্রা শুরু করেছিল।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট সকল সময়েই রাজনৈতিক সংগ্রামকে এড়িয়ে চলে, তবে এই কার্যক্রম ও তাদের নিজস্ব ধারার রাজনীতিরই অংশ, তাদের কর্মসূচি ডাইরেক্ট একশন হিসাবে পরিচালিত হয়, শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লড়াই সংগ্রামকে সকল সময়েই প্রধান্য দেয়া হয়ে থাকে। শ্রমজীবী মানুষ তাদের মজুরী ভাতা বৃদ্বির আন্দোলনেই দেখতে পান যে পুলিশ, সেনাবাহিনী মালিক পক্ষের পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদেরকে ধমকী হুমকী দিয়ে থাকে এবং মালিক ও ধনীক শ্রেনীর স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করে থাকে।

আর সেই কারনেই তারা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ গ্রহনে অনিহা দেখায়। রাজনীতি তাদের জীবনের প্রতিটি ঘটনা প্রবাহকে কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত করে ছাড়ে। এই দিক টি বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রাম যেমন সাধারন ধর্মঘট ও একটি রাজনৈতিক কার্যক্রম। তা ও অনেক ক্ষেত্রে সংসদীয় রাজনীতির অংশে পরিনত হয়ে থাকে। এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের লড়াই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে আপোষহীন ভাবে পরিচালিত হয়, সেনা শাসন ও মানুষের উপর নিপীড়নে বিরুদ্বের স্বাধীন সমাজবাদি ও এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। এই সংগ্রামের জন্য তাদের ত্যাগ তিথিক্ষার ও কোন প্রকার কমতি নেই।

সত্য ঘটনা হলো যখনই সমাজবাদি দল সমূহ কোন রাজনৈতিক সংস্কারের পথে এগোতে চায় তখনই তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্বির জন্য অর্থনৈতিক লড়াকু শক্তি শমিক শ্রেনীকে সঙ্গে নেবার ফন্দি তৈরী করে। বেলজিয়াম, সুইডেন ও অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক ধর্মঘট পালনের জন্য আমরা এর জলন্ত উদাহরন লক্ষ্য করেছি। ১৯০৫ সালে আমরা রাশিয়ায় একেই চিত্র দেখেছি, জার সরকারকে সাংবিধানিক আইনে স্বাক্ষর করাতে শ্রমিকদের সহযোগিতা নেয়া হয়েছিলো। রাশিয়ার অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও শক্তি সমূহ দশকের পর দশক চেষ্টা করে ও যা পারে নাই। অর্থনৈতিক শক্তির একটি উদ্যোগই তা খুব সহজেই সফল করে দিল।

রাজনৈতিক দল গুলো প্রায়স দেখা যায় নিজেদের ক্ষমতার উপর তেমন নির্ভর করতে পারে না বরং তারা অর্থনৈতিক শক্তি শ্রমিক শ্রেনীর সংগঠন সমূহের উপর নির্ভরশীল থাকে। এটা এখন এক প্রকার স্বীকৃত বিষয় যে, রাজনৈতিক দল সমূহ বিপ্লবী ইউনিয়নবাদের দিকে ঝুঁকছে, তারা নিজেরা ও সমাজবাদি শিক্ষা নিচ্ছেন, এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করা্র কলা কৌশল আত্মস্থ করে নিচ্ছেন। তাদের রনকৌশল হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের জন্য সরাসরি লড়াই করা।

আর সত্যিকার কার্যকরী পথই হলো এটি, যখনই ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন কারী সময় আসে তখন এই ধরনে পদক্ষেপই কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে। ইদানিং কালে বুর্জোয়ারা ও এই ধরনের আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তারা ও তাদের প্রভাব বলয় কায়েমের জন্য নানা জায়গায় কর না দেয়া, অসহযোগীতা, বিপ্লব শব্দ ব্যবহার করছে। আজকের তাদের প্রতিনিধিরা তাদের বাপের গল্প ভুলে গিয়েছে, এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে সংগ্রামরত শ্রমিকদেরকে হত্যা করেছে। তাই আইন কখনো কখনো কোন শ্রেণীকে তার উপর চাপানো জোয়াল কেড়ে নেবার অনুমতি দিতেই পারে।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের ডাইরেক্ট একশন কর্মসূচি আসলে তাদের বিরুদ্বে চলমান শোষন নিপিড়নের প্রতিবাদের প্রাথমিক পদক্ষেপ। এছাড়া ও তারা আরো যে সকল কার্যক্রম অনুসরন করে থাকেন তা হলোঃ সাধারন ধর্মঘট, কর্ম ক্ষেত্রের নানা স্থরে প্রয়োজনীয় কর্ম বিরতি পালন করা; কর্ম ক্ষেত্র বর্জন; অনেক ভাবে সাবুটাজ করা, সেনা শাসনের বিরুদ্বে প্রচার, নানা শ্রেনী পেশার মানুষকে সমালোচনায় মুখর করে তুলার ব্যবস্থা করা – এইরূপ কাজ স্পেনে ও করা হয়েছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলে জীবন রক্ষার্থে অস্ত্র ধারন ইত্যাদি আন্দোলনেরই অংশ।

উক্ত কার্যক্রম গুলোর মধ্যে ধর্মঘট হলো সংগঠিত ভাবে কাজ করতে অস্বীকার করা, এটা খুবই সহজ কর্মসূচি। এটা শিল্প ব্যবস্থায় ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে তা সামন্ত ব্যবস্থায় ও ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধরনের কর্মসূচি শ্রমিক মজুরদের জন্য অনুসরন করা ও সহজতর, শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের জন্য নিয়োগ কর্তাদের সাথে দরকষাকষির জন্য এমন কি তাদের উচ্ছেদের জন্য এই পন্থা অতি কার্যকরী হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই কর্মসূচি শ্রমিক শ্রেনীর জন্য তাৎক্ষনিক কোন ফলাফল দেয় না। তবে এটা তাদেরকে শিক্ষা দেয় এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সমাজ বদলের পথ প্রসস্ত করতে হবে।

অর্থনৈতিক দাবী আদায়ের সংগ্রামরত সংগঠন সমূহ তাদের কাজের ভেতর দিয়ে দৈনিক মজুরী বৃদ্বির জন্য যে লড়াই করা তার দ্বারা এটা ও পরিস্কার করা হয় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের সমস্যার সমাধান হয় না। যদি এই লড়াই না থাকে তবে শ্রমিকদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে এটা স্পষ্ট সত্য যে, কেবল মজুরী লড়াই দিয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু এটা রাজনৈতিক প্রশিক্ষনের জন্য অতি জরুরী বিষয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য এই ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা খুবই কার্যকরী হয়। শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা জীবীকার জন্য নিজেদের হাত ও ব্রেইন মালিক পক্ষের নিকট বিক্রি করে দেয়। কিন্তু সারা জীবন পরিশ্রম করে ও জীবনের জন্য বা পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ব্যবস্থা করতে পারেন না। আর মানুষের জীবনের চাহিদা সকল সময়ে একরকম থাকে না, তা জীবনের বাকে বাকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তীত হতে থাকে।

আমরা এখানে শ্রমিকদের লড়াই সংগ্রামের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ে কথা বলব। অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া পন্য পয়দাকারী মানুষের কেবল জীবন যাত্রার মানই উন্নত করে না তা তাদের জন্য এক মহা বিদ্যালয়ের কাজ করে থাকে, তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। লড়াই সংগ্রামের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের নিজ নিজ সংঘের গতিশীলতা বৃদ্বি করে, নিজেদের মধ্যে ইতিবাচক বুঝা পড়া বাড়ায়, এবং তাদের বুদ্বি বৃত্তিক দৃষ্টি ভঙ্গী সম্প্রসারিত করে থাকে। তাদের ক্রমগাত বুদ্বিবৃত্তিক চর্চার ফলে ব্যাক্তিগত জীবনে ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, জীবনে নানা বিষয়ের চাহিদা স্পষ্ট হয়ে উঠে। সুনির্দিস্ট ভাবে বললে বলতে হয় যে তাদের মধ্যে তাদের সংগ্রামী জীবনের কারনে উন্নত চিন্তার স্ফুরন দেখা যায়।

মানুষের বুদ্বি বৃত্তিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে উন্নত জীবন মানের সাথে তাদেরকে পরিচিত করাতে হয়, একটি উন্নত ভাবনাই মানুষকে কর্মে দিনে দিনে সক্ষম করে তুলে। প্রাথমিক ভাবে চিন্তা ভাবনায় বুদ্বি বৃত্তিকভাবে উন্নত জীবন ভাবনা না থাকলে পরিবর্তনের কোন প্রশ্নই উঠেনা। সামাজিক ভাবে উচু স্তরের ভোগবাদি সংস্কৃতির কারনে, মানুষ সকল সময়েই দুঃখ কস্ট দারিদ্রতাকে ভয় পায়। অথচ পন্য পয়দাকারী লোকেরা যুগে যুগে লড়াই সংগ্রাম করেই তাদের জীবন যাত্রার পরিবর্তন সাধন করেছেন। তা না হলে হয়ত সেই পরিবর্তন কোন দিনই সম্ভব হত না। তাদের অঙ্গীকারের কারনেই পন্য পয়দাকারী হিসাবে তাদের বুদ্বি বৃত্তিক বিকাশ হয়েছে। পন্য পয়দাকারীদের এই আকাঙ্ক্ষা গুলো দেখে মালিক পক্ষের মধ্যে এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস জন্ম নেয়। পুঁজিবাদীরা একটি শ্রেনী, তাদের সম্পর্কে স্প্যানিশ মন্ত্রী, জোয়ান ব্রাভো মুরিলুর একটি উক্তি আজো বিখ্যাত হয়ে আছেঃ পন্য পয়দাকারীদের মধ্যে কি এমন কেউ নেই যে চিন্তা করতে পারে; তারা কি কেবল পশুর মত খেটেই যাবে?

অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আরো গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় অর্জন করা যায় তা হলো পন্য পয়দা কারীদের মধ্যে পারস্পারিক সংহতি, এই বিষয়টি প্রচলিত ধারনার দল ও জোটের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির হয়, এটা এক ধরনের সামাজিক শ্রেনী হিসাবে গড়ে উঠে। আন্দোলনকারীদের এক প্রকার সম্মিলিত সহযোগীতার পরিবেশ সৃজন হয়, তাদের মাঝে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা সাধনা করার জীবনী শক্তির বিকাশ ঘটে। এই বিকাশের ফলে সকলের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য একটি ঐক্যমতে সূচনা হয়।

পন্য পয়দাকারীদের প্রাকৃতিক সংহতি ও আন্দোলন একটি সামাজিক চরিত্র দান করে, এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম অনুসারী লোকেরা সেই ধারার বিকাশ ঘটাতে চায়। তাই মানুষের মাঝে সহানুভূতি সৃষ্টি হতে পারে এমন সাধারন ধর্মঘট পালন করতে চায়। এই ধারার একটি মডেল স্পেনে সৃজন করা হয়েছিলো। এই রকমের অর্থনৈতিক লড়াই সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেনীকে স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে সয়াহতা করে।

আজ, যখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কার্টেল এবং ট্রাস্ট গঠনের দ্বারা বেসরকারী পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদে আরো বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন যুদ্ধের এই রূপটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একমাত্র শ্রমিক দ্বারা এবং কেবল শ্রমিকরাই সফল হতে পারে। শিল্প পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের কারণে সহানুভূতিশীল ধর্মঘট শ্রমিকদের জন্য একটি অভাবনীয় ঘটনা হয়ে ওঠে। ঠিক যেমন তাদের কার্টেল এবং প্রতিরক্ষামূলক সংস্থার নিয়োগকর্তারা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি বৃহত্তর ভিত্তি তৈরি করছে, তেমনি কর্মীদের অবশ্যই তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থার প্রয়োজনীয় জাঁকজমক দ্বারা নিজেদের জন্য পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

সময়ের চাহিদাগুলি মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত কর্ম সঞ্চালনের দরকার। সীমাবদ্ধ ধর্মঘট আজকে তার মূল গুরুত্ব আরো হ্রাস করা হয়েছে, এমনকি এটি এখন পুরোপুরি অদৃশ্য নয়। রাজধানী এবং পল্লীর শ্রমিকের মধ্যে আধুনিক অর্থনৈতিক সংগ্রামে সমগ্র শিল্প কেন্দ্র জড়িত হয় বড় ধর্মঘটে। এমনকি সমাজতান্ত্রিক ধারনাগুলি দ্বারা এখনও পুরানো নৈপুণ্য সংগঠনের শ্রমিকরা ধরে রেখে এটিকে বিবেচনা করেছেন যে, পুরোনো পদ্ধতির বিপরীতে আমেরিকার শিল্পকেন্দ্রগুলির দ্রুত বর্ধিতকরণের দ্বারা যা কিছুই হোক না কেন তা তারা মোকাবিলা করতে পারবেন।

সংঘবদ্ব শ্রমিকগন ডাইরেক্ট একশন কার্যক্রম পরিচালনা করে সাধারন ধর্মঘটের মাধ্যমে সকল প্রকার উৎপাদন ক্ষেত্রের কাজ বন্দ্ব করে দেয়ার সাথে সাথে প্রলেতারিয়েতের জোটবদ্ব প্রতিরোধের ও প্রদর্শন করে থাকে। শ্রমিক শ্রেনীর জন্য এই কর্মসূচিটি খুবই কার্যকরী অস্ত্র হিসাবে পরিগনিত হয়, তারা এই অস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদেরকে একটি সামাজিক বিশেষ শক্তি হিসাবে প্রমান করতে পারেন। সাধারন ধর্মঘট একটি অতি গুরুত্বপূর্ন ও ক্ষমতাশালী অস্ত্র যা শ্রমিকদেরকে সামাজিক ক্ষমতায়নে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে থাকে। ১৮৯২ সালে মার্সেলাইসে ফ্রান্স কংগ্রেসের পর ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ এবং সিজিটি ব্যাপক ভাবে ধর্মঘটের মত কাজে হাত দেয়।

সেই সময়ে জার্মানীর শ্রমিক দল সমূহ এবং অন্যান্য দেশের সমাজবাদি পার্টি গুলো এই ধরনের কার্যক্রমকে ইউটোপীয় বলে উড়িয়ে দেয়। তারা সাধারন ধর্মঘটকে সাধারন পাগলামী বলে ও প্রাচার করে। আর এই সকল কিছুর পিছনে ছিলো জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেট চক্র। তবে সেই সাধারন ধর্মঘটের মত কাজের প্রভাব বেশ কিছু দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে ছিলো, যেমন- স্পেন, বেলজিয়াম, ইতালী, হল্যান্ড, রাশিয়া ইত্যাদি দেশে। সেই সময়ে পরিস্কার করে দেখিয়ে দেয়া হয়েছিলো যে, এই ধরনের সর্বপ্লাবী কার্যক্রম কোন কল্পনা বিলাশ নয়। আদতে এই বিপ্লবী কর্মসূচী মানুষের মুক্তির লড়াইকে তড়ান্বিত করে।

সাধারন ধর্মঘট এমন কোন কর্মসূচি নয় যা যখন তখন প্রয়োগ করা যাবে। এই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে হলে সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে, যখন সমাজের বেশীর ভাগ মানুষ এই ধরনের কর্মসূচী প্রতাশ্যা করবেন তখনই ধর্মঘট ডাকার ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। একটি হাস্যকর কথা চালু আছে যে, এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন প্রায়স সাধারন ধর্মঘট নাকি ডেকে বসে তাদের নিকট নাকি একটি কর্মসূচি আছে। সমাজবাদি সমাজ কায়েমের জন্য নাকি তারা তাড়াহুড়া করেন আর দুষ্ট মন নিয়ে যেখানে সেখানে আক্রমন করে বসে। আদতে যারা এসব বলে প্রচার করেন – ওরাই হলো সমাজে দুষ্ট চক্র।

একটি সাধারন ধর্মঘট অনেক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হয়। সামাজিক সঞ্চালন ও সমর্থন আদায়ের সর্ব শেষ পদক্ষেপ হিসাবে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। উদাহরন হিসাবে ১৯০২ সালে বার্সেলুনার ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯০৩ সালে বিলবাওয়ে অক্টোবর মাসে খনি শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত করার জন্য শ্রমিকগন প্রথমে দরকষাকষি করেন, নিয়োগ কর্তাদেরকে দাবী মানার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা করেন। শ্রমিকগ তাদের সমস্যা গুলো সাধারন সমস্যা হিসাবে আলোচনার মধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেন। তারা কিন্তু প্রথমেই ধর্মঘট ডেকে বসেন নাই। ১৯৮৬ সালে ও আমেরিকায় শ্রমিকগন আট ঘন্টা কাজের দাবীতে নিয়োগ কর্তাদের সাথে আলোচনায় বসেছিলো। ১৯২৬ সালে ইংরেজ শ্রমিকগন ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু মালিক পক্ষের লোকেরা শ্রমিকদের বেতন কর্তন করার জন্য ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে ধর্মঘটের দিকে শ্রমিকদের ঠেলে দেয়। যা শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ছিলো না।

তবে সাধারন ধর্মঘটের একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব ও থাকে, উদাহরন হিসাবে ১৯০৪ সালের স্পেনের শ্রমিকদের সংগ্রাম, যাদের লক্ষ্য ছিলো রাজবন্দীদের মুক্তি, আবার ১৯০৯ সালে কাতালুনিয়ায় জুলাই মাসে যে ধর্মঘট হয় তার লক্ষ্য ছিলো মরোক্কোর সাথে যুদ্ব বন্দ্বকরা। ১৯২০ সালে জার্মানীর শ্রমিকদের ধর্মঘটের লক্ষ্য ছিলো সরকারে সেনা তোষননীতির বিরদ্বে, অন্যদিকে বেলজিয়ামে ধর্মঘট হয় ১৯০৩ সালে, সুইডেনে ১৯০৯ সালে ধর্মঘট করেন শ্রমিকগন বিশ্ব ব্যাপি মানুষের দুর্দশা নিবারনের জন্য।

১৯০৫ সালে রাশিয়ায় ধর্মঘট হয় একটি সাংবিধানিক গ্যারান্টির জন্য। জুলাই, ১৯৩৬ সালে স্পেনে ব্যাপক ভিত্তিক ধর্মঘট পালিত হয় ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্বে। সেই ধর্মঘট ছিলো একটি “সামাজিক সাধারন ধর্মঘট”। এই ধর্মঘটের পথ ধরে সশস্ত্র লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় সেখানে। তাদের আরও লক্ষ্য ছিলো পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বিলয় আর অর্থনৈতিক জীবন যাত্রার পুর্বিন্যাস সাধন করা।

সাধারন ধর্মঘটের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। এটা সকল প্রকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়, এবং সমাজের মুল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। এছাড়া, এই কর্মসূচি শ্রমিকদেরকে বাস্তব সম্মত কার্যক্রম গ্রহন করতে দক্ষ করে গড়ে তুলে, এমন কি দেশের সকল স্থরের নাগরিকগন যারা কোন দিন লড়াই সংগ্রামে অংশ গ্রহন করেন নাই তারা ও আন্দোলিত হন। যে সকল আরখানায় শ্রমিকগন সুসংঘটিত তারা সেখান কার সকল আর্থিক কার্যক্রম নিথর করে দিতে পারেন, যদি কারখানায় কয়লা না আসে, বিদ্যুৎ বন্দ্ব থাকে, এবং কাচামাল সর্বরাহ না করা হয় তবে উৎপাদন বন্দ্ব।

ক্ষমতাশীন চক্র যত শক্তি নিয়েই আসুক না কেন, সংঘটিত শ্রমিকদের সামনে কিছুই করতে পারবে না। তাই শ্রমিক শ্রেনীকে সচেতন করে সাংগঠনিক ভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন করে গড়ে তুলার কোন বিকল্প নেই। একজন সমাজবাদি সাংসদ নাম তার জা জুরাস তিনি এই ধারনার সাথে একমত ছিলেন না। তিনি মনে করতেন এতে শ্রমিকদের উপর দমন পীড়ন বেড়ে যাবে, অর্থনৈতিক ভাবে ও বিপর্যয় নেমে আসবে। ফলে চলমান পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
যখন কোন সর্বপ্লাবী সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়, যেমন আজ স্পেনের সংকট সকলকে উদ্ভিগ্ন করে তুলেছে, জনগণের বিরুদ্বে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আক্রমন করা হচ্ছে, সেই সময়ে সাধারন ধর্মঘট হলো একটি চমৎকার অস্ত্র, এই পরিস্থিতিতে এর কোন বিকল্প আর কিছু নেই। এই অস্ত্র জনগণের সামগ্রীক জীবন যাত্রাকে অচল করে দেয়, সাধারনের পরিতিনিধি ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কোন বোঝাপড়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়, এমন কি তা তাদেরকে পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান ও বাড়িয়ে দেয়। এই অবস্থায় সরকার সমূহ সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে পারেনা, নানা ভাবে তখন রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সূচনা করতে পারে। তখন সরকার সৈন্যবাহিনীকে রাজধানী সহ গুরুত্বপূর্ন স্থানে সমাবেশ করে রাখার চেষ্টা করে থাকে। নিজেকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য সরকার সম্পূর্নরূপে সেনা ও পুলিশ নির্ভর হয়ে পড়ে।

একটি সর্বপ্লাবী ধর্মঘট চলা কালে সেনাবাহিনী ও নানা ভাবে সিদ্বান্তহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাদের সামনে তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয় দেশের বড় বড় গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা পাহাড়া দেয়া। শিল্প কারখানার ও যাতায়াত ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেনাবাহিনী ঠিকে থাকে তার শৃখলার উপর, তার শক্তি ভিত ঠিকে থাকে একটি নির্ধারিত কাঠামোতে। কিন্তু সেনাবাহিনী যখন তার দেশীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃঢ় চেতা দলের বিরুদ্বে লড়াই করে, এমন কি গুলি করার নির্দেশ পায়, তখন সৈনিকদের মনে একপ্রকার সংহতির সৃষ্টি হতে পারে, কেননা এরা তখন দেখতে পায় যারা তাদের বিপরীতে লড়াই সংগ্রাম করছে তারা তাদেরই বাবা, ভাই ও ভাতিজা। পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর মাঝে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে থাকে। তারা নিজেদের দেশের মানুষ হত্যা করে জীবনের মহৎ কর্মের জলাঞ্জলি দিতে চায় না। তাই তারা শয়তান প্রকৃতির রাজশক্তির পক্ষে কাজ করতে ব্যাপক ভাবে আগ্রহ হাড়িয়ে ফেলে।

শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা যখন ধর্মঘট ডাকে তখন রাজনৈতিক দল গুলোর লাফালাফি চাপা পড়ে যায়। কেননা শ্রমিকগনই হলেন শিল্প কারখানার শোষণের শিকার তাই স্বাভাবিক ভাবেই শ্রমিকদের ভূমিকা মূখ্য হয়ে উঠে। তাদের মুক্তির সংগ্রাম তাদেরকেই করতে হয়। উইলিয়াম মরিস তার “কোথাও খবর নেই” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সমাজবাদি সমাজ গড়ে তুলার জন্য নিরন্থর ধর্মঘট পালনের উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে, ক্রমে সহিংসতা চর্চা বাড়াতে হতে পারে, প্রচন্ড ঝাঁকুনি ছাড়া সমাজের ভিত্তিমূলে আঘাত করা যাবে না। আন্দ্বকার দূর করে মুক্তির সোনালী আলো জ্বালাতে হলে শহর ও গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সাফল্য ছিনিয়ে আনতেই হবে।

আধুনিক পুঁজিবাদের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা আজ দুনিয়ার যে কোন সময়ের তুলনায় আমাদের সমাজের জন্য বেশী বিপদজনক, এই পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা শ্রমিক শ্রেনীর সামনে পরিস্কার হওয়া দরকার। শ্রমিক সংগঠন গুলোর সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহনের অসারতা ও বুঝা দরকার হয়ে পড়েছে, সেই পদ্বতী বা প্রক্রিয়াটি ক্রমে নানা দেশের শ্রমিক আন্দোলনের পরিবেশকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মজুরী দাসত্বের যে জোয়াল আজ মানুষের উপর চেপে বসেছে তা থেকে রেহাই পেতে হলে পরিস্থির বদল করার কোন বিকল্প নেই।

অন্য আরও একটি লড়াই করা পদ্বতী আছে তা হলো বয়কট বা অসহযোগ। এই প্রক্রিয়াটি প্রয়োগ করা হয় উৎপাদক শ্রেনী ও ভোগ কারী বা পন্য ক্রেতাদের সমন্বয়ে। এটা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যে ক্রেতাগন শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন পন্য ক্রয় করতে আস্বীকার করবেন। তবে তা প্রয়োগ করা যাবে যে সকল প্রতিস্টান সর্বসাধারনের জন্য দৈনিন্দিন ব্যবহারের জন্য পন্য উৎপাদন করে থাকেন। এই কর্মসূচিটি একদিকে যেমন জনগণের মতামতের প্রতিফলন হয় অন্য দিকে পন্য পয়দাকারীদের প্রভাব বলয় সামাজিক ভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এটা প্রচারনা চালানোর ও বড় একটি উপায়। ইউনিয়নের এইলে লেবেলিং বা ছাপ মারা পদ্বতিটি একটি কার্যকরী পন্থা, যা ক্রেতাদের বুঝতে সুবিধা হয় কোন কোন কোম্পানী সঠিক আর কোনটি বেঠিক। এমনকি থার্ড রিচের অভিজ্ঞতা বলে যে, এই বয়কট সাধারন মানুষকে আন্দোলনে অধিক হারে সম্পৃক্ত করে দেয়। আন্তর্জাতিক ভাবে জার্মানীর পন্য বর্জন তাদেরকে বিশাল বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। তাদের ব্যবসা বানিজ্য লাটে উঠে গিয়েছিলো। ট্রেড ইউনিয়নগুলি অবিলম্বে প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মতামতকে সতর্ক করে দিয়েছিল এবং জার্মান শ্রমিক আন্দোলনের দমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল, এই প্রভাব ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিলো।

একজন উৎপাদক হিসাবে বয়কট কারী শ্রমিকগন একটি কারখানার উপর নানা ভাবে অবরোধ তৈরী করেন, সেই ক্ষেত্রে সেখানকার ব্যবস্থাপকগন সরাসরি ট্রেডইউনিয়নের বিরুদ্বে কাজ করে থাকে। বার্সেলুনা, ভ্যেলেঞ্চিয়া এবং কাদিজে যেসকল জার্মান জাহাজ মালামাল খালাস করার জন্য অপেক্ষমান ছিলো তাদের মালামাল খালাস করতে শ্রমিকগন অস্বীকার করেন। এবং তারা জাহাজের ক্যাপ্টেনকে উত্তর আফ্রিকার সমূদ্র বন্দ্বরে মালামাল নামিয়ে দিতে বাধ্য করেছিলো। যদি অন্য দেশে ট্রেড ইউনিয়নগুলি একই পদ্ধতিতে সমাধান করে তবে তারা প্লাতনিক প্রতিবাদগুলির তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি ফলাফল অর্জন করবে। যে কোনো ক্ষেত্রে বয়কট শ্রমিক শ্রেণির হাতে সবচেয়ে কার্যকর লড়াইয়ের অস্ত্র এবং শ্রমিকরা এই অস্ত্রের মাধ্যমে আরো গভীরভাবে সচেতন হয়ে ওঠে, তারা তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামে আরও ব্যাপক ভাবে সফল হয়ে উঠবেন।

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টদের নিকট এর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ন অস্ত্র আছে যা নিয়োগ কর্তাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়, তারা এটাকে চিৎকার করে বলতে থাকে এটা “বেআইনি”। এটা হলো স্যাবোটাস। বাস্তবতা হলো আমরা আসলে একটি অর্থনৈতিক লড়াইয়ে আছি। রাজনৈতিক নিপিড়ন এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরোদ্বে আমাদের লড়াই। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকগন নানা সময়ে চাপ সৃস্টিকারী কার্যক্রম গ্রহন করে থাকেন, কিন্তু সকল চেষ্টা যখন ব্যার্থ হয়ে যায় তখন বাধ্য হয়ে মরন কামড় তো দিতেই হয়। স্যাবোটাস হলো সেই পদ্বতী যা ব্যবহার করে শ্রমিকগন উৎপাদন পদ্বতীতে বাধার সৃষ্টি করে থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ কর্তা বা মালিক পক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে দেখে উদ্ভিগ্ন হয়ে উঠে। শ্রমিকগন তাদের শ্রম ঘন্টা লম্বা করে দেন। স্যাবোটাস শব্দটি ফ্রান্স ভাষা থেকে আগত। স্যাবোট মানে হলো কাঠের জুতা, অর্থাৎ কাঠের জুতা পড়ে যা-তা ভাবে আঘাত করে বিনষ্ট করে দেয়া। স্যাবোটাসের বিষয়টি যুক্ত করেই আমদানীনীতি নির্ধারন করা হয়ঃ মন্দ শ্রমের জন্য কম মজুরী। সকল নিয়োগ কর্তাই একেই নীতি অনুসরন করে থাকে। তারা তাদের পন্যের মূল্য তাদের নিজস্ব গুনের উপর ভিত্তি করেই নির্ধান করে থাকে। অন্যদিকে পন্য সৃজনকারীগন নিজেদেরকে একেই অবস্থায় দেখতে পান। তার পন্য হলো তারই শ্রম- শক্তি, যদি সেটা ভালো ও যথাযথ হয় তবে তিনি ভালো মজুরী পাবেন সেই ভাবে নিশ্বপত্তি করার চেস্টা করা হয়ে থাকে।

নিয়োগকর্তা বা মালিক পক্ষ মন্দ্ব সময়ের কালে শ্রমজীবী মানুষের উপর সুবিধা নিতে চায়, তারা শ্রম বাজারে শ্রমের মূল্য কমিয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করতে চায়। একজন শ্রমিক অবাক হন না যখন তিনি নিজেকে পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। বিপ্লবী সিন্ডিকালিজমের লক্ষ্যে ইংলিশ শ্রমিক শ্রেনীর লোকেরা বেশ আগে থেকেই এই ধরনের কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। সত্যিকার অর্থে এই ধরনের কাজ হলো ধীরে চলো নীতির পন্থা, এই বিষয়টি স্কটিশ শ্রমিকদের নিকট থেকে ইংলিশ শ্রমিকগন গ্রহন করে। তারা স্যাবোটাজের পন্থা হিসাবে এই পদ্বতীকে ব্যবহার শুরু করেন। এখন কল খারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বাধা গ্রস্থ করার জন্য শ্রমিকগন নানা ভাবেই পদ্বতী ব্যবহার করে থাকেন।

এমন কি এই শ্রম বিভাজনের যুগেও শ্রমিকগন কোন একটি ভাগে কাজ আটকে দিয়ে সামগ্রীক উৎপাদন ব্যবস্থাকে বন্দ্ব করে দিতে পারেন। এই ভাবে ফ্রান্স ও ইটালীর রেলওয়ে শ্রমিকগন এই পদ্বতী ব্যবহার করে সামগ্রীক যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিয়েছিলেন। তারা প্রচলিত যোগাযোগ আইন বলবত থাকা সত্বেও তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছোতে দেয়নি। যখনই কোন নিয়োগ কর্তা মালিক পক্ষ এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মোখিন হয় তখন তারা এমন পন্থায় কাজ করেন যেন শ্রমিকগন এই ধরনের ধর্মঘট বা পদক্ষেপ গ্রহন করতে না পারেন। তবে এই অস্ত্র শ্রমিক শ্রেনীর হাতে নিজেদের সুরক্ষার জন্য মজুদ রয়েছে, যখন শ্রমিকগন বুঝতে পারবেন যে তারা নিজেদের শ্রমের জন্য সত্যিকার পাওনা পাচ্ছেন না তখন তারা নিজেরাই এই ভ্রম্মাস্ত্র ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত হরতাল ভাঙ্গার আন্দোলন ইউরূপ থেকে আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়, বিস্ময়কর ভাবে তা ছড়িয়ে ও পড়ে, রাত দিন শ্রমিকগন যে আন্দোলনের পেছনে কাজ করে তা স্যাবোটাজের মধ্যমে কেবল আঙ্গুলের ইশারায় অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠে। স্যাবোটাজ খুবই চমৎকার ভাবে কাজ করেঃ ধর্মঘটের আগে শ্রমিকগন কেবল কারখানার মেশিন গুলো অকেজো করে দিয়ে যায়, ফলে হরতাল ভাংগা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। সেই শ্রমিক ছাড়া কোন প্রকার কাজ কারো পক্ষেই চালানো অসম্ভব। স্যাবোটাজ কেবল নিয়োগ কর্তা বা মালিকদের বিরুদ্বেই প্রয়োগ করা যেতে পারে। তা কোন ভাবেই পন্য ব্যবহার কারী বা গোক্তাদের বিরুদ্বে ব্যবহার করা যাবে না। সিজিটির কাছে একবার রিপোর্ট করা হয় যে, ১৮৯৭ সালে টুলাউসে, এমিলে যখন প্রচন্ড আন্দোলন তখন সকল বুর্জয়া পত্রিকা প্রতিবেদন চাপে যে, শ্রমিকগন নাকি রুটিতে ও দুধে বিষ মিশিয়েছে, এই প্রচারনা ছিলো ডাহা মিথ্যাচার, মালিক পক্ষের ষড়যন্ত্র। তারা শ্রমিকদেরকে জন সাধারনের বিরুদ্বে দাড় করাতে চাইছিলো। তাদের মতলব পরে ধরা পড়ে যায়।

ভোক্তাদের বিরুদ্বে স্যাবোটাজ করা মালিক পক্ষ বা নিয়োগ কর্তাদের একটি পুরনো অভ্যাস। মালামাল সর্বরাহের ক্ষেত্রে, দরিদ্রদের জন্য গৃহ নির্মানের ক্ষেত্রে তারা নিম্ন মানের উপকরান দিয়ে থাকে। খাদ্য দ্রব্য সর্বরাহে ও এরা উচু মূল্যে কমদামি দ্রব্য দিতে চায়। এরা দরকার হলে লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য নদিতে বা সমূদ্রে ফেলে দিবে, বাজারে কৃত্তিম সংকট সৃজন করার জন্য। আর সেই সংকটকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক হারে মুনাফা ঘরে তুলার জন্য তারা সব কিছুই করতে পারে। এই ধনীক ক্ষমতা শালী চক্রটি যুদ্বের অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ও চুরি চামারীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। মুনাফা পুজারী এই সকল লোকদের লজ্জা শরম ও খুব কম থাকে। সামগ্রীক ভাবে পুঁজিবাদের ধারক বাহক চক্র নিজেদের লোকদের বিরুদ্বে ও নানা অপকর্ম করে থাকে।

সাধারন জনগণ যখন কোন পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হয় তখন সাধারন ধর্মঘট ডাকা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই কার্যক্রম তাৎক্ষনিক ভাবে উৎপাদক শ্রেনীর জন্য তেমন লাভজনক না হলে ও সামাজিক ভাবে সাধারন মানুষের অধিকার আদায়ে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। যা সামাজিক ব্যবস্থার বদল করতে ও সহায়ক হয়ে থাকে। সামাজিক ধর্মঘট নিয়োগ কর্তাদেরকে সামাজিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করেতে পারে। এই কর্মসূচী ভোক্তাদের অধিকার শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের সুরক্ষা দেয়।

এযাবতকাল নিয়োগ কর্তাগন দেখে এসেছেন শ্রমিকগন কত ঘন্টা, কি পরিমানে কাজ করেন, আর নির্ধারিত মাত্রায় মজুরী পরিশোধ করেছেন। অন্য দিকে ট্রড ইউনিয়ন সমূহ তাদের সদস্যদের অবস্থান বিবেচনায় নিয়েছেন, তারা কোন কালেই শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্বি বা মান সম্মত কর্মকান্ড সম্পর্কে তেমন আগ্রহী নয়। তত্ত্বগতভাবে, যদি ও বলা আছে যে, নিয়োগ কর্তা ও নিয়োগকৃতগন পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একেই উদ্দেশ্যে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ কাজ করবে।

আর সেই উদ্দেশ্য হলো সামাজিক উৎপাদন বৃদ্বি। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য তখনই সফল হতে পারে যখন উভয় পক্ষ সমান ভাবে সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করবেন। বাস্তবতা হলো শ্রমিক শ্রেনী উতপাদনের ক্ষেত্রে কোন কথাই বলতে পারে না। সকল সিদ্বান্ত আসে নিয়োগ কর্তাদের নিকট থেকে। ফলে যা ঘটে তা হলো নিয়োগ কর্তাদের কথায় হাজার কাজ করেন অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ক্ষতি ও সাধিত হয় এবং শ্রমিকগন নিজেরা প্রায়স অপবাদের শিকার হয়। মালিক বা নিয়োগ কর্তাগন সকল সময়েই চায় কম মূল্যের নিম্ন মানের উপকরন দিয়ে পন্য তৈরী করে বেশী মূল্যে বাজারে ছাড়তে এবং অধিক হারে মুনাফা অর্জন করতে। তারা সেই জন্য ভোক্তাদেরকে প্রতারনা কতে কোন রূপ দ্বিধাবোধ করে না।

বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন গুলোর মহান কাজ হলো কঠোরভাবে কর্ম ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা অর্জন করা। এর ফলে শ্রমিক শ্রেনীর অবস্থা উন্নত হবে, সামাজিক পরিমন্ডলে উৎপাদক শ্রেনীর অবস্থান সুদৃঢ় হবে। ইতিমধ্যে এই পরিস্থিতি তৈরী করার মত বেশ কিছু উদাহরন সৃজন করা হয়েছে। ১৯০২ সালে বার্সেলুনাতে গৃহ নির্মান শ্রমিকগন নিম্নমানের উপকরন দিয়ে গৃহ নির্মান কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকার করে। ১৯০৬ সালে প্যারিসের কিচেন শ্রমিকেরা নিম্নমানের খাদ্য উপকরন দিয়ে খাদ্য প্রস্তুত করতে ও তা সরবরাহ করতে অস্বীকার করেছিলেন। এছাড়া ও অনেক উদাহরন আমাদের আশে পাশেই পাওয়া যাবে ; এই সকল কার্যক্রমের ভেতর দিয়ে বুঝা যায় যে সামাজিক চাহিদা বুঝার ক্ষেত্রে উৎপাদক শ্রেনীর লোকেরা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম।

১৯১৯ সালে জার্মান শ্রমিকগন একটি প্রস্তাব গ্রহন করেছিলেন যে, তারা আর মরনাস্ত্র তৈরী করার জন্য কাজ করবেন না। এমনকি যে সকল কারখানায় শ্রমিকগন এখন অস্ত্র তৈরী করছেন তারা ও সেই সকল কারখানা রূপান্তর করার জন্য দাবী জানাবেন এবং এই আন্দোলনের সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস অব্যাহত রাখবেন। এই রেজুলেশন টি নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ দু’বছর কাজ করেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সংগঠনকে এই রেজুলেশন বদল করতে সরকার বাধ্য করে। সেই সময় এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট কর্মীগন তাদের সিদ্বান্তে অটল থাকার জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা করে কিন্তু সেখানে ভিন্ন একটি ট্রেড ইউনিয়ন সরকারী ছত্রছায়ায় জোরদার হয়ে উঠে যাদের নাম ছিলো “ফ্রি লেবার ইউনিয়নস”।

বিপ্লবী এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টগন বিরুধীদের বিপরীতে ব্যাপকভাবে প্রচারনা চালায়, বিশেষ করে ল্যাতিন আমেরিকার দেশ গুলোতে, তারা সকল সময়েই সেনাবাদের বিরুদ্বে উচ্চ কন্ঠ ছিলেন। তারা শ্রমিকদেরকে সৈনিক না হবার আহবান জানাতেন, আর যারা তাদের শ্রেনীর ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন তাদেরকে শ্রমিকদের পক্ষে বিশেষ করে ধর্মঘট চলা কালে কাজ করার বা ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য আহবান জানাতেন। তাদের সেই কাজের ব্যাপক মূল্য আছেঃ কিন্তু তারা তাদের সেই প্রচেস্টাকে একেবারে বন্দ্বকরে দেয় নাই। তারা বিবেচনা করতেন যে তাদেরকে বিরাট ক্ষমতাশালী চক্রের বিরুদ্বে লড়াই করতে করতেই একদিন তারা তাদের অধিকার প্রতিস্টা করতে পারবেন।

তবে তারা সেই প্রচারনা কালে জঙ্গীবাদ বিরুধী বক্তব্য হাজির করেন যা তাদের সাধারন ধর্মঘটের সময় কাজে লাগে। এনার্কো- সিন্ডিক্যালিস্টগন ভালো করেই জানেন যে, প্রতিটি যুদ্বই ক্ষমতাসীন চক্রের সার্থে পরিচালিত হয়ে থাকে; তারা এটা ও বিশ্বাস করেন যে , পরিকল্পিত ও সংগঠিত ভাবে মানুষ হত্যা করে তা বৈধ বলে প্রচারনা চালাবে ক্ষমতাসীনরা। এই সকল ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার ক্ষমতা শ্রমিকদের হাতেই রয়েছে। তবে তার জন্য দরকার তাদের নৈতিক ও ইচ্ছা শক্তি।

সর্বোপরি, শ্রমিক আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কমিয়ে শান্ত ও চিন্তাশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৌতিক দলগুলোর প্রভাব প্রতিপত্তি কমিয়ে মুক্ত ভাবে সামাজিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের মাধ্যমে সমাজবাদ চর্চার পথকে প্রশস্ত করতে হবে সকলের জন্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিকদের নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্বি করতে হবে, নৈতিক মান উন্নয়নের জন্য প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজবাদ কায়েমের জন্য যে মহান লক্ষ্য স্থির করা আছে তার জন্য নিরন্তর লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এই আন্দোলনকে একটি সামাজিক চরিত্র দিতে হবে। যা প্রচলিত সমাজকে একটি সমাজবাদি সমাজে রূপান্তর করতে সহায়ক হবে।

ষষ্ঠ অধ্যায়

এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের বিবর্তন

ইউরূপে আধুনিক বিপ্লবী শ্রমিক ইউনিয়ন আন্দোলন যে সাড়া ফেলেছিলো, তা থেকে কেবল স্পেন একমাত্র ব্যাতিক্রম ছিলো, আর সেটা হলো প্রথম আন্তর্জাতিকের এনার্কো- সিন্ডিক্যালিজমের ব্যাপক প্রভাব, তা ও আবার মুলত ফ্রান্সে সৃজিত এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের নিকট থেকে প্রাপ্ত আলোয়ে উদ্ভাসিত, যাহা সিজিটি কর্ম ক্ষেত্রে উদ্ভোত হয়। রাজনৈতিক সমাজবাদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে সেই আন্দোলন প্রবল ভাবে ফ্রান্সের শ্রমজীবী মানুষের মাঝে দ্রুত বৃদ্বি পাচ্ছিলো। তখন ও একক ভাবে কোন শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠেনি। প্যারিস বিপ্লব ব্যার্থ হবার পর এবং আন্তর্জাতিক আন্দোলন স্থবির হয়ে পরার কারনে ফ্রান্সে শ্রমিক আন্দোলন সমূহ বিবর্নরূপ নিয়ে মন্থর গতীতে এগিয়ে যাচ্ছিলো। সেই প্রজাতন্ত্রীদের প্রভাব বলয়ের ভেতরে থেকেই জে, বারবারিয়েত, একটি শ্লোগান তুলেন যেঃ “পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য চাই”। তা শুধু ১৮৭৯ সালের মার্সেলাইসে অনুস্টিত কংগ্রেস পর্যন্ত সিমাবদ্ব ছিলো না। সেই সময়ে কোন প্রকার সমাজতন্ত্রের বক্তব্য ও হাজির করা হয় নাই। তবে সংগীত শীল্পীরা তাদের গানে সাম্যবাদের বা যৌথজীবন যাপনের বানী প্রচার করে যাচ্ছিলেন।

এই যৌথতাবাদিগন খুব বেশী সময় একতাবদ্ব থাকতে পারেন নাই, ১৮৮২ সালে সেন্ট এইটিনের কংগ্রেসে তারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে একটি দল মার্ক্সবাদি ভাবধারায় যুক্ত হন, জেলাস গুয়েসদে এবং ওভারী ফ্রান্সিস একটি পার্টি প্রতিস্টা করেন। যখন অন্যান্য এনার্কিস্টগন দলবদ্ব হচ্ছিলেন তখন পল ব্রুস ও ওভারী ফ্রান্সিস আলাদা বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। প্রাক্তন ফেডারেশন ন্যাশনাল দেস সিন্ডিকেটে প্রধানত তার সমর্থন পেয়েছে, যখন ফেডারেশন ডেস বুর্স ডি ট্রাভাইল ডি ফ্রান্স (ফেডারেশন অফ লেবার এক্সচেঞ্জ অফ ফ্রান্স) এ তার দুর্গ ছিল। অল্প সময়ের পরে তথাকথিত অ্যালাইম্যানস্টরা, জ্যান অ্যালম্যানের নেতৃত্বে, ব্রুসসিস থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকটি বড় সিন্ডিকেটে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে; তারা সংসদীয় কার্যকলাপ সম্পূর্ণরূপে ছেড়ে দেয়। এ ছাড়াও ব্ল্যাককুইস্টরা কমিটির বিপ্লব সেন্ট্রালে একত্রিত হয়েছিল এবং স্বাধীন সমাজতান্ত্রিকরা সোসাইটির সদস্য ছিলেন, যারা ১৮৮৫ সালে বেনিত মালোন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এবং এর মধ্যে জ্যান জাওয়ার এবং মিলারান্ড উভয়ই এসেছিলেন।

অ্যালাইম্যানস্ট ব্যতিক্রম ছাড়া এই দলগুলোর সব, ট্রেড ইউনিয়নে শুধুমাত্র তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জন্য স্কুল নিয়োগ, এবং তাদের বাস্তব কাজ যাই হোক না কেন তা স্পষ্ট ছিল। বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দলসমূহের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্বে স্বাভাবিকভাবেই সিন্ডিকেটে পরিচালিত হয়, ফলে যখন একদল ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে ধর্মঘট চলছিল, তখন অন্য দলগুলোর সিন্ডিকেটগুলি স্ট্রাইক ব্রেকারদের উপর তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিলো। এই অসমর্থনীয় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শ্রমিকদের অন্তর চোখ খুলে দেয়, যা জাগিয়ে তোলার জন্য অ্যানার্কেস্টদের সংসদীয় পদ্বতীর বিরুদ্বে প্রচারণা জোরদার হয়ে উঠে, যারা ১৮৮৩ সাল থেকে প্যারিস ও লায়ন্সের শ্রমিকদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছিল, তাদের কোনও বিশেষ অবদান ছিল না। তাই ন্যান্টসের (১৮৯৬) ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস একটি ট্রেডমার্ক কমিটি গঠন করে, যার মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়নের সকল জোটের মধ্যে একটি বোঝার সৃষ্টি করা যায়। ফলাফলটি সিঙ্গাপুরের লিমংসে কংগ্রেসে পরের বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সব রাজনৈতিক দল থেকে নিজেকে স্বাধীন হিসাবে ঘোষণা করে। এটি ছিল রাজনৈতিক সমাজতন্ত্রের ট্রেড ইউনিয়নের চূড়ান্ত বাতিল করন, যার কার্যক্রমগুলি ফরাসি শ্রমিক আন্দোলনকে নষ্ট করে দিয়েছিল এবং মুক্তির যুদ্ধে এটি সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।

সেখানে মাত্র দুটি বড় ট্রেড ইউনিয়ন ছিল, সি জি টি। এবং ফেডারেশন অফ শ্রম এক্সচেঞ্জ, ১৯০২ সাল পর্যন্ত, মন্টপিলিয়ারের কংগ্রেসে পরেরটি সি.এন.টি.তে যোগ দেয়। এই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নগুলির ঐক্য সম্পর্কের উপর জোর দেয়া হয়েছে। সংগঠিত শ্রম সংহতকরণের প্রচেষ্টায় সাধারণ হরতালের জন্য একটি গভীর প্রচার দ্বারা অগ্রসর হয়, যার জন্য মারেসিলিস (১৮৯২) প্যারিস ১৮৯৩ এবং নান্টেস ১৯৯৪ এ কংগ্রেসে ইতিমধ্যেই শক্তিশালী মৈত্রীর কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। সাধারণ ধর্মঘটের ধারণাটি প্রথমে ট্রেডমার্ক আন্দোলনে অ্যানাখালিস্ট বাহরার টরটেলিয়ারের দ্বারা আনা হয়েছিল, যিনি ১৮৮৬-৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ধর্মঘট আন্দোলন দ্বারা গভীরভাবে উদ্দীপিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে এলামম্যানস্টদের দ্বারা এটি গ্রহণ করা হয়েছিল, যখন জুলেস গুয়েসদে এবং ফরাসি মার্কসবাদীদের কথা এর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়েছিল।

যাইহোক, উভয় আন্দোলন সি এন টির. আদর্শে সজ্জিত ছিলো। তার বেশিরভাগ বিশিষ্ট প্রতিনিধির সঙ্গে: এলাইমেনিস্টদের থেকে এসেছিলেন, বিশেষ করে, ভি, গ্রিফুয়েলস; ফেডারেশন অফ শ্রম এক্সচেঞ্জের অনুগত এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান সচিব, এ, পলউটিয়ার, এন,পউগট, সিজিটি, লা ভয়েস দ্য পিপলে, পি, ডেলসেল, জি, ইভ্যটট এবং অন্যান্য অনেকের অফিসিয়াল অডিটের সম্পাদক ছিলেন। প্রায়ই অন্য দেশগুলির সাথে মিলিত হয়, বিস্তৃতভাবে প্রচারিত মতামত, বিশেষ করে ওয়ার্নার সোবার্ট দ্বারা উত্থাপিত হয়, বিশেষ করে ফ্রান্সে বিপ্লবী এনার্কো-সিনডিক্যালিজম জিও সোরেল, ই, বার্থ এবং এইচ। লাগারগ্রেলের মত বুদ্ধিজীবীদের উদ্ভব করে। লে, মুভম্যান্ট সোস্যালিস্ট, ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত, তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে নতুন আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ফলাফল ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই মানুষ কখনও আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল না এবং তাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাবও ছিল না। তাছাড়া, সি জি টি।

বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়নগুলির একচেটিয়াভাবে রচনা করা হয়নি, অবশ্যই তার সদস্যদের অর্ধেক সংস্কারবাদী প্রবণতা ছিল এবং কেবলমাত্র জি.জি. কারণ তারা স্বীকৃত যে রাজনৈতিক দলগুলোর ট্রেড ইউনিয়নের নির্ভরতা আন্দোলনের জন্য একটি দুর্ভাগ্য। কিন্তু বিপ্লবী উইং, যার পক্ষে সংগঠনটির সর্বাধিক নিস্ক্রিয় ও সক্রিয় উভয় উপায়ে তার পাশে ছিল এবং তার নির্দেশনা ছিল, তাছাড়া, প্রতিষ্ঠানের সেরা বুদ্ধিবৃত্তিক দল, সি.জি.টি. তার চরিত্রগত স্ট্যাম্প, এবং এটি ছিল, একচেটিয়াভাবে, যারা এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম দ্বারা তাদের ধারনার উন্নয়ন ঘটায়। এর সাথে পুরাতন আন্তর্জাতিক চিন্তাধারা নতুন জীবনকে আলোকিত করে এবং ফ্রান্সের শ্রম আন্দোলনের উত্থাল সময়ে তা শুরু হয়েছিল, যার বিপ্লবী প্রভাবগুলি ফ্রান্সের সীমানা ছাড়াই নিজেদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

মহান ধর্মঘট এবং সিজিটি এর অসংখ্য কার্যধারা সরকার কর্তৃক তাদের বিপ্লবী উজ্জ্বলতা দৃঢ়ভাবে গড়ে তোলেন এবং সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, বোহেমিয়া এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কাউন্টিতে তাদের পথ খুঁজে পাওয়ার জন্য নতুন ধারণা সৃষ্টি করেন। ইংল্যান্ডে সিন্ডিক্যালিস্ট এডুকেশন লিগ, যা ১৯১০ সালে টম ম্যান এবং গাই বোলম্যানের মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ করে এবং যার শিক্ষাগুলি খুব শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে, বিশেষ করে পরিবহন ও খনির শিল্পের ক্ষেত্র গুলোর মধ্যে, যেমন প্রকাশিত হয়েছিল সেই সময়ের মহান ধর্মঘট ও আন্দোলনে, ফরাসি সিন্ডিক্যালিজমের কাছে তার অস্তিত্ব পরিদৃশ্যমান ছিল।

অভ্যন্তরীণ সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক শ্রম আন্দোলনের উপর ফরাসি সিন্ডিক্যালিজমের প্রভাবকে শক্তিশালী করে তৎকালীন প্রায় সব সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলই দখল করে নেয়। তথাকথিত সংশোধনবাদীদের এবং কঠোর মার্কসবাদীদের মধ্যে যুদ্ধ, এবং বিশেষ করে, তাদের সংসদীয় কার্যক্রমগুলি বেশিরভাগ হিংসাত্মক ছিলো তারা প্রতিপক্ষকে কঠোর ভাবে নিজেদের পথে পরিচালিত করেছিল, যার কারণে অনেক চিন্তাশীল উপাদান এতে যুক্তিহীন ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এভাবেই প্রায় বেশিরভাগ দলই নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিস্থিতির প্রভাবের দ্বারা চালিত হয় এবং সিন্ডিকেটবাদীদের সাধারণ ধর্মঘটের ধারণা সম্পর্কে নির্দিষ্ট রীতির আওতায় আসে।

হল্যান্ডের সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রদূত দুমেলিয়া নিউওয়েনহিস আগে ব্রাসেলস ১৮৯১ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ধর্মঘটে সোশ্যালিস্ট কংগ্রেসে উত্থাপিত হয়েছিল, একটি ধর্মঘট সংগঠিত হয়েছিলো শ্রমব্যবস্থা প্রস্তুত করতে, এর দ্বারা একটি যুদ্ধের আগমন বিপদ বন্ধ করার জন্য একটি প্রস্তাব ও তারা উত্থাপন করে, উইলহেলম লিবক্যাক্টের প্রস্তাবের প্রবল বিরোধিতা করেন। কিন্তু এই বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রায় সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসই এই প্রশ্নের সাথে নিজেদেরকে আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করে তুলে।

প্যারিসে ১৮৯৯ সালে সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসের সময়ে, সম্ভাব্য মন্ত্রী, আরিস্টেড ব্রিড, তার সবকটি বক্তব্যে সাধারণ ধর্মঘটের জন্য যুক্তি দেন এবং কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত একটি যথাযথ মীমাংসা লাভে সফল হন। এমনকি ফ্র্যাঞ্চাইজ গিবসডিস্, যারা পূর্বে সাধারণ ধর্মঘটের বিপথগামী ছিলেন, তারা লিলের (১৯০৪ ) কংগ্রেসে নিজেকে সমর্থন জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তারা ভয় করত যে তারা অন্যথায় শ্রমিকদের মাঝে তাদের সমস্ত প্রভাব হারাবে। অবশ্যই এই ধরনের ছাড় দ্বারা কিছুই অর্জিত হয়নি। সংসদ ও সরাসরি কর্মসূচির মধ্যে পিছনে এবং পিছনে দেখলেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

ডোমেলা নিউয়েনহুইস এবং হোল্যান্ডের তার অনুসারীরা এবং ফ্রান্সের অ্যালামম্যানস্টিসের মতো স্পষ্টতা বর্জিত লোকেরা তাদের নতুন ধারণার থেকে নিজেদের ধারণা তুলে ধরে এবং সংসদীয় কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেয়; তবে অন্যান্যদের জন্য, সাধারণ হরতালের ধারণাগুলি তাদের কৈফিয়তগুলি নিছক ঠোঁটের কাজ ছিল না, এর পেছনে কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। যেখানে তিনি নেতৃত্ব দেন, সেখানে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছিল, যিনি একজন মন্ত্রী হিসেবে সাধারণ হরতালের পক্ষে নিজের অবস্থান নিষিদ্ধ করার জন্য দুঃখজনক অবস্থাতে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন, যা সি জি টি র পক্ষে শত শত প্যম্পলেট আকারে বিতরণ করা হয়েছে।

ইউরোপীয় এনার্কো-সিনডিসিলিজমের স্বাধীনতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিকশিত হয়। বিশ্বব্যাপী শিল্প শ্রমিকদের আন্দোলন, যা সম্পূর্ণরূপে আমেরিকান সামাজিক অবস্থার অগ্রগতি ছিল। এখনও এনার্কো-সিনডিক্যালিজমের সাথে সাধারণ কর্মকাণ্ড এবং কর্মীদের শিল্প ও কৃষি সংস্থার সমাজের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের চর্চা করার প্রচলন ছিল। ইউজিন ডেবিস, বিল হেউড, চার্লস ময়র, ড্যানিয়েল ডি লিওন, ডব্লু। টাট্রম্যান, মাদার জোনস, লুসি পারসন্স এবং অন্যান্য অনেকের মধ্যে শিকাগোর প্রতিষ্ঠাতা কংগ্রেসে (১৯০৫) আমেরিকান শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক মৌলিক উপাদানগুলি উপস্থাপন করা হয়। এক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ছিল কলোরাডো, মন্টানা এবং আইডাহোর মধ্যে তার নিবেদিত এবং আত্ম-আত্মরক্ষামূলক শ্রম মারামারি জন্য সর্বত্র পরিচিত হয় যারা খনির ওয়েস্টার্ন ফেডারেশন।

১৮৮৬-৭ তে দিনে আট ঘন্টা কাজের জন্য মহান আন্দোলন, যা নৈরাজ্যবাদ, স্পাইস, পারসন, ফ্লেচারের মৃত্যুদণ্ডের সাথে তার দুঃখজনক পরিণামের সম্মুখীন হয়। ১১ নভেম্বর, ১৮৭৭ এ এঞ্জেল এবং লিংগ, আমেরিকান শ্রমিক আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিকভাবে নিমজ্জিত হয়েছে। এটা বিশ্বাস করা হয় যে আই, ডব্লিঊ ডব্লিউ এর প্রতিষ্ঠাতার কারেনেই তা হয়েছে। একটা বিপ্লবী ধারার আন্দোলনকে পুনরায় চালু করা সম্ভব হতে পারে, এমন একটি প্রত্যাশা যা এখনো পূর্ণ হয়নি। কি প্রধানত আই.পি. ইউরোপীয় সিন্ডিক্যালস থেকে তার দৃঢ় সংজ্ঞায়িত মার্কসবাদী মতামত ছিল, যা বিশেষ করে ড্যানিয়েল ডি লিয়নের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যদিও ইউরোপীয় সিন্ডিক্যালস্টরা প্রথম আন্তর্জাতিক উদারবাদী উইংয়ের সমাজতান্ত্রিক ধারনাকে সৎপথ্যে গ্রহণ করেছিল।

আইডব্লিউডব্লিউ পশ্চিমে বিচরনকারী শ্রমিকদের উপর বিশেষ করে শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে, কিন্তু তারা পূর্বের রাজ্যে কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে, এবং অনেকগুলি বড় বড় ধর্মঘট পালন করে, যা প্রত্যেকের মুখে মুখে ‘Wobblies’ নামটি ছড়িয়ে পড়ে। তারা পশ্চিমা রাজ্যে স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য অনুপ্রাণিত যুদ্ধে একটি অসামান্য অংশ গ্রহণ করে, এবং এভাবে জীবন ও স্বাধীনতার অনেক ভয়ানক ত্যাগ স্বীকার করে। তাদের হাজার হাজার সদস্যরা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, বেশিরভাগই কট্টরপন্থী ভাব ধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিল, ১৯১২ সালের এভেরট গণহত্যা, শ্রমিক কবি জো হিলকে ১৯১৫ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ১৯১৯ সালে সেন্ট্রালিয়া বিষয়ক মামলা, এবং এমন অনেক মামলা যেখানে নিরপরাধ শ্রমিক মারা গিয়েছিলেন, আইডব্লিউডব্লিউ'র ইতিহাসে আত্মাহুতির কয়েকটি মাইল ফলক ছিল।

বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক ভাবে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো শ্রমিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল। সারাজভোতে হত্যার পর, যখন সবাই মনে করেছিল যে ইউরোপ একটি সাধারণ যুদ্ধের দিকে একেই ছাতার নিচে চালিত হচ্ছে, তখন সি.জি.টি. জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের প্রস্তাব যে দুই দেশের সংগঠিত শ্রম হুমকি দুর্যোগ থামাতে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু জার্মান শ্রমিক নেতারা, যারা সর্বদাই সরাসরি গণ-কর্মের বিরোধিতা করতেন এবং সংসদীয় রুটিনে তাদের দীর্ঘদিন থেকেই বিপ্লবী উদ্যোগের প্রত্যেকটি পথ হারিয়ে ফেলেন, এই ধরনের ভাবধারার উপর ভিত্তি করে জয়লাভ করা যায় না। তাই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় প্রতিরোধ করার জন্য শেষ সুযোগ ব্যর্থ হয়।

যুদ্ধের পরে জনগণ একটি নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ইউরোপের তখন হাজার জখম থেকে রক্তপাত চলছে। মধ্য ইউরোপে পুরাতন শাসন পতন হয়েছিল। রাশিয়াকে একটি সামাজিক বিপ্লবের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, যার কোনও শেষ দেখতে পারে না। যুদ্ধের সমস্ত ঘটনাবলীর মধ্যে রাশিয়ার ঘটনাবলি সব দেশের শ্রমিকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তারা বুঝতে পারেন যে, তারা বিপ্লবী অবস্থার মাঝে ছিল এবং তখন যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তা উপযুক্ত ছিলো , তবে জনসাধারণের সব আশা বছরের পর বছর ধরে চলল। শ্রমিকরা বুঝে গেল যে এই ব্যবস্থাটি যেটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়ঙ্কর বিপর্যয়কে রোধ করতে পারল না, বরং চার বছর ধরে মানুষকে গণহত্যা করার জন্য চালিত করে, তার অস্তিত্বের অধিকার ক্ষুন্ন করে দিয়েছিল এবং তাদের জন্য যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যা তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বা যা যুদ্ধ তৈরি করেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায়। এই কারণে তারা রাশিয়ান বিপ্লবের উপর তাদের সর্বাধিক আশা রাখেন এবং মনে করেন যে এটি ইউরোপের জনগণের ইতিহাসে একটি নতুন যুগের উদ্বোধনকে চিহ্নিত করে রেখেছে।

১৯২১ সালে রাশিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বলশেভিস্ট পার্টি, বিপ্লবী শ্রমিক সংগঠনগুলিকে বিশ্বের কাছে একটি আহবান রাখে, এবং তাদের একটি কংগ্রেসে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা পরবর্তী বছরের রাশিয়ার সাথে একটি নতুন ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়। কেবলমাত্র কয়েকটি দেশে কমিউনিস্ট দলগুলি বিদ্যমান; অন্যদিকে, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশসমূহে সিন্ডিকেটবাদী সংগঠনগুলি ছিল, যাদের মধ্যে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। অতএব, লেনিন ও তার অনুসারীদের এই বিশেষ সংগঠনকে জোর করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, যেহেতু তিনি সমাজতান্ত্রিক শ্রম দফতরের কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন যে, তিনি সম্ভবত তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেন।

তাই এটি সম্পর্কে এসেছিলেন, যে ১৯২০ সালের গ্রীষ্মে তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার জন্য কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত হয়, এতে প্রায় সকল সিন্ডিস্টিক এবং অরাজক-সিন্ডিক্যাল সংগঠন প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কিন্তু রাশিয়াতে প্রাপ্ত সিন্ডিকেটবাদী প্রতিনিধিরা যে পর্যবেক্ষনগুলি অর্জন করেছিলেন তা তাদের চেতনাকে নাড়া দিতে পারেনি। তারা কমিউনিস্টদের সাথে সহযোগিতা করতে পারে সম্ভাব্য ক্ষেত্র সমূহে। "সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব" ইতিমধ্যে তার সবচেয়ে খারাপ দিক গুলো প্রকাশ করতে শুরু করেছে। কারাগারগুলি সমাজতন্ত্রীদের দ্বারা ভরা হয়ে গিয়েছিলো , তাদের মধ্যে অনেক অরাজকতাবাদী এবং এনার্কো-সিডিকালস্টরা ও ছিলেন। কিন্তু সর্বোপরি এটি ছিল স্পষ্ট যে নতুন প্রজন্মের লোকদেরকে সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহারের জন্য কোন ব্যবস্থাই ছিল না।

তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিত্তি, তার স্বৈরশাসন ব্যবস্থার সংগঠন এবং ইউরোপের সমগ্র শ্রম আন্দোলনকে বলশেভীয় রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির একটি উপকরণ হিসাবে তৈরি করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সিনডিসিনিস্টদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে তাদের জন্য কোন স্থান নেই। ঐ সংস্থাটি তবে বলশেভবিদদের জন্য এবং বিশেষ করে লেনিনের জন্য, বিশেষ করে লন্ডন ভাষায়, বিশেষ করে লন্ডন অঞ্চলে, তাদের পরিচিতি, বিদেশে সিন্ডিক্যালিস্ট সংগঠনকে ধরে রাখার জন্য এটি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। এ কারণে তৃতীয় আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক বিপণন ট্রেড ইউনিয়নগুলির একটি পৃথক আন্তর্জাতিক জোটের সাথে সেট আপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেখানে সমস্ত ছায়া গোষ্ঠীর সিন্ডিক্যাল সংগঠনও একটি স্থান খুঁজে পেতে পারে। সিন্ডিকেটবাদী প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাবের পক্ষে একমত হন এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের কমিশনার লোসভস্কির সাথে আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেন যে নতুন সংগঠনটি থার্ড ইন্টারন্যাশনালের অধস্তন হওয়া উচিত এবং বিভিন্ন দেশের সিন্ডিকেটকে তাদের দেশের কমিউনিস্ট সংগঠনের নেতৃত্বে রাখা উচিত। এই দাবি সর্বসম্মতভাবে সিন্ডিকেটবাদী প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। যেহেতু তারা কোন পদে একটি চুক্তি করতে অক্ষম ছিল, শেষপর্যন্ত ১৯২১ সালে মস্কোতে আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এবং আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাদের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাদের নিজেদের উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়।

ডিসেম্বর, ১৯২০ সালে, মস্কোতে আসন্ন কংগ্রেসের দিকে একটি মনোভাব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বার্লিনে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিক্যালস্ট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস সাত দফায় সম্মতি এবং এর স্বীকৃতি চাইছিলো। যা লাল ট্রেড ইউনিয়ন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে তাদের অনুপ্রবেশ অনুমোদন করা হয়েছিল। এই সাতটি পয়েন্টের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল সকল রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, এবং দৃষ্টিভঙ্গির উপর দৃঢ়তার যে সমাজতান্ত্রিক সমাজের পুনর্গঠন শুধুমাত্র উৎপাদনকারী শ্রেণির অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। পরের বছর মস্কোতে কংগ্রেসে সিন্ডিকেটবাদী সংগঠন সংখ্যালঘু ছিল। রাশিয়ান ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অ্যালায়েন্স সমগ্র পরিস্থিতির উপর আধিপত্য এবং সব পরিস্থিতিতেই।

এফ.এ.ডি.ডি. এর ত্রয়োদশ কংগ্রেসের সাথে ১৯২১ সালের অক্টোবরে ডাসেলডর্ফের ফ্রয়ে আর্বিইটার-ইউনিয়ন ড্যুজেডর, ফ্রি শ্রম ইউনিয়ন জার্মানি, সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন ছিল বিপ্লবী ইউনিয়ন, যেখানে জার্মান, সুইডেন, হল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া এবং আই.পি.পি. আমেরিকা উপস্থিত ছিল। সম্মেলন ১৯২২ সালের বসন্তে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিক্যালিস্ট কংগ্রেসের আহ্বান জানায়। বার্লিনকে সভাপতিত্বের জন্য নির্বাচিত করা হয়। ১৯২২ সালের জুলাই মাসে, এই কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্য বার্লিনে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়; ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, হল্যান্ড, স্পেন এবং রাশিয়ায় বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছিল। রাশিয়ান ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় জোটও কংগ্রেসের আহ্বানকে রোধ করার জন্য তাদের একজন প্রতিনিধিকে পাঠিয়েছিল এবং কংগ্রেসে বামপন্থীরা কোন সাফল্য পায়নি। সম্মেলনটি অরাজক-সিন্ডিক্যালিজমের নীতিমালা ঘোষণা করে, যা কংগ্রেসের সাফল্যের জন্য আসন্ন কংগ্রেসের সামনে রাখে এবং কংগ্রেসের সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিল।

ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ সিনডিক্যালস বার্লিনে ২৫ শে ডিসেম্বরে, ১৯২২ সালের ২ জানুয়ারি, ২৩ শে জানুয়ারী পর্যন্ত নিম্নলিখিত সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছিল; আর্জেন্টিনা ফেডারেশন অব্রিয়া আঞ্চলিক আর্জেন্টিনা দ্বারা, সঙ্গে ২০০০০০ সদস্য; বিশ্বের শিল্প শ্রমিকদের দ্বারা চিলি ২০০০০ সদস্য; ডেনমার্কের সিন্ডিকেটবাদী প্রচারের জন্য ইউনিয়ন কর্তৃক ৬০০ জন সদস্য; জার্মানি ফ্রাই আর্বিইটার-ইউনিয়ন দ্বারা, ১২০,০০০ সদস্যের সাথে; ২২,৫০০ সদস্যের সাথে ন্যাশনাল আর্বিডস সিক্রেটরেট দ্বারা হোল্যান্ড; ইতালি ইউয়ানই সিন্ডিকেল ইতালীয়িয়া দ্বারা ৫০০,০০০ সদস্য; ৩০,০০০ সদস্যের সাথে কনফেডারেশন জেনারেল দে ত্রাবাসাদোরেসের মেক্সিকো; নর্স সিডিকিউলিস্টিক ফেডারাসন কর্তৃক ২0,000 সদস্যের নরওয়ে; পর্তুগাল কনফেডারো জিরাল ত্র্বালহো ১৫০,০০০ সদস্যের সাথে; সুইডেন দ্বারা সাভেরিজ আবেটেরাস কেন্দ্রীয় সংস্থা, সঙ্গে ৩২,০০০ সদস্যদের।

স্প্যানিশ সি.এন.টি. সেই সময়ে প্রোমো দে রিভের একনায়কত্বের বিরুদ্ধে একটি ভয়ংকর সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন, এবং সেই কারণেই কোন প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়নি, কিন্তু অক্টোবর, ১৯২৩ এ তারা সারোগোসায় গোপন সম্মেলনে তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করে। ফ্রান্সে, যেখানে যুদ্ধের পরে সিজিটি মধ্যে বিভক্ত স্থান গ্রহণ করা হয়েছিল, যা সি.জি.টি.ইউ. এর প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হয়েছিল, পরবর্তীতে ইতিমধ্যেই মুসকোভিতে যোগদান করেছে। কিন্তু সংগঠনের একটি সংখ্যালঘু ছিল যা কমেটি ডি ডিফেন্স সিন্ডিক্যালিস্ট বিপ্লবী যোদ্ধা গঠনের সাথে সংযুক্ত ছিল। এই কমিটি, যা ১০০,০০০ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করে, বার্লিন কংগ্রেসের কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে। ফ্রান্স থেকে ফেডারেশন ফেডারেস ডে লা সাইন অনুরূপ প্রতিনিধিত্ব ছিল। দুই প্রতিনিধি রাশিয়ান ট্রেড ইউনিয়নগুলির সিন্ডিক্যালিস্ট সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব করেন।

ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংয়ের অ্যাসোসিয়েশনের নাম অনুসারে সকল বিপ্লবী সংগঠনের আন্তর্জাতিক জোটের প্রতিষ্ঠা নিয়ে সর্বসম্মতভাবে সংবিধান সংশোধন করে। এটি বার্লিনের প্রাথমিক সম্মেলন দ্বারা পরিচালিত নীতির ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করে, যা এনার্কো-সিনডিক্যালিজমের একটি স্পষ্ট ভাবে কর্মে নিয়োজিত হয়েছিল। এই ঘোষণার দ্বিতীয় আইটেমটি নিম্নরূপ:

"বিপ্লববাদী সিন্ডিক্যালিজম হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক একচেটিয়াবাদের সকল প্রকারের প্রতিটি শত্রুর বিনাশ সাধন করা এবং এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাউন্সিলের স্বাধীন ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কমিউনে এবং কর্মক্ষেত্রের ও কারখানার কর্মীদের দ্বারা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের বিলুপ্তি নিশ্চিত করা হয়, যার লক্ষ্য হল সম্পূর্ণভাবে দল ও সরকার মুক্ত সমাজ কায়েম করা। রাষ্ট্র ও দলগুলোর রাজনীতির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা, মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে, একটি প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এর ফলে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন, সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তর থেকে রাষ্ট্রের বিলুপ্তি সাধন করা হবে। এটি বিবেচনা করে যে, সম্পত্তির একচেটিয়া অধিকারসহ, আধিপত্যের একচেটিয়াবাদও অদৃশ্য হওয়া উচিত এবং সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বসহ রাষ্ট্রের যে কোনও ফর্মই তৈরী হবে তাকে না বলা। নতুন সুযোগসুবিধার কথা যাই বলা হোকনা কেন , এটি কখনোই মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে না। "
এই উক্ত বিষয় সমূহ বলশেবিজম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একেবারেই মানা হয়নি, বরং স্পষ্ট ভাবে তা লঙ্ঘন করা হয়। আই.পি.এম.এ. তারপর থেকে তার নিজস্ব রাস্তা চলতে শুরু করে দেয় এবং অনুষ্ঠিত কংগ্রেস এ প্রতিনিধিত্ব করেনি। এটি তার আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে ধারণ করে, তার বুলেটিনগুলিকে ভিত্তি করে করে এবং বিভিন্ন দেশের সিন্ডিকেটবাদী সংগঠনগুলির মধ্যে সম্পর্কের সমন্বয় সাধন করে। সংগঠিত শ্রমের সকল আন্তর্জাতিক জোটের মধ্যে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিকের ঐতিহ্যকে সর্বাধিক বিশ্বস্তভাবে পালন করেছে।

আই.পি.এম.এ.এর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী সংস্থা স্প্যানিশ সি.এন.টি., যেটি আজ ইউরোপে ইতিহাস তৈরি করছে এবং সেই সাথে, শ্রমিকদের সংগঠনের আগে সেট করা যেকোনো কঠিন কাজগুলির মধ্যে একটির দায়িত্ব বহন করে। সি.এন.টি. ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যে কয়েক মিলিয়ন কর্মী ও কৃষককে সদস্য হিসেবে যুক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র নাম নয়, উদ্দেশ্য বা পদ্ধতি নয়। স্প্যানিশ শ্রম আন্দোলনের ইতিহাসটি দীর্ঘকাল প্রতিক্রিয়া দিয়ে শোধিত হয়, যেখানে আন্দোলন কেবল একটি ভূগর্ভস্থ অস্তিত্ব বহন করতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু এইরকম প্রতিটি সময়ের পরেই এটি নতুন করে সাজানো হয়েছে। নাম পরিবর্তন হয়, কিন্তু লক্ষ্য একই রয়ে যায়। স্পেনের শ্রম আন্দোলন ১৮৪০ সালের দিকে ফিরে যায়, যখন কাতালোনিয়ার বাম্পার জুয়ান মুন্স, বার্সেলোনাতে প্রথম টেক্সটাইল শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করে। সেই দিনটি সরকার জেনারেল জাপাপাত্রোকে কাতালোনিয়া থেকে আন্দোলনকে নিপাত করার জন্য পাঠিয়েছিল। ফলস্বরূপ ১৮৫৫ সালের মহান সাধারণ ধর্মঘট ছিল, যার ফলে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহের সৃষ্টি হয় যার ফলে শ্রমিকরা তাদের ব্যানারে স্লোগান দেয়; এসোসিয়েশন মুরেটে! (সংগঠিত বা মৃত্যুর অধিকার!) বিদ্রোহকে রক্তাক্তভাবে দমন করা হয়, কিন্তু সরকার শ্রমিকদের সংস্থার অধিকার মঞ্জুর করে।
স্প্যানিশ শ্রমিকদের প্রথম আন্দোলনগুলি স্প্যানিশ ফেডালিস্টদের নেতা এবং প্রৌঢ়ের শিষ্য পিযি মার্গালের ধারণার দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। পিয়ের মার্গাল তাঁর সময়ের অসামান্য তত্ত্ববিদদের মধ্যে ছিলেন প্রধান এবং স্পেনের উদারবাদী চিন্তাভাবনার উন্নয়নে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। তার রাজনৈতিক ধারনাগুলি রিচার্ড মূল্য, জোসেফ প্রিস্টি, টমাস পাইন, জেফারসন এবং প্রথম যুগের এংলো-আমেরিকান উদারনীতির অন্যান্য প্রতিনিধিদের মধ্যে বেশির ভাগের মত ছিল। তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ন্যূনতম সীমাবদ্ধ করতে এবং ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক আদেশ দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিলেন।

১৮৬৮ সালে রাজা আমেদো আইয়ের অপহরণের পর, বাকুনিন স্প্যানিশ শ্রমিকদের উদ্দেশে তাঁর উদ্যাপিত প্রকাশকে সম্বোধন করে এবং শ্রমিকদের প্রথম আন্তর্জাতিকে জয় করার জন্য স্পেনের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল পাঠায়। হাজার হাজার কর্মী মহান শ্রমিকের জোটে যোগদান করেন এবং বাকুনিনের অরাজক-সিন্ডিক্যালবাদী ধারনা গ্রহণ করেন, যার ফলে তারা আজকে অনুগত থাকে। বস্তুত, স্প্যানিশ ফেডারেশন আন্তর্জাতিকের মধ্যে শক্তিশালী সংস্থা ছিল। স্পেনের প্রথম স্প্যানিশ প্রজাতন্ত্রের উৎখাত হওয়ার পর আন্তর্জাতিকভাবে স্পেনকে দমন করা হয়, কিন্তু এটি একটি গোপন আন্দোলন হিসাবে অব্যাহত থাকে, তার সাময়িকী প্রকাশ করে এবং প্রতিটি আহবানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। এবং শেষপর্যন্ত যখন সাত বছরের অশান্তি নিপীড়নের পর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী আইনটি বাতিল করা হয়, ততদিনে ফেডারেশন ডি ত্রাজাসাদরেস দে লা রিজিয়ন এসানপোলার অনুসারীরা কাজ করছিল, সেভিলে দ্বিতীয় কংগ্রেসে (১৮৮২) ২৪৪ টি স্থানীয় ফেডারেশনের ৭০৮ জন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করে।

স্পেনের অরাজকতাবাদী শ্রমিক আন্দোলনের মতো বিশ্বজুড়ে অন্য কোনও শ্রমিক সংগঠনকে এইরকম ভয়ংকর নিপীড়ন সহ্য করতে হয়নি। জেরেজ দে লা ফোরতেরা, মন্টজুচ, সেভিলা, আলকালা ডেল ভেলের জেলখানায় হাজার হাজার অনুগামীদের মৃত্যুদণ্ড বা অমানবিক নির্যাতনকারীদের দ্বারা নির্যাতন করা হয়। তথাকথিত মানো নেগ্রা (ব্ল্যাক হ্যান্ড) এর রক্তাক্ত নির্যাতন, যা প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্বহীন ছিল না, এটি ছিল আন্দালুসিয়াতে কর্মরত শ্রমিকদের সংগঠন দমন করার জন্য সরকারের এক শুদ্ধ উদ্ভাবন; মন্টোজুইস এর ভয়ানক ট্রাজেডি, যা যার বিরুদ্বে বিশ্ব থেকে প্রতিবাদের ঝড় উত্থাপিত হয়েছিলো ; ক্যামিসাস ব্ল্যাক্সাস (হোয়াইট শার্টস) -এর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, একটি গ্যাংস্টার সংস্থা যা পুলিশ ও নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে হত্যার দ্বারা আন্দোলনের নেতাদের নির্মূল করে দেয়ার জন্য তলব করা হয়েছিল। সি এন টি সালভাদর সেগাইর শিকার হিংস্র- এই হল স্প্যানিশ শ্রম আন্দোলনের দীর্ঘ, নির্যাতনের ভরা গল্পের মাত্র কয়েকটি অধ্যায় মাত্র।

বার্সেলোনার মডার্ন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেসিসকো ফারের এবং লা হুলাগা জেনারেল (জেনারেল স্ট্রাইক) পত্রিকার প্রকাশক তার শহীদদের একজন ছিলেন। কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া তার অনুগামীদের প্রতিরোধের ক্ষমতা নষ্ট করতে সক্ষম হয়নি। এই আন্দোলনটি শত শত বেশিরভাগ অদ্ভুত চরিত্রের সৃষ্টি করেছে, যার হৃদয় ও নিখুঁত আদর্শবাদীর বিশুদ্ধতা তাদের গুরুতর বিরোধীদের দ্বারাও স্বীকার করা উচিত ছিল। স্প্যানিশ অরাজকতাবাদী শ্রমিক আন্দোলন রাজনৈতিক কর্মজীবীদের জন্য কোন স্থান ছিল না। কি অফার ছিল ধ্রুবক বিপদ, কারাবরণ এবং প্রায়ই মৃত্যু। শুধুমাত্র যখন এই আন্দোলনের শহীদদের ভয়ঙ্কর গল্পের সাথে এক পরিচিত হয়ে ওঠে তখনই কেউ বুঝতে পারে যে, কেন এই সময়ে একটি কালো প্রতিক্রিয়াশীলদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে তার মানবাধিকারের প্রতিরক্ষার মতো একটি হিংসাত্মক চরিত্রটি ধরে নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সি.এন.- এফ.এ.আই. আন্দোলনের পুরোনো ঐতিহ্যের অংশ। অন্য অনেক দেশের অরাজকতাবিদের সাথে তুলনা করে, শুরুতে স্পেনের তাদের কমরেড শ্রমিকদের অর্থনৈতিক যুদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সি.এন.টি. আজ প্রায় দুই মিলিয়ন শ্রমিক এবং কৃষক সদস্যকে যুক্ত করেছে। এটি ছয়ত্রিশটি দৈনিক পত্রিকা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের মধ্যে বার্সেলোনায় সলিডার ওবেরা যার সার্কুলেশন সংখ্যা ছিলো প্রায় ২৪০,০০০ স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয়। এবং ক্যাসেটিলা লিভারি, যা মাদ্রিদ সবচেয়ে পড়া কাগজ। এর পাশাপাশি এই আন্দোলনগুলি বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিক প্রকাশনা সম্পাদন করে এবং দেশে ছয়টি সেরা পর্যালোচনা পত্রিকা রয়েছে। গত বছরে, বিশেষ করে, এটি অনেকগুলি চমৎকার বই এবং পত্রিকা প্রকাশ করেছে এবং অন্য কোন আন্দোলনের তুলনায় জনসাধারনের শিক্ষায় আরও অবদান রেখেছে। সি.এন.টি.- এফ.এ.আই. আজ, স্পেনের ফ্যাসিবাদ এবং দেশের সামাজিক পুনর্গঠনের চেতনার বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মূল ভিত্তি।

পর্তুগাল, যেখানে শ্রম আন্দোলন সবসময় প্রতিবেশী স্পেন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, ১৯১১ সালে গঠিত হয়েছিল কনফ্রেকারাকো জিরাল ত্রাবলভো, দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন, একই নীতিমালার প্রতিনিধিত্ব করে সি এন টি স্পেনে. এটি সর্বদা সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতন্ত্রতা, এবং বেশ কয়েকটি বড় হরতালের আন্দোলন পরিচালনা করে। পর্তুগালের একনায়কতন্ত্রের বিজয় দ্বারা সিজিটিকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে জোরপূর্বক দূরে রাখার প্রায়স অব্যাহত ছিলো ফলে গোপনে এটি বেড়ে উঠে।

ইতালীতে প্রথমবারের মতো প্রথম আন্তর্জাতিক, একটি শক্তিশালী অরাজকতাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠে, যা দেশের কয়েকটি অংশে শ্রমিক ও কৃষকদের উপর নিরপেক্ষ প্রভাব বজায় রেখেছিল। ১৯০২ সালে সমাজতান্ত্রিক দল কনফেডারেজিয়ন দেল লাভারো প্রতিষ্ঠা করে, যা জার্মান ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠনের মডেলের অনুরূপ। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন না করে; এটি এমনকি ফরাসি সিন্ডিক্যালদের ধারণাগুলির দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তার সদস্যতার একটি বড় অংশকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিল না। কিছু বড় এবং সফল স্ট্রাইক, বিশেষ করে পারা ও ফেরারার কৃষক শ্রমিকদের ধর্মঘট, সরাসরি কর্মকাণ্ডের সমর্থকদের প্রতি বিশ্বস্ততার প্রতি জোরালো অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
১৯১২সালে মোডেনাতে বিভিন্ন সংগঠনের একটি সম্মেলন আহ্বান করা হয়, যা কনফেডারেশনের পদ্ধতি এবং সমাজতান্ত্রিক দলের প্রভাবের প্রতি তার সহানুভূতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এই সম্মেলনে একটি নতুন সংগঠন নামে নামকরণ করে ইউনিয়ন স্যান্ডিসিলে ইতালীয়িয়া। এই কমিটিটি বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাবের লক্ষ্যে শ্রম সংগ্রামের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রনয়ন করেছিলো। বিশেষ করে এটি ১৯১৩ সালের জুন মাসে তথাকথিত রেড সপ্তাহে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রহণ করে। অংকোনাতে আঘাতকারী শ্রমিকদের উপর পুলিশের নিষ্ঠুর আক্রমণগুলি সাধারণ ধর্মঘটের ফলে ঘটে, যা কয়েকটি প্রদেশে সশস্ত্র বিদ্রোহে পরিণত হয়।

যখন, পরের বছর, বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গুরুতর সংকট দেখা দেয়। আন্দোলনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, আলসেদ ডি আমব্রিস, যারা সব সময় একটি বরং দ্ব্যর্থহীন ভূমিকা পালন করে, যুদ্ধে জন্য একটি প্রতিষ্ঠান সংগঠিত করার চেষ্টা করে। পারা (১৯১৪) এর কংগ্রেসে তিনি সংখ্যালঘুতে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন এবং তাঁর অনুগামীদের আন্দোলন থেকে প্রত্যাহার করেছিলেন। যুদ্ধে ইতালির প্রবেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত পরিচিত প্রচারক যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় এবং কারাবাসে প্রেরন করা হয়। যুদ্ধের পর ইতালিতে একটি বিপ্লবী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং রাশিয়ার ঘটনাসমূহ, যার প্রকৃত তাত্পর্য সেই সময়ে অবশ্যই অনুমান করা যায় না, দেশটিতে একটি জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইউ.এস.আই. অল্প সময়ের মধ্যে নতুন ভাবে যাত্রা করে প্রায় ৬০০,০০০ শ্রমিক সঙ্ঘঠিত করে ফেলে।

১৯২০ সালের আগস্টে কারখানায় দখলদারিত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে দেশে গুরুতর শ্রম বিপর্যয়ের একটি শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন সোভিয়েত ব্যবস্থা, যেটি কোনও একনায়কত্বকে প্রত্যাখ্যান করে এবং অর্থনৈতিক সংস্থায় তার ভিত্তি খুঁজে পায়। সংগঠিত শ্রম একই বছরে, ইউ.এস.আই. রাশিয়া এর পরিস্থিতি সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে পরিচিত করতে মস্কোর সচিব, আর্মান্ডো বর্গাইকে পাঠানো হয়েছে। বর্গাই ইতালি ফিরে দুঃখজনক ভাবে ভ্রান্ত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন কমিউনিস্টরা যুক্তরাষ্ট্রের ইউ.এস.আই. তাদের হাতে; কিন্তু রোমে কংগ্রেসে ১৯২২ সালে বলশেভিজম ও আই.ডব্লিউ.এ.এর সাথে সংগঠনের সাথে একটি উন্মুক্ত বিভাজন ঘটে। ইতিমধ্যে ফ্যাসিবাদ একটি বিপদ হিসাবে দেখা দেয়।

একটি শক্তিশালী ও একত্রিত শ্রম আন্দোলন যা তার স্বাধীনতার প্রতিরক্ষা বিষয়ে সবকিছুকে ঝুঁকি নেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক পার্টি এবং শ্রম সংক্ষুব্ধ শ্রমিকের দয়িত আচরণ, যা তার প্রভাবের অধীন ছিল, সবকিছু ধ্বংস করে ফেলে। ইউএসআই ছাড়াও ইতালীয় এনার্কিজম সর্বজনীন সম্মানিত চ্যাম্পিয়ন, এরিকো মালাতিস্টা বৃত্তাকার সমাবেশে শুধুমাত্র ইউনিয়ন এনার্কিয়া ইতালীয়া শুধুমাত্র সেখানে রয়ে গেছে। যখন ১৯২২ সালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক সরকার ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে সশস্ত্র করে স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার এই শেষ প্রচেষ্টাটি তীব্র করে তুলেছিল। কিন্তু ইতালীয় গণতন্ত্র তার নিজের কবর খনন করেছে। এটা মনে করা হয় যে মুসোলিনিকে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু এভাবে এটি নিজের কবর-খননকারক হিসেবে পরিণত হয়েছে।

ফ্যাসিবাদের বিজয়ে সমগ্র ইতালীয় শ্রম আন্দোলন অদৃশ্য হয়ে গেছে। যুদ্ধের পর ফ্রান্সে তথাকথিত সংস্কারবাদী দলটি সি.জি.এ.তে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে, যেখানে বিপ্লবী উপাদানগুলি বিচ্ছিন্ন করে এবং নিজেদেরকে সিজিটিইউ তে পরিণত করে। কিন্তু যেহেতু মস্কো এই বিশেষ সংস্থাকে তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য খুব দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল, তাই তখন রাশিয়ান প্যাটার্নের পরে এটি একটি গোপন সংস্থা হিসাবে কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল যা ১৯২২ সালে দুই জন অরাজক-সিনডিসিলীয়দেরকে কমিউনিস্টদের দ্বারা গুলি করা হয়েছিল। প্যারিস ট্রেড ইউনিয়নের উপর থেকে বার্নার্ডের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েপরে, নিজের সম্পর্ক ও জি.টি.ইউ. থেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং তিনি কনফেডারেশন জেনারেল দ্য ট্রাভাইল সিন্ডিক্যালিস্ট বিপ্লবী সংগঠনটি গঠন করেন, যা আন্তর্জাতিক ওয়ার্কমেইন্স অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেয়। এই সংগঠনটি তখন থেকেই জোরালোভাবে সক্রিয় হয়েছে এবং কর্মীদের মধ্যে সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও পুরোনো প্রজন্মের ধারণাগুলি জি.জি.টিতে. রাশিয়ার প্রতারণাপূর্ন ধারন মিশ্রন ঘটায় এবং সর্বোপরি, স্বাধীনতার জন্য স্প্যানিশ যুদ্ধে ফরাসি কর্মীদের মধ্যে প্রভাব বলয় তৈরী করে ফ্রান্সে এনার্কো-সিনডিক্যালিজমের একটি শক্তিশালী পুনর্জাগরণের সৃষ্টি করে, যাতে করে কেউ নিশ্চিতভাবেই পূর্বাভাসের সময় আন্দোলনের একটি পুনর্জন্মের উপর নির্ভর করে।

জার্মানিতে তথাকথিত লোকেদের আন্দোলনের আগে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিদ্যমান ছিল, যার দুর্বলতা ১৮৯৭ সালে জি কেসলার এবং এফ, ক্যাটের প্রতিষ্ঠিত ফ্রাই ভেরাইং ডিউশচার গভারস্কাফ্টেন ছিল। এই সংগঠনটি মূলত সোশ্যাল সোশাল ডেমোক্রেটিক ধারনার ধারক হলেও, সাধারণ জার্মান ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের কেন্দ্রীয়করণের প্রবণতাগুলিকে আক্রমণ করে। ফ্রান্সে বিপ্লবী ইউনিয়নের পুনর্জাগরণ এই আন্দোলনের উপর একটি শক্তিশালী প্রভাব ছিল, এবং এই সাবেক সুশীল ডেমোক্র্যাট এবং পরবর্তী অরাজকতাবাদী, ডঃ আর, ফ্রিডবার্গ সাধারণ ধর্মঘটের জন্য যোগ দিয়েছিলেন যখন এটা বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়েছিল। ১৯০৮ সালে এফ.ভি.ডি.জি. সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির সাথে সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত হয়ে এবং খোলাখুলিভাবে এনার্কো-সিনডিক্যালিজম গ্রহন করে ও একাত্মতা প্রকাশ করেন। যুদ্ধের পরে এই আন্দোলন একটি জোরুরালো অবস্থান নেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে ১২০,০০০ সদস্য সঙ্গগ্রহ করে।

১৯১৯ সালে বার্লিনে তাঁর কংগ্রেসে। রুডলফ রকার কর্তৃক পরিচালিত নীতির ঘোষণা গৃহীত হয়; এটি স্প্যানিশ সি এন টি এর উদ্দেশ্য সঙ্গে অপরিহার্য চুক্তি ছিল। ডাসেলডর্ফের কংগ্রেসে (১৯২০), সংগঠনটি তার নাম পরিবর্তন করে ফ্রাই আর্বিইটর-ইউনুনি ডুটিলস রাখা হয়। চলমান আন্দোলন একটি অস্বাভাবিকভাবে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় প্রচারণা চালায় এবং রেনিস শিল্প ক্ষেত্রের সংগঠিত শ্রম দ্বারা মহান কর্ম সূচির সাথে বিশেষভাবে সক্রিয় কর্মীগন অংশ নেয়। এফ.এ.ডি.ডি.ডি. তার সক্রিয় প্রকাশনা ঘর এর অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে একটি মহান সেবা কর্ম রেন্ডার চালু করা হয়। যা একটি বৃহদাকার পামপ্লেট সাহিত্য ছাড়াও, ক্রপথকিন, বাকুনিন ,নেথালু , রকার এবং অন্যদের দ্বারা একটি বৃহত সংখ্যক কাজ সম্পাদিত হয়, এবং এই কার্যকলাপ উদারবাদী হিসাবে বিস্তৃত লাভ করে। এই আন্দোলন, সাপ্তাহিক , পাক্ষিক, ডের সিন্দিচালিস্ট, এবং তাত্তিক মাসিক ডাই ইন্টারন্যাশনাল ছাড়াও, তার কমান্ডের কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায় বিস্তৃত ছিল। তাদের মধ্যে ডাসডফোর্ডে ডাই শফফুং, দৈনিক পত্রিকা। হিটলারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে জার্মান অরাজক-সিন্ডিক্যালদের আন্দোলন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। এর সমর্থকদের বেশ কয়েকজন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিক্ষিপ্ত হয় অথবা বিদেশে আশ্রয় নেয়। এই সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি এখনও গোপনে ও নিজেদের অস্থিত্ব বিদ্যমান রেখেছে, এবং সবচেয়ে কঠিন অবস্থার অধীনে বহন করে লাল-কালো পতাকা উর্দ্বে তোলে ধরে আছে ।

Idioma: 

Seccion: 

Tipo de contenido: